দ্বিতীয় ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধ

দ্বিতীয় ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধ

পেশােয়া দ্বিতীয় মাধব রাও অপুত্রক অবস্থায় মারা যান ( ১৭৯৬ খ্রিঃ ) । অতঃপর পেশােয়া হন রঘুনাথ রাও -এর পুত্র দ্বিতীয় বাজীরাও ( ১৭৯৬-১৮১৮ খ্রিঃ ) । কিন্তু তিনি ছিলেন বয়সে নবীন , অস্থিরচিত্ত ও ব্যক্তিত্বহীন । পরন্তু সেই সময় অহল্যা বাঈ , মহাদজী সিন্ধিয়ার মতাে অভিজ্ঞ রাজনীতিজ্ঞদের মৃত্যু ঘটলে মারাঠা জাতির মধ্যে নেতৃত্বের অভাব দেখা দেয় । ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে নানা ফড়নবিশের মৃত্যু হলে মারাঠা দরবারের শেষ প্রবীণ ও অভিজ্ঞ নেতার অবসান ঘটে । 

দ্বিতীয় ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধের কারণ

জনৈক ইংরেজ কর্মচারীর মতে , “ নানার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে মারাঠা দরবারের সংযম ও সুবুদ্ধি লুপ্ত হয় । ” পেশােয়া বাজীরাও ছিলেন স্বার্থপর ও ষড়যন্ত্র প্রিয় । মারাঠা রাষ্ট্রসংঘের নেতৃত্ব দেবার মতাে দূরদর্শিতা তার ছিল না । তাই তিনি মারাঠা সর্দারদের আত্মকলহে লিপ্ত হয়ে মারাঠা রাষ্ট্রসংঘের সর্বনাশ ডেকে আনেন । হােলকার ও সিন্ধিয়ায় বিরােধে তিনি সিন্ধিয়াকে সমর্থন করলে হােলকার পেশােয়াকে আক্রমণ করেন । যুদ্ধে সিন্ধিয়া ও পেশােয়া পরাজিত হন । অতঃপর হােলকার অমৃত রাও নামক জনৈক ব্যক্তিকে পেশােয়া বলে ঘােষণা করেন । রাজ্যচ্যুত হয়ে পেশােয়ার সমস্ত সুবুদ্ধি লােপ পায় । হােলকারের বিরুদ্ধে তিনি ইংরেজদের সাহায্য নিতে মনস্থ করতেন । তাই আচার্য যদুনাথ সরকার  বলেছেন : “ এই গৃহ যুদ্ধের ফল হল মারাঠাদের জাতীয় স্বাধীনতার অবসান । ” 

বেসিনের চুক্তি :

ইতিমধ্যে তৎকালীন ইংরেজ গভর্নর জেনারেলের লর্ড ওয়েলেসলি ভারতে ব্রিটিশ প্রভুত্ব সুনিশ্চিত করার জন্য ‘ অধীনতামূলক মিত্রতা ’ ( Subsidiary Alliance ) নীতি ঘােষণা করেছেন । বহু ভারতীয় রাজা এই সন্ধির মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে নিজেদের স্বাধীনতা বিসর্জন দিলেও , মারাঠাগণ এতকাল এই অন্যায়মূলক সন্ধিকে বর্জন করে এসেছিল । এখন দ্বিতীয় বাজীরাও ইংরেজের সাহায্য প্রার্থী হলে মারাঠাদের ‘ অধীনতামূলক মিত্রতা ’ চুক্তির অন্তর্ভুক্ত করার সুযােগ উপস্থিত হয় । ‘ বাজীরাও অধীনতামূলক মিত্ৰতা নীতির ভিত্তিতে গঠিত ‘ বেসিনের সন্ধি ‘ ( ১৮০২ খ্রিঃ ) স্বাক্ষর করেন । বেসিনের সন্ধির শর্ত গুলি হলো — 

( ১ ) ইংরেজগণ বাজীরাও পেশােয়া পদে বসতে সাহায্য করবে । 

( ২ ) এই সাহায্যের ব্যয় নির্বাহের জন্য পেশােয়া তার রাজ্যের একাংশ ইংরেজদের দান করবেন । 

( ৩ ) ইংরেজদের অনুমতি ছাড়া পেশােয়া কোনাে শক্তির সাথে সন্ধি করতে পারবেন না । 

( ৪ ) মারাঠা সর্দারদের সাথে বিরােধের মীমাংসার জন্য পেশােয়া ইংরেজের মধ্যস্থতা মানতে বাধ্য থাকবেন । 

( ৫ ) পেশােয়ার রাজ্যে তারই খরচে ইংরেজ বাহিনী মােতায়েন থাকবে ইত্যাদি । 

বেসিনের সন্ধির গুরুত্ব :

ভারতে ইংরেজ প্রভুত্ব বৃদ্ধির ইতিহাসে বেসিনের সন্ধি খুবই গুরুত্বপূর্ণ । এই সন্ধির দ্বারা ওয়েলেসলি আইনগত ভাবে সমগ্র মারাঠা রাষ্ট্রসংঘকে ইংরেজের কুক্ষিগত করতে সক্ষম হয়েছিলেন । পেশােয়া অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি নির্ধারণে সম্পূর্ণ ভাবে ইংরেজের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন । ঐতিহাসিক আওয়েন ( Owen ) এর ভাষায় : ” Previous by there existed British Empire in India . The treaty gave the company the empire of India .” অর্থাৎ এই চুক্তি ভারতের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে ভারতীয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে রূপান্তরিত করেছিল । ঐতিহাসিক এডওয়ার্সও বেসিনের চুক্তিকে ‘ দক্ষিণ ভারতে ব্রিটিশের সার্বভৌম ক্ষমতার সূচক ’ বলে অভিহিত করেছেন । আধুনিক গবেষকরা বেসিনের সন্ধির উপরােক্ত মূল্যায়নকে অতিশয়ােক্তি বলে মনে করেন । কারণ তারা চুক্তি করেছিল এমন এক পেশােয়ার সাথে , মারাঠা জাতির উপর যার কোনাে নিয়ন্ত্রণ ছিল না । তত্ত্বগত ভাবে পেশােয়া মারাঠা রাষ্ট্রসংঘের প্রধান হলেও , বাস্তবে মারাঠা নায়কদের উপর তার কোনাে কর্তৃত্ব ছিল না । একথা বহুলাংশে সত্য হলেও বেসিনের সন্ধির রাজনৈতিক গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না । মারাঠা রাষ্ট্রসংঘের প্রধান হিসেবে পেশােয়া কর্তৃক এই চুক্তি স্বাক্ষর নিঃসন্দেহে ইংরেজের প্রাধান্য ঘােষণা করেছিল । এই চুক্তি মারাঠাদের নগ্ন অন্তর্দ্বন্দ্ব , রাজনৈতিক দৈন্য ও দুর্বলতাকে প্রকাশ করে দিয়েছিল । পেশােয়ার মর্যাদাহানি সামগ্রিকভাবে মারাঠা জাতিকে যে দুর্বল করে দেবে , এটা অস্বাভাবিক ছিল না । তা ছাড়া এই সন্ধির বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসার জন্যই মারাঠাদের তৃতীয় ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধের সৃষ্টি করতে হয়েছিল , যা তাদের সর্বনাশের চূড়ান্ত করেছিল । এই দিক থেকে বেসিনের সন্ধি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ । 

দ্বিতীয় ইঙ্গ মারাঠা যুদ্ধ

পেশােয়া ব্রিটিশ অধীনতা মেনে নিলেও অন্যান্য মারাঠা সর্দারেরা মারাঠা স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে প্রস্তুত ছিলেন না । সিন্ধিয়া , ভোঁসলে প্রমুখ সর্দারগণ ইংরেজের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হন । পেশােয়া দ্বিতীয় বাজীরাও নিজের ভুল বুঝতে পেরে ইংরেজের বিরুদ্ধে গােপন প্ররােচনা সৃষ্টি করেন । এইভাবে শুরু হয় ‘ দ্বিতীয় ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধ ’ ( ১৮০৩ খ্রিঃ ) । এই যুদ্ধে উত্তর ভারতে লর্ড লেক এবং দক্ষিণ ভারতে অর্থার ওয়েলেসলি ইংরেজ বাহিনীর সেনাপতি নিযুক্ত হন । ওয়েলেসলি অসই ( Assy ) – এর যুদ্ধে সিন্ধিয়া ও ভোঁসলেকে পরাজিত করেন । ভোঁসলে যুদ্ধ ত্যাগ করে ইংরেজের সাথে দেওগাঁও -এর সন্ধি স্বাক্ষর করেন । বালেশ্বর ও কটক ইংরেজের হস্তগত হয় । দৌলত রাও সিন্ধিয়া একাই উত্তর ভারতে যুদ্ধ চালিয়ে যান । কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি লেক -এর হাতে প্রতাপগঞ্জ ও লসওয়ারির যুদ্ধে পরাজিত হয়ে ‘ সুর্জি-অর্জুনগাঁও -এর সন্ধি ’ স্বাক্ষর করেন এবং ব্রিটিশ অধীনতা মেনে নেন । তিনি মুঘল বাদশার উপর থেকে মারাঠা নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার করে নেন । লর্ড লেক দিল্লিতে গিয়ে মুঘল বাদশাহকেও ইংরেজ কর্তৃত্ব মেনে নিতে বাধ্য করেন । এতদিন যশােবন্ত রাও হােলকার নিশ্চপ ছিলেন । কিন্তু এখন তিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরে যুদ্ধ প্রস্তুতি শুরু করেন । ভরতপুরের রাজার সাথে মিত্রতা স্থাপন করে তিনি ইংরেজ বাহিনীকে আক্রমণ করেন । মাঝপথে ভরতপুরের রাজা যুদ্ধ ত্যাগ করে ইংরেজের পক্ষ গ্রহণ করেন । মিত্রহীন হােলকার পাঞ্জাবের শিখ নেতা রঞ্জিত সিংহের মিত্ৰতালাভের চেষ্টা করেন । কিন্তু রণজিৎ সিংহ ইংরেজের বিরুদ্ধাচরণ করতে অস্বীকার করেন । ফলে হােলকার একাই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে মনস্থ করেন । কিন্তু নবাগত গভর্নর জেনারেল জর্জবার্লো মারাঠা যুদ্ধের অবসান ঘােষণা করেন । হােলকারের সাথে ‘ রাজপুর ঘাটের সন্ধি ’ স্বাক্ষরিত হয় । সিন্ধিয়া ও ভোঁসলে কিছু রাজ্য ফিরে পান । অবশ্য পেশােয়ার সাথে স্বাক্ষরিত ‘ বেসিনের সন্ধি ’ অপরিবর্তিত থাকে । 

দ্বিতীয় ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধের গুরুত্ব 

দ্বিতীয় ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধের ফলে ভারতের মাটিতে ব্রিটিশ আধিপত্য আরও ব্যাপক ও সুদৃঢ় হয় । এই যুদ্ধের ফলে একদিকে যেমন ইংরেজের শক্তি ও সাম্রাজ্য বৃদ্ধি পেল , অপরদিকে তেমনি মারাঠাগণ এমন আঘাত পেল যে , তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল । ‘ বেসিনের সন্ধি ’ দ্বারা ইংরেজ পেশােয়ার সার্বভৌমত্ব লােপ করে । এবং ‘ সুর্জি-অর্জুনগাঁও -এর সন্ধি ’ দ্বারা লুপ্ত হয় মুঘল বাদশার স্বাধীন অস্তিত্ব । আচার্য যদুনাথ সরকারের  ভাষায় : “ The Treaty of Surji Arjangaon mark the true and of the Mughal Empire as a political institution .”

Leave a Comment

error: Content is protected !!