বায়ুমণ্ডলের স্তর বিন্যাস

বায়ুমণ্ডলের স্তর বিন্যাস

Layer of Atmosphere
বায়ুমণ্ডলের স্তর বিন্যাস

বায়ুমণ্ডলের স্তর বিন্যাস দু’ভাবে করা হয় — 

( ক ) রাসায়নিক গঠন অনুসারে এবং 

( খ ) তাপমাত্রার তারতম্য অনুসারে ।

রাসায়নিক গঠন অনুসারে বায়ুমণ্ডলের স্তর বিন্যাস 

রাসায়নিক গঠন অনুসারে বায়ুমণ্ডল কে দুইটি প্রধান স্তরে ভাগ করা যায় — 

( I ) হোমোস্ফিয়ার বা সমমন্ডল

( II ) হেটেরােস্ফিয়ার বা বিষমমণ্ডল ।

হোমোস্ফিয়ার বা সমমন্ডল :

ইংরেজি শব্দ ‘ হোমোস্ফিয়ার ’ – এর বাংলা প্রতিশব্দ ‘ সমমন্ডল ’ । ভূপৃষ্ঠ থেকে ওপরের দিকে প্রায় ৯০ কিমি পর্যন্ত বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক গঠন , বিশেষ করে নাইট্রোজেন , অক্সিজেন , কার্বন ডাই অক্সাইড , আর্গন , হিলিয়াম প্রভৃতি বিভিন্ন গ্যাসের অনুপাত প্রায় একই ধরনের থাকে । এজন্য বায়ুমণ্ডলের এই স্তরটিকে হোমোস্ফিয়ার বা সমমন্ডল বলে । 

হেটেরোস্ফিয়ার বা বিষমমন্ডল :

ইংরেজি শব্দ ‘ হেটেরোস্ফিয়ার ’ – এর বাংলা প্রতিশব্দ ‘ বিষমমন্ডল ’ । হোমোস্ফিয়ারের ওপর থেকে প্রায় ১০,০০০ কিমি পর্যন্ত বায়ুমণ্ডলের গ্যাসীয় উপাদান সমূহের অনুপাত সমান থাকে না । তাই এই অংশকে হেটেরোস্ফিয়ার বা বিষমমন্ডল বলে । রাসায়নিক গঠন অনুসারে এই স্তরটিকে চারটি উপবিভাগে ভাগ করা যায়— 

( ১ ) সবচেয়ে নীচে প্রায় ২০০ কিমি পর্যন্ত বিস্তৃত নাইট্রোজেন স্তর , এর ওপর 

( ২ ) প্রায় ২০০ থেকে ১,১০০ কিমি পর্যন্ত অক্সিজেন স্তর , তার ওপর 

( ৩ ) প্রায় ১,১০০ থেকে ৩,৫০০ কিমি পর্যন্ত হিলিয়াম স্তর এবং সবশেষে 

( ৪ ) হিলিয়াম স্তরের ওপর প্রায় ১০,০০০ কিমি পর্যন্ত হাইড্রোজেন স্তর আছে ।

তাপমাত্রার তারতম্য অনুসারে বায়ুমণ্ডলের স্তরবিন্যাস

তাপমাত্রার তারতম্য অনুসারে বায়ুমণ্ডলকে কয়েকটি স্তরে ভাগ করা যায় — ( I ) ট্রপোস্ফিয়ার ( II ) স্ট্রাটোস্ফিয়ার ( III ) মেসোস্ফিয়ার ( IV ) থার্মোস্ফিয়ার ও আয়নোস্ফিয়ার এবং ( V ) এক্সোস্ফিয়ার ।

ট্রপোস্ফিয়ার :

বায়ুমণ্ডলের একেবারে নীচের স্তরের যে অংশটিতে উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা কমতে থাকে তাকে ট্রপোস্ফিয়ার বলে । ভূপৃষ্ঠ থেকে এর বিস্তৃতি নিরক্ষীয় অঞ্চলে প্রায় ১৮ কিমি এবং মেরু অঞ্চলে প্রায় ৮ কিমি । সাধারণভাবে দেখা যায় , এখানে প্রতি ১,০০০ মিটার উচ্চতায় ৬.৫° সে হারে উত্তাপ কমে এবং এইভাবে কমতে কমতে ট্রপােস্ফিয়ারের শেষ সীমায় বায়ুর তাপমাত্রা প্রায় —৫৫° সে পর্যন্ত নেমে যায় । বায়ুমণ্ডলের এই অংশে বিভিন্ন গ্যাসীয় উপাদান , জলীয় বাষ্প , ধূলিকণা ইত্যাদি যথেষ্ট পরিমাণে থাকে । মেঘ বা বায়ুপ্রবাহ এই স্তরেই সৃষ্টি হয় । প্রবল বায়ুর উদ্দামতা , ঝড়-বৃষ্টি , বিদ্যুৎ বজ্রপাত , জেট স্ট্রিম প্রভৃতির সৃষ্টি এই স্তরে হয়ে থাকে । তাই ট্রপােস্ফিয়ারকে ক্ষুব্ধ মন্ডলও বলে । পৃথিবীর আবহাওয়ার বেশিরভাগ প্রক্রিয়াই এই স্তরে সীমাবদ্ধ । ট্রপােস্ফিয়ার যেন বায়ুমণ্ডলের অন্দরমহল । এর ওপরের স্তরগুলিতে জলীয় বাষ্প বা মেঘ থাকে না বললেই হয় । ট্রপােস্ফিয়ারের ঊর্ধ্বসীমায় যেখানে তাপমাত্রা কমেও না বা বাড়েও না , অর্থাৎ প্রায় ধ্রুবক থাকে , তাকে বলে ট্রপোপজ । 

স্ট্রাটোস্ফিয়ার :

ট্রপােপজের ওপর যে বায়ুস্তর আছে তার নাম , স্ট্রাটোস্ফিয়ার । ট্রপােস্ফিয়ারের ওপর এবং ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫০ কিমি পর্যন্ত এই স্ট্রাটোস্ফিয়ার বিস্তৃত । এই স্তরের মধ্যে দিয়ে যতই ওপরে ওঠা যায় তাপমাত্রা ক্রমশ বাড়তে থাকে এবং প্রায় ৫০ কিমি উচ্চতায় বায়ুর তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশি প্রায় ১০° সে হয় । স্ট্রাটোস্ফিয়ারের উর্ধ্বসীমার নাম স্ট্রাটোপজ । স্ট্রাটোস্ফিয়ারের মধ্যে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ বায়ুমণ্ডলের এই অংশে ওজোন স্তরের ( ওজোন গ্যাস ) অস্তিত্ব । ওজোনের জন্য শুধু যে তাপমাত্রা বাড়ে তাই নয় , বায়ুমণ্ডলের এই অংশে ওজোন গ্যাসের স্তরটি আছে বলেই সূর্য থেকে যেসব ক্ষতিকারক অতিবেগুনি রশ্মি বিচ্ছুরিত হয় , সেগুলি ভূপৃষ্ঠে পৌঁছােতে পারে না ।

মেসোস্ফিয়ার :

স্ট্রাটোস্ফিয়ারের ওপরের বায়ুস্তরের নাম মেসোস্ফিয়ার । এই স্তরে উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বায়ুর তাপমাত্রা কমতে থাকে । স্ট্রাটোপজের ওপর এবং ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮০ কিমি পর্যন্ত মেসোস্ফিয়ারের বিস্তৃতি । ৮০ কিমি উচ্চতায় বায়ুর তাপমাত্রা কমে হয় – ৯৩° সে. । মহাকাশ থেকে যেসব উল্কা পৃথিবীর দিকে ছুটে আসে , সেগুলি এই মেসোস্ফিয়ারের মধ্যে এসে পুড়ে ছাই হয়ে যায় । মেসোস্ফিয়ারের ঊর্ধ্বসীমাকে বলে মেসোপজ । 

