ঔরঙ্গজেবের রাজপুত নীতি

ঔরঙ্গজেবের রাজপুত নীতি

images 4
ঔরঙ্গজেবের রাজপুত নীতি

ভারতের অন্যতম সাহসী ও যােদ্ধা জাতি হিসেবে রাজপুতরা বিশিষ্ট স্থানের অধিকারী । তাই ভারতে রাজনৈতিক কর্তৃত্বের প্রতিষ্ঠা ও স্থায়িত্বের ক্ষেত্রে রাজপুতদের সাথে শাসকগােষ্ঠীর মিত্রতা বা শত্রুতার সম্পর্ক বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ । রাজপুত জাতির রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও গুরুত্ব উপলব্ধি করেই আকবর রাজপুতদের সাথে মৈত্রী ও আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন । পরবর্তী সম্রাটদ্বয় জাহাঙ্গীর ও শাহজাহান , আকবরের নির্দেশিত ধারাকেই অনুসরণ করে চলেন । শাহজাহান নতুন করে কোনাে সম্পর্ক স্থাপন না করলেও স্থিতাবস্থা রক্ষা করে চলেন ।

ঔরঙ্গজেবের দৃষ্টিভঙ্গি 

ঔরঙ্গজেব রাজপুতদের বিষয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন । আকবরের মতাে দূরদর্শিতা তার ছিল না । তাই রাজপুত মিত্রতার প্রয়ােজনীয়তার পরিবর্তে রাজপুতদের ধ্বংস সাধনকেই তিনি সম্রাটের পবিত্র কর্তব্য বলে মনে করেন । তার রাজপুত নীতি প্রত্যক্ষত কোনাে ধর্মীয় বিরােধ থেকে সৃষ্ট না হলেও , এর পেছনে যে কোনােরূপ ধর্মীয় চিন্তা ছিল না , তা নয় । আসলে ঔরঙ্গজেব রাজপুতদের হিন্দুধর্মের প্রধান স্তম্ভ বলে বিবেচনা করতেন । যে ইসলামিক রাষ্ট্র  প্রতিষ্ঠা তার ধ্যান-জ্ঞান ছিল , তাতে হিন্দু ঐতিহ্য ও আচার-অনুষ্ঠানের বিনাশ ছিল আবশ্যিক । ঔরঙ্গজেব মনে করতেন যে , রাজপুতদের হীনবল করতে না-পারলে তার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে না , কারণ হিন্দু বিরােধী আইনকানুনের সবথেকে বড় বাধা হিসেবে দাঁড়াবে এই রাজপুতরা । তাই তিনি রাজপুতদের প্রতি বিদ্বেষমূলক আচরণ শুরু করেন । অবশ্য রাজত্বের প্রথম কুড়ি বছর ঔরঙ্গজেব রাজপুতদের প্রতি মিত্ৰতাপূর্ণ আচরণ করেন । সিংহাসন দখলের যুদ্ধে মারওয়াড়রাজ যশােবন্ত সিংহ দারা শিকোহর পক্ষ নিলেও ঔরঙ্গজেব তাকে ক্ষমা করেন এবং মনসবদার পদে নিযুক্ত করেন । অম্বরের রানা জয়সিংহও একজন বড়ো মনসবদার ছিলেন । কিন্তু এদের প্রতি ঔরঙ্গজেব সন্দিহান ছিলেন । তাই সুযােগ পাওয়া মাত্রই এঁদের ধ্বংস করতে তিনি উদ্যোগী হন । মারাঠা বীর শিবাজীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে মুঘলদের সাফল্য এনে দেন জয়সিংহ । কিন্তু শিবাজীর প্রতি তাঁর শ্রদ্ধাপূর্ণ ব্যবহার ঔরঙ্গজেবকে সