মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ

মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ

index 2
মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ

১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে যার সূচনা , সেই মুঘল সাম্রাজ্যের অবসান ঘটল ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় বাহাদুর শাহের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে । ৩৩৬ বছর দীর্ঘ এই শাসনকালের প্রথম ১৮১ বছর অর্থাৎ ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু পর্যন্ত এদেশে প্রকৃত অর্থেই মুঘলদের শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল । কিন্তু পরবর্তী বছর গুলােতে চলছিল শাসনের নামে প্রহসন মাত্র । প্রথম ১৮১ বছরে মাত্র ছ’জন বাদশাহ গৌরবের সাথে শাসনতন্ত্রকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন , পরবর্তী একশত বছরে ( ১৭০৭-১৮০৬ খ্রিঃ ) এগারাে জন বাদশাহ তাকে অগৌরবের পঙ্কিল আবর্তে টেনে নামিয়ে আনেন , আর তারপরের শাসনকালে মুঘল শাসনের অস্তিত্ব ছিল কেবল কাগজে কলমে । গভীরভাবে অনুসন্ধান করলে ঔরঙ্গজেব পরবর্তীকালে মুঘল শাসনের এরূপ দ্রুত অবনতির বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ কারণের সন্ধান পাওয়া যায় । 

সাংগঠনিক ত্রুটি 

মুঘল সাম্রাজ্যের দুর্বলতার অন্যতম কারণ ছিল এর স্বৈরতন্ত্রী কাঠামো । কেন্দ্রীভূত স্বৈরতন্ত্রে সম্রাটের ব্যক্তিত্ব ও দূরদৃষ্টি সাম্রাজ্যের স্থায়িত্বের অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে বিবেচিত হয় । সেখানে জাতীয়তাবােধ বা গণ-আনুগত্যের তত্ত্ব অবান্তর । অথচ ঔরঙ্গজেবের উত্তরাধিকারীগণ ছিলেন দুর্বল ও অযােগ্য । এদের না ছিল চরিত্রবল , না ছিল মেরুদণ্ড । শক্তিশালী ও স্বার্থান্বেষী অভিজাতদের ক্রীড়নক হয়ে তুচ্ছ বিলাসব্যসনে নিমজ্জিত থাকতে তাদের বিবেক বা বুদ্ধিতে বাধত না । ঔরঙ্গজেবের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বাদশাহদের এই চারিত্রিক বৈপরীত্য প্রসঙ্গে জনৈক ঐতিহাসিক মন্তব্য করেছেন , “ ঈগল পাখির বাসায় যেন জুটেছিল প‍্যাঁচা , আর কোকিলের জায়গায় কাক । ” বাদশাহদের এই অক্ষমতার সুযােগে দাক্ষিণাত্য , মালব , গুজরাট , বাংলাদেশ প্রভৃতি স্থানে মুঘল কর্তৃত্ব ক্রমশ ক্ষীণ হতে শুরু করে । ক্রমে তা ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে । 

উত্তরাধিকার আইনের অভাব 

মুঘল রাজবংশে কোনাে সুস্পষ্ট উত্তরাধিকার আইন ছিল না । সাধারণভাবে সম্রাটই তার উত্তরাধিকারী মনােনীত করতেন এবং এক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠপুত্রের দাবি বিবেচিত হত সর্বাগ্রে । কিন্তু এটা কার্যকরী হওয়া নির্ভর করত সম্রাট ও যুবরাজদের সদিচ্ছার উপর । এরূপ পরিস্থিতিতে সিংহাসনকে কেন্দ্র করে উত্তরাধিকার যুদ্ধ বা ভ্রাতৃবিরােধ ছিল স্বাভাবিক । এমনকি যুবরাজরা স্বয়ং সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হতেও দ্বিধা করেননি । আকবরের আমল থেকেই এই ধরনের সম্ভাবনার পূর্বাভাস পাওয়া যায় । এটি চরম দুঃখজনক রূপ লাভ করে শাহজাহনের আমলে , যখন তার জীবিতাবস্থাতেই তার চার পুত্র রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হন । পরবর্তী কালেও এই ধরনের পুনরাবৃত্তি দেখা যায় । স্বয়ং রাজপরিবারের এহেন দ্বন্দ্ব ও যুদ্ধ বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলিকে উৎসাহিত করে এবং প্রশাসনের শৃঙ্খলাকে ভেঙে দিয়ে অবক্ষয়কে অনিবার্য করে তােলে । 