আয়নোস্ফিয়ার বা আয়নমন্ডল :

মেসােপজের ওপর বায়ুমণ্ডলের যে স্তর আছে তার নাম থার্মোস্ফিয়ার । বায়ু এখানে খুব হালকা এবং প্রখর সূর্যরশ্মির জন্য ওই বায়ু আয়নিত হয়ে আছে । অসংখ্য তড়িৎগ্রস্ত কণা বা আয়ন ( Ion ) -এর অস্তিত্ব হেতু এই স্তরটি আয়নোস্ফিয়ার নামেই বেশি পরিচিত । আমাদের কাছে আয়নোস্ফিয়ারের গুরুত্ব অনেক । সূর্য থেকে নিরন্তর উৎসারিত ক্ষতিকারক হ্রস্ব-তরঙ্গগুলি আয়নোস্ফিয়ারে শােষিত না হলে ভূপৃষ্ঠে চলে আসত এবং তার ফলও হত মারাত্মক । আয়নোস্ফিয়ারের আরও গুরুত্ব আছে । ভূপৃষ্ঠে সৃষ্ট বেতার তরঙ্গ গুলি আয়নোস্ফিয়ার ভেদ করে ওপরে যেতে পারে না , আয়নিত বস্তুকণায় প্রতিহত হয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসে । এই প্রতিফলনের জন্যই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে বেতার সংযােগ রক্ষা করা সম্ভব হয় । এছাড়া , আয়নিত অণুর প্রভাবে এই আয়নোস্ফিয়ারের মধ্যেই সৃষ্টি হয় মেরুজ্যোতি বা মেরুপ্রভা । 

থার্মোস্ফিয়ার :

মেসােপজের উর্ধ্বে ৮০ থেকে ৫০০ কিমি পর্যন্ত বায়ুস্তরে বায়ুর তাপমাত্রা অত্যন্ত দ্রুতহারে বৃদ্ধি পায় । এজন্য এই স্তরের নাম থার্মোস্ফিয়ার । এই স্তরের নিম্নসীমায় ( অর্থাৎ ৮০ কিমি উচ্চতায় ) তাপমাত্রা ৯৩° সে থেকে বাড়তে বাড়তে এই স্তরের ঊর্ধ্বসীমায় ( অর্থাৎ ৫০০ কিমি উচ্চতায় ) তাপমাত্রা হয় ১২০০° সেলসিয়াসেরও বেশি । বায়ু এখানে খুবই হালকা । তবে প্রখর সূর্যরশ্মির জন্য ওই হালকা বায়ুই আয়নিত হয়ে আছে । এজন্য এই স্তরটি আয়নোস্ফিয়ার নামেই বেশি পরিচিত । বায়ুমণ্ডলের অন্যান্য স্তরের তুলনায় থার্মোস্ফিয়ারের বিস্তৃতি যথেষ্ট বেশি হলেও বায়ু অত্যন্ত পাতলা বলে বায়ুমণ্ডলের মােট ভরের মাত্র ১/২০০ ভাগ এখানে আছে ।

এক্সোস্ফিয়ার :

থার্মোস্ফিয়ার ও আয়নোস্ফিয়ারের ওপর বায়ুমণ্ডলের সর্বশেষ স্তরটির নাম এক্সোস্ফিয়ার । এখানে বায়ুমণ্ডল খুব হালকা । এখানেও বায়ুর তাপমাত্রা বাড়ে , তবে থার্মোস্ফিয়ারের মতাে অত দ্রুত নয় । ৬৫০ কিমি উচ্চতায় তাপমাত্রা বেড়ে হয় প্রায় ১,২৪০° সে । এক্সোস্ফিয়ারের ওপর বায়ুমণ্ডল ক্রমশ পাতলা হয়ে মহাশূন্যে মিশেছে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

x
error: Content is protected !!