ভূমিকম্পের কারণ ও ফলাফল

ভূমিকম্পের কারণ ও ফলাফল

images 1
ভূমিকম্পের কারণ ও ফলাফল

ভূমিকম্পের কারণ 

ভূমিকম্পের কারণগুলিকে প্রধানত দু-ভাগে ভাগ করা যায় — 

( ক ) প্রাকৃতিক কারণ এবং 

( খ ) মানুষের ক্রিয়াকলাপ বা অপ্রাকৃতিক কারণ ।  

ভূমিকম্পের প্রাকৃতিক কারণ :

( ১ ) ভূ-বিজ্ঞানীদের মতে , ভূত্বক কতকগুলি সঞ্চরণশীল ‘ প্লেট ’ বা পাতের সমন্বয়ে গঠিত । সঞ্চরণশীল প্লেটগুলির মধ্যে যে কোনাে দুটি যখন পরস্পরের কাছে সরে আসে , তখন ওই সংযােগ রেখা বরাবর শিলাচ্যুতি ঘটে এবং ভূমিকম্প হয় । যেমন — প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল বরাবর এজন্য প্রায়ই ভূমিকম্প হয় । ১৯৯১ সালের ১৯ শে অক্টোবর উত্তরপ্রদেশের গাড়ােয়াল হিমালয় অঞ্চলের অন্তর্গত উত্তর কাশী ও চামেলী জেলায় প্রধানত এই কারণেই বিধ্বংসী ভূমিকম্প হয়েছিল । আবার , ২০০৪ সালের ২৬ শে ডিসেম্বর ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা এবং ভারতের আন্দামান দ্বীপ সংলগ্ন ভারত মহাসাগরের তলদেশে যে বিধ্বংসী ভূমিকম্প হয়েছিল , তার কারণ ছিল বর্মা প্লেটের নীচে ভারতীয় প্লেটের কিছুটা অধােগমন । 

( ২ ) সঞ্চরণশীল প্লেটগুলি যদি পরস্পরের কাছ থেকে দূরে সরে যায় , তাহলে যে চাপের তারতম্য হয় , তার ফলেও ভূমিকম্প হয় । 

( ৩ ) নবীন ভঙ্গিল পার্বত্য অঞ্চলে ভূপৃষ্ঠের স্থিতিস্থাপকতা এখনও ফিরে আসেনি , অর্থাৎ ওইসব অঞ্চলে পর্বত সৃষ্টির কাজ এখনও চলছে । এজন্য ওইসব অঞ্চলে ভূমিকম্প হতে পারে , যেমন — হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে মাঝে মাঝেই ভূমিকম্প হয় । 

( ৪ ) তাপ বিকিরণের ফলে ভূপৃষ্ঠের সংকোচন বেড়ে গেলে ভূমিকম্প হতে পারে । 

( ৫ ) আগ্নেয়গিরি থেকে অগ্ন্যুৎপাতের সময় বহির্মুখী বাষ্প রাশি ও উত্তপ্ত তরল পদার্থের চাপে এবং ওই একই সময় ভূগর্ভে চাপের হ্রাস বৃদ্ধির জন্য ভূমিকম্প হতে পারে ।

( ৬ ) বৃষ্টিপাতের ফলে পার্বত্য অঞ্চলে ধস নামলে ভূমিকম্প হয় । 

( ৭ ) পার্বত্য অঞ্চলে বিশাল বরফের হিমানী সম্প্রপাতরূপে ধসে পড়লে ভূমিকম্প হয় । 

ভূমিকম্পের অপ্রাকৃতিক কারণ :

( ১ ) নদীতে বাঁধ দিয়ে জলাধার সৃষ্টি করলে ওপরের জলরাশির চাপে নীচের শিলাস্তরের স্থানচ্যুতি ঘটে , এর ফলে ভূমিকম্প হয় । ১৯৬৭ সালে মহারাষ্ট্রের কয়নানগরে কয়না জলাধারের প্রবল চাপের জন্য ভূমিকম্প হয়েছিল । 

( ২ ) ভূগর্ভে পারমাণবিক বােমার বিস্ফোরণ ঘটানাে হলে ভূমিকম্প হতে পারে । 

( ৩ ) ডিনামাইট জাতীয় বিস্ফোরকের সাহায্যে যখন পাহাড় কেটে রাস্তা , টানেল প্রভৃতি তৈরি করা হয় , সেই বিস্ফোরণের সময় আশপাশের এলাকায় ভূমিকম্প হতে পারে ।

ভূমিকম্পের ফলাফল 

ভূমিকম্প সামান্য বা মৃদু হলে তার প্রভাব অধিকাংশ সময় বােঝা যায় না । কিন্তু তীব্র ভূমিকম্পের ফলে ভূমিরূপের ব্যাপক পরিবর্তন হয় , ধনসম্পদের মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি সহ বহু জীবনহানি ঘটে । যেমন — 

( ১ ) ভূমিকম্পের ফলে সমুদ্রতলের কিছু অংশ ওপরে উঠে যেতে বা নীচে বসে যেতে পারে । যেমন —১৯১৪ সালে এক তীব্র ভূমিকম্পের ফলে জাপান সংলগ্ন সাগামি উপসাগরের কিছু অংশ প্রায় ১২৫ মিটার ওপরে উঠে গিয়েছিল এবং কিছু অংশ প্রায় ৩০০ মিটার নীচে বসে যায় । 

( ২ ) সমুদ্রতলে ভূমিকম্প হলে সমুদ্রে বড়াে বড়াে ঢেউ বা সুনামির সৃষ্টি হয় ( বিশালাকৃতি সামুদ্রিক ঢেউকে বলে সুনামি ) । যেমন —১৯৯৩ সালে জাপানের উত্তরাংশে হােক্কাইডাে দ্বীপ  সংলগ্ন সমুদ্রে প্রচণ্ড ভূমিকম্পের ফলে বিশালাকৃতি সুনামির সৃষ্টি হয়েছিল । ২০০৪ সালের ২৬ শে ডিসেম্বর ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা এবং ভারতের আন্দামান দ্বীপ সংলগ্ন ভারত মহাসাগরের তলদেশে তীব্র ভূমিকম্পের ফলে যে সুউচ্চ সুনামির সৃষ্টি হয়েছিল , তার ফলে উপকূল ভূমিতে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে , ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং উপকূলবর্তী দেশগুলির দুই লক্ষেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারায় ।

( ৩ ) শুধু সমুদ্রতলই নয় , ভূমিকম্পের ফলে সমুদ্রোপকূলবর্তী ভূমিও ওপরে উঠে যেতে কিংবা বসে যেতে পারে । যেমন — ১৮৯৯ সালে উত্তর আমেরিকার আলাস্কা উপকূলের কিছু অংশ ভূমিকম্পের ফলে প্রায় ১৬ মিটার ওপরে উঠে গিয়েছিল । 

( ৪ ) তীব্র ভূমিকম্পের ফলে ভূত্বকে চ্যুতি , ফাটল ও ভাঁজ তৈরি হতে পারে । অনেক সময় বিস্তৃত এলাকা বসেও যায় । যেমন —১৯২০ এবং ১৯২৭ সালে চিনের উত্তরাংশের লােয়েস অঞ্চলে যে প্রচণ্ড ভূমিকম্প হয় তার ফলে ব্যাপকহারে ভূমিস্খলন ঘটেছিল । 

( ৫ ) পার্বত্য অঞ্চলের প্রবল ভূমিকম্পে ধস নামে । ১৯৯১ সালের ১৯ শে অক্টোবর উত্তরপ্রদেশের গাড়ােয়াল হিমালয় অঞ্চলের চামমালী এবং উত্তর কাশীতে যে বিধ্বংসী ভূমিকম্প হয়েছিল , তার ফলে বড়াে বড়ো ধস নামে এবং বহু গ্রাম ধ্বংস হয়ে যায় । 

( ৬ ) ভূমিকম্পের ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হতে পারে । যেমন — ১৯৫০ সালের ১৫ ই আগস্ট অসমে ভূমিকম্পের ফলে ডিবং নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছিল ।

( ৭ ) ভূমিকম্পের প্রভাবে নদীর গতিপথ বন্ধ হয়ে হ্রদ সৃষ্টি হতে পারে । আবার , সম্পূর্ণ নতুন নদীরও সৃষ্টি হতে পারে । 

( ৮ ) ভূমিকম্পের ফলে বিস্তীর্ণ এলাকা অবনমিত হয়ে জলাভূমির সৃষ্টি হতে পারে । ১৮১৯ সালের ভূমিকম্পে ‘ কচ্ছের রান অঞ্চল ’ বসে গিয়ে জলাভূমির সৃষ্টি হয় । 

( ৯ ) ভূমিকম্পের ফলে উচ্চভূমি নিম্নভূমিতে এবং নিম্নভূমি উচ্চভূমিতে পরিণত হতে পারে । 

( ১০ ) প্রচণ্ড ভূমিকম্পে শহর , নগর , জনপদ প্রভৃতি নিমেষের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যায় । জীবন ও ধনসম্পত্তির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় । ১৯৭৬ সালের ২৭ শে জুলাই পূর্ব চিনের তাংসান অঞ্চলের ভূমিকম্পে প্রায় সাড়ে সাত লক্ষ লােকের জীবনহানি ঘটে ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!