অভিজাতদের গােষ্ঠীদ্বন্দ্ব 

মুঘল শাসনকাঠামােয় অভিজাত শ্রেণীর ভূমিকা ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ । অভিজাতরা ছিলেন সাম্রাজ্যের স্তম্ভস্বরূপ । মুঘল শাসনের প্রথম দিকে আব্দুর রহমান খাঁ , মহাবৎ খাঁ , সৈদুল্লা প্রমুখ অভিজাতগণ তাদের বুদ্ধি বিবেচনা ও কর্মদক্ষতার দ্বারা মুঘল শাসনকে সুদৃঢ় ও গৌরবান্বিত করেছিলেন । কিন্তু ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পরে অযােগ্য ও অদক্ষ শাসকদের আগমনের ফলে অভিজাত শ্রেণীর মধ্যেও নৈতিক অধঃপতন শুরু হয় । মুঘল দরবারে দল ও রাজনীতি ছিল পূর্বেও । কিন্তু তাকে সংযত রাখার দক্ষতা বাদশাহের ছিল । ঔরংজেবের পরে দরবারের এই গােষ্ঠীদ্বন্দ্ব এত প্রকট হয়ে ওঠে যে , তার প্রভাব পড়ে রাষ্ট্রের অস্তিত্বের ওপর । ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দের পরবর্তীকালে মুঘল অভিজাতরা মূলত তিনটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন ; যথা ইরানি , তুরানি এবং হিন্দুস্থানি । এই দলগুলি রাজনৈতিক প্রতিপত্তি লাভের জন্য সর্বদা পারস্পরিক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকত । এমনকি সম্রাটও এদের ষড়যন্ত্রের শিকারে পরিণত হতেন । সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয় , নিজাম-উল-মুল্ক , ইমাদ-উল-মুল্ক , জুলফিকার খাঁ , কোকলতাস খাঁ , প্রমুখ অভিজাতগণ কেবল ষড়যন্ত্রের মাধ্যমেই এক এক সময়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে অধিষ্ঠিত হয়েছেন , আবার পতনও ঘটেছে । অভিজাতদের গােষ্ঠীদ্বন্দ্ব দরবারের চার দেওয়াল অতিক্রম করে স্পর্শ করে রাজনৈতিক , প্রশাসনিক , সামাজিক , অর্থনৈতিক প্রভৃতি রাষ্ট্র জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও । সর্বত্র উদ্ভব হয় গােলযােগপূর্ণ অবস্থার , যা রাষ্ট্রীয় জীবনকে বিপর্যস্ত করে তােলে । আচার্য যদুনাথ সরকারের  ভাষায় : “ গােষ্ঠীদ্বন্দ্ব রাষ্ট্রের সার্থকে প্রচণ্ডভাবে আঘাত করে এবং সাম্রাজ্যের পতনকে ত্বরান্বিত করে ( ” … the party conflicts adversely affected the interests of the state and accelerated the downfall of the empire . ” ) । 

জায়গিরদারী সংকট

জায়গিরদারীর সংকট মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের জন্য বহুলাংশে দায়ী ছিল । অভিজাতদের চাহিদার তুলনায় জায়গিরের স্বল্পতা এই সংকট সৃষ্টি করে।শাহজাহান -এর আমলে এই সংকট ব্যাপক ছিল , কিন্তু তিনি কয়েকটি ব্যবস্থার মাধ্যমে একে প্রশমিত করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন । ঔরঙ্গজেবের পরবর্তীকালে এই সংকট ভয়ানক আকার লাভ করে । বাদশাহের দুর্বলতার কারণে অভিজাতগণ উত্তরােত্তর ক্ষমতালিপ্সু ও বিলাসপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকেন । অথচ প্রতিদিনই জায়গিরযােগ্য জমির পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছিল । এই অবস্থায় নিজেদের আর্থিক প্রয়ােজনে খালিসা জমিকেও জায়গিরে রূপান্তরিত করার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছিল । এর ফলে সরকারের আয় দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে । একই সঙ্গে জায়গির লাভের জন্য অভিজাতদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বৃদ্ধি পেতে থাকে । হিন্দুদের জায়গির থেকে বিতাড়িত করার জন্য ধর্মের দোহাইও দেওয়া হয় । দক্ষিণী অভিজাতদের জায়গির লাভের ফলে অন্যান্যরা প্রচণ্ড রুষ্ট হয় । এইভাবে জায়গিরযােগ্য জমির স্বল্পতা এবং জায়গির লাভের জন্য অভিজাতদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা রাজনৈতিক সংকট বৃদ্ধি করতে থাকে , যা মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পথকে প্রশস্ত করে । 

জমিদারি ব্যবস্থার প্রভাব

মুঘল যুগে ভারতের সমাজ , রাজনীতি ও অর্থ ব্যবস্থায় জমিদার শ্রেণির একটি বিশেষ ভূমিকা ছিল । ভারতে মুসলমান শাসনের আগে থেকেই জমিদারদের অস্তিত্ব ছিল । তারা বংশানুক্রমে জমি ভােগদখল করত এবং সরকারকে শর্তানুযায়ী রাজস্ব দিত । আকবর জমিদারদের স্বাধীন ও স্বতন্ত্র সত্তা হ্রাস করার উদ্দেশ্যে তাদের মনসবদার হিসাবে নিয়ােগে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন । কিন্তু তা সত্ত্বেও জমিদারদের স্বাতন্ত্র্য ও আধিপত্য হ্রাস করা সম্ভব হয়নি । অধ্যাপক নুরুল হাসান -এর মতে , কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা এবং জমিদারি প্রথার মধ্যে একটা স্বতঃবিরােধিতা সব সময়েই ছিল , যা মুঘলদের আমলেও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার জন্য বহুলাংশে দায়ী । তার ভাষায় : ” …the inherent Contradictions between a centralised empire and the Zaminders were too deep to be resolved . These Contradictions within the Mughal Empire contributed to its downfall …..”।

কৃষক বিদ্রোহ 

জায়গিরদারীর সংকট ও তার জন্য কৃষক অসন্তোষ ও বিদ্রোহ মুঘল সাম্রাজ্যের অবনতির পথকে প্রশস্ত করে । সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে ভারতীয় কৃষকদের অবস্থা অত্যন্ত শােচনীয় হয়ে উঠেছিল । নতুন ইজারা ব্যবস্থা প্রবর্তিত হওয়ার ফলে এক শ্রেণির ভূঁইফোড় ইজারাদারের আবির্ভাব ঘটে , যারা উত্তরােত্তর শােষণ দ্বারা কৃষকদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল । ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর ভূমি রাজস্বের হার ভীষণভাবে বৃদ্ধি পায় । এ অবস্থায় কৃষক শ্রেণী ক্রমশ বিক্ষুব্ধ হতে থাকে এবং পরিণতিতে তারা বিদ্রোহে শামিল হয় । বাবর -এর আমল থেকেই কৃষক অসন্তোষ শুরু হয় এবং ঔরঙ্গজেবের পরবর্তীকালে তা ব্যাপক আকার ধারণ করে । এগুলির মধ্যে আগ্রা ও থাট্টার কৃষক বিদ্রোহ , কুচবিহার ও অসম সীমান্তের কৃষক বিদ্রোহ , মাতিয়া বিদ্রোহ প্রভৃতি উল্লেখযােগ্য । বহু কৃষক দস্যুতে পরিণত হয় এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী জমিদারদের নেতৃত্বে তারা পরিকল্পিতভাবে অরাজকতা সৃষ্টি করতে থাকে , এর ফলে প্রশাসনিক অস্থিরতার সঙ্গে সঙ্গে দেশের অর্থনীতিও আঘাত প্রাপ্ত হয় । 

দুর্বল উত্তরাধিকার 

স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থায় স্থায়িত্ব বহুলাংশে নির্ভর করে সুদক্ষ , বিচক্ষণ ও ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন শাসকের উপর । কিন্তু ঔরঙ্গজেবের পরবর্তী মুঘল শাসকরা প্রায় সবাই ছিলেন অযােগ্য , অপদার্থ , ব্যক্তিত্বহীন । কেউ কেউ ষড়যন্ত্র প্রিয় কিংবা বয়ঃভারে ন্যুজ । স্বভাবতই বিশাল সাম্রাজ্যের বহুমুখী সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা তাদের ছিল না । তাই অবক্ষয় ও পতন এসেছিল অনিবার্যভাবে । 

দুর্বল অর্থনীতি 

সুষ্ঠু অর্থব্যবস্থার অভাব ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় সামগ্রিক ভাবে মুঘল সাম্রাজ্যের পতনকে অবশ্যম্ভাবী করে তােলে । আকবরের পরবর্তীকালে মুঘল অর্থনীতি ক্রমশ ভুল পথে অগ্রসর হতে থাকে । ঔরঙ্গজেবের ব্যয়বহুল যুদ্ধনীতি অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সূচনা করে । পরবর্তীকালে অলস , অকর্মণ্য অথচ বিলাসপ্রিয় শাসকেরা রাজকোষের শূন্যতা মেটাতে কৃষক , শিল্পী ও বণিকদের উপর ক্রমাগত করের বােঝা বাড়িয়ে যেতে থাকেন ; অথচ কৃষি , শিল্প বা বাণিজ্য বৃদ্ধির কোনাে পরিকল্পনা গৃহীত হয় না । কৃষিপদ্ধতি ছিল অনুন্নত ও প্রকৃতি নির্ভর । শিল্প কারখানায় আধুনিক কলাকৌশল ও যন্ত্রপাতি ছিল অজানা । ফলে উৎপাদনের পরিমাণ ছিল খুব কম এবং তার মানও ছিল অনুন্নত । স্বভাবতই বহির্ভারতে ভারতীয় দ্রব্যের চাহিদা ছিল খুবই কম । অনুরূপভাবে উপযুক্ত পরিবহণ ব্যবস্থার অভাব ব্যবসা বাণিজ্যকেও সংকুচিত করে রেখেছিল । আর্থিক কাঠামাে সুদৃঢ় করার তিনটি অস্ত্রই তখন ছিল ভোতা । তাই দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ক্রমশ খারাপ হতে থাকে । 

সামরিক ত্রুটি 

মুঘল সামরিক বাহিনীর ত্রুটি সাম্রাজ্যের পতনের জন্য বহুলাংশে দায়ী ছিল । যেমন— 

( ক ) বিভিন্ন জাতির সমন্বয়ে গঠিত হওয়ার ফলে বাহিনীর মধ্যে জাতিগত একাত্মতা গড়ে উঠেনি । 

( খ ) সেনাবাহিনী মনসবদার বা নায়কদের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে থাকার ফলে তাদের উপর সম্রাটের নিয়ন্ত্রণা ছিল খুবই কম ।

( গ ) মুঘল সামরিক বাহিনীর ক্ষিপ্রতা মূলত নির্ভর করত দ্রুতগতি সম্পন্ন অশ্বারােহী বাহিনীর উপর । কিন্তু রাজস্থান বা দাক্ষিণাত‍্যের পর্বতসংকুল অঞ্চলে এই অশ্বারােহী বাহিনী যথেষ্ট কার্যকরী ছিল না । 

( ঘ ) উপরন্ত সেনা শিবিরে ও যুদ্ধক্ষেত্রে নর্তকী , কৃতদাসের অবাধ উপস্থিতি ও মদ্যপানের ঢালাও প্রচলন সেনাবাহিনীর নৈতিক অধঃপতন ঘটিয়েছিল । ঐতিহাসিক আরভিন তাই মন্তব্য করেছেন , “ মুঘলগণ ব্যক্তিগতভাবে বীরত্বের পরিচয় দিলেও তাদের নিয়মশৃঙ্খলা ও সংগঠনী শক্তির অভাব এবং প্রয়ােজনের অধিক সাজসজ্জা মুঘলবাহিনীর অধঃপতনের কারণ হয়েছিল । ” 

দুর্বল সীমান্ত নিরাপত্তা  

মুঘল সম্রাটেরা উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত সুরক্ষা করার বিষয়ে মনযােগী না থেকে নিজেদের বিপদ ডেকে আনেন । উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত , পথ দিয়েই বারে বারে ভারতে বহিঃশত্রুর আক্রমণ ঘটেছে । এই সীমান্ত অঞ্চল সুরক্ষিত করার জন্য কান্দাহারের উপর কর্তৃত্ব জরুরি ছিল । কিন্তু জাহাঙ্গীরের আমলে কান্দাহার হাত ছাড়া হওয়ার পর তা পুনর্দখলের জন্য যথেষ্ট উদ্যোগ নেওয়া হয়নি । তা ছাড়া সীমান্ত অঞ্চলে উপজাতিদের দমন করতে বা মিত্রে পরিণত করার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা ওই অঞ্চলকে সর্বদা বিপদসংকুল করে রেখেছিল । ওই পথ ধরেই মুঘলদের বিরুদ্ধে ঘটেছিল বিদেশি আক্রমণ । 

জাতীয় চেতনার অভাব 

মুঘল সাম্রাজ্যের ভাঙনের কারণ তার সামাজিক কাঠামাের মধ্যেই নিহিত ছিল । একটা আধুনিক জাতি গড়ে ওঠার জন্য অন্যতম উপাদান হল জাতীয়তাবােধ । কিন্তু অষ্টাদশ শতকের ভারত সেই উপাদানে বঞ্চিত ছিল । তখন এদেশে বসবাসকারী সকলেই নিজেকে ভারতবাসী বলে মনে করতে পারেনি । অর্থাৎ সাংস্কৃতিক ঐক্য থাকলেও রাজনৈতিক সংহতিবােধের অভাব ছিল প্রকট , যা এর পতনকে ত্বরান্বিত করেছিল । 

নৌবাহিনীর অভাব 

উপযুক্ত নৌবাহিনীর অভাব মুঘল সাম্রাজ্যের পতনকে ত্বরান্বিত করেছিল । ঔরঙ্গজেবের সময় থেকে পরবর্তীকালে নৌবাহিনীর অভাব ভীষণ ভাবে অনুভূত হয়েছিল । পাের্তুগিজ জলদস্যুদের আক্রমণ বা ইউরােপীয় বণিকদের নিয়ন্ত্রণ করবার জন্য নৌবাহিনী ছিল অপরিহার্য । কিন্তু কোনাে মুঘল বাদশাহই এ বিষয়ে সচেতন ছিলেন না । 

সাম্রাজ্যের বিশালতা 

সাম্রাজ্যের বিশালতাও পরােক্ষভাবে স্থায়িত্বের পরিপন্থী হয়েছিল । উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের সুবিস্তৃত এই বিশাল সাম্রাজ্যে যােগাযােগ রক্ষা করাই ছিল দুরূহ । স্বভাবতই , কোনাে অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবােধ জাগ্রত হলে বা আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ব্যাহত হলে দূরবর্তী কেন্দ্র থেকে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ত । এতে উৎসাহ পেত বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতা । 

এইভাবে একাধিক অভ্যন্তরীণ ত্রুটি ও দুর্বলতার ফলে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছিল । এর সঙ্গে বহিরাগত কারণ যুক্ত হয়ে মুঘল সাম্রাজ্যের পতনকে সুনিশ্চিত করে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

x
error: Content is protected !!