প্রথম কর্ণাটকের যুদ্ধ

প্রথম কর্ণাটকের যুদ্ধ

index 5
প্রথম কর্ণাটকের যুদ্ধ

মুঘল সাম্রাজ্যের পতনােন্মুখতার সুযােগে দক্ষিণ ভারতও অষ্টাদশ শতকে প্রায় স্বাধীন হয়ে গিয়েছিল । দাক্ষিণাত্যের মুঘল সুবাদার নিজাম-উল-মুলক ছিলেন কার্যত স্বাধীন । আবার তার অধীনস্থ আঞ্চলিক শাসকরাও প্রায় স্বাধীনভাবে রাজ্য পরিচালনা করতেন । দাক্ষিণাত্যের এ হেন রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার সুযােগে ফরাসি ও ইংরেজ বণিকেরা ওই অঞ্চলে স্ব স্ব বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপনে সমর্থ হয়েছিল । দাক্ষিণাত্যে ফরাসিদের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল পণ্ডিচেরী এবং ইংরেজদের প্রধান ঘাঁটি ছিল মাদ্রাজের সেন্ট ডেভিড । স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের স্বাধীনতাকামিতা , বিচ্ছিন্নতা ও পারস্পরিক মতভেদের সুযােগ নিয়ে উভয় বণিক সম্প্রদায়ই ভারতীয় রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করতে শুরু করে । অবশ্য তাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল স্ব স্ব বাণিজ্য বিস্তার করা । যাই হােক , ক্ষমতা দখলের জন্য এই অঞ্চলে ইংরেজ ও ফরাসি বণিকেরা তিনটি বড়াে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল । এগুলিই সাধারণভাবে ‘ কর্ণাটের যুদ্ধ ’ বা কর্ণাটকের যুদ্ধ ’ নামে খ্যাত । 

দাক্ষিণাত্যের এক অপ্রত্যাশিত রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মাঝে কর্ণাটকের প্রথম যুদ্ধের সূচনা ঘটে । দাক্ষিণাত্যের সুবাদার যেমন মুঘল বাদশাহকে অগ্রাহ্য করে কার্যত স্বাধীন হয়ে উঠেছিলেন , তেমনি কর্ণাটকের ( রাজধানী আর্কট ) নবাবও নিজামকে অগ্রাহ্য করে স্বাধীন কর্তৃত্বস্থাপনে সচেষ্ট ছিলেন । এমন সময়ে মারাঠারা কর্ণাটক আক্রমণ করে নবাব দোস্ত আলিকে হত্যা করে এবং নবাবের জামাতা চাঁদা সাহেবকে বন্দি করে সাতারায় নিয়ে চলে যায় ( ১৭৪০ খ্রিঃ ) । রাজ্যের উত্তরাধিকার নিয়ে সমস্যা দেখা দিলে নিজাম স্বয়ং এসে ( ১৭৪৩ খ্রিঃ ) আনওয়ারউদ্দিন নামক একজন দক্ষ কর্মচারীকে নবাব নিযুক্ত করেন । কিন্তু এতে সমস্যার সম্যক সমাধান হল না । কারণ দোস্ত আলির আত্মীয়বর্গ এবং চাঁদা সাহেব এতে খুবই রুষ্ট হন । 

আই – লা – স্যাপেলের চুক্তি

কর্ণাটকে যখন এরূপ রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে , তখনই ইউরােপে ‘ অষ্ট্রিয়ার উত্তরাধিকার সংক্রান্ত যুদ্ধ ’ ( ১৭৪০ খ্রিঃ ) শুরু হয় । এই যুদ্ধে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স ছিল বিরােধী পক্ষ । এই যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া স্বরূপ কর্ণাটকেও ইঙ্গ-ফরাসি সংঘর্ষ দেখা দিল । পণ্ডিচেরীর ফরাসি গভর্নর ডুপ্লে ( Duple ) ইউরােপে যুদ্ধ বাধলেও এদেশে নিরপেক্ষ থাকার পক্ষপাতী ছিলেন । কিন্তু ঘটনাচক্রে তা ব্যর্থ হয়ে যায় । ১৭৪৫ খ্রিস্টাব্দে নৌ-সেনাপতি বার্নেটের নেতৃত্বে এক ইংরেজ বাহিনী পণ্ডিচেরী আক্রমণ করে । এর বিরুদ্ধে ডুপ্লে কর্ণাটকের নবাবের দ্বারস্থ হন । নবাবের নির্দেশে ইংরেজবাহিনী পিছু হটে আসে । ইতিমধ্যে মরিশাসের ফরাসি গভর্নর লা-বুরদনের নেতৃত্বে এক বিরাট নৌবাহিনী ডুপ্লের সাহায্যে কর্ণাটে এসে উপস্থিত হয় । এবার লা-বুরদনের সাহায্যে ডুপ্লে ইংরেজ ঘাঁটি মাদ্রাজ অবরােধ করেন । এবারে ইংরেজগণ নবাবের সাহায্য প্রার্থনা করে । এবারেও আনওয়ারউদ্দিন ডুপ্লেকে অবরােধ তুলে নিতে আদেশ দেন । কিন্তু ডুপ্লে নবাবের আদেশে কর্ণপাত করলেন না । পরন্তু নবাবকে সন্তুষ্ট করার জন্য এই আশ্বাস দিলেন যে , মাদ্রাজ নবাবের হাতে তুলে দেওয়াই ফরাসিদের লক্ষ্য । কিন্তু শীঘ্রই এই আশ্বাসের অসারতা বুঝতে পেরে আনওয়ারউদ্দিন মাদ্রাজ  অবরােধকারী ফরাসি বাহিনীকে আক্রমণ করলেন । কিন্তু সংখ্যায় বেশি হলেও প্রাচীন যুদ্ধ-পদ্ধতিতে শিক্ষিত ভারতীয় বাহিনী সংখ্যাল্প থাকায় আধুনিক যুদ্ধকৌশলে রপ্ত ফরাসি বাহিনীর কাছে ‘ সেন্ট-টোম ’ – এর যুদ্ধে বিপর্যস্ত হয়ে গেল । অতঃপর মাদ্রাজ অধিকারের প্রশ্নে ডুপ্লের সাথে লা-বুরদনের তীব্র মতভেদ দেখা দেয় । ক্ষুব্ধ লা-বুরদনে তাঁর বাহিনী নিয়ে মরিশাসে ফিরে যান । ঠিক সেই সময়ে ‘ আই – লা – স্যাপেলের সন্ধি ‘ ( ১৭৪৮ খ্রিঃ ) দ্বারা ইউরােপীয় যুদ্ধের অবসান ঘটে । ফলে এখানে ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দ্বের অবসান হয় এবং উভয়েই অপরের অধিকৃত অঞ্চল প্রত্যর্পণ করে দেয় । 

প্রথম কর্ণাটকের যুদ্ধের গুরুত্ব  

আপাত দৃষ্টিতে কর্ণাটকের প্রথম যুদ্ধ ছিল নিষ্ফল । কারণ যুদ্ধান্তে পূর্বাবস্থাই বলবৎ হয়েছিল । কিন্তু একটু গভীরভাবে অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে , এই যুদ্ধ বহু মূলগত পরিবর্তন সাধন করেছিল । ভারতীয় শাসকদের রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির দুর্বলতা বিদেশি বণিকদের নিকট স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল । এদেশের রাজাদের অভ্যন্তরীণ বিরােধিতাকে কাজে লাগিয়ে ভারতে ক্ষমতাবিস্তার করা যে সহজতর , তা ইউরােপীয়দের কাছে প্রতিভাত হয়েছিল । তা ছাড়া মুষ্টিমেয় ফরাসি সৈন্যের হাতে বিশাল সংখ্যক নবাবি ফৌজ পরাজিত হবার ফলে , এ দেশের সামরিক দুর্বলতা সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়ে ডুপ্লে ভারতে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলে উৎসাহিত হয়ে উঠেন । বস্তুত প্রথম কর্ণাটক যুদ্ধের সাফল্যজনিত উচ্চাকাঙক্ষাই ডুপ্লেকে বাস্তবতাবর্জিত নীতি গ্রহণে প্রলুব্ধ করেছিল । তাই ডডওয়েল ( Dodwell ) বলেছেন : “ fin short it ( 1st Carnatic war ) set the stage for the experiments of Dupleix and accomplishment active , ” এই যুদ্ধে নৌশক্তির গুরুত্বও উপলব্ধি হয়েছিল ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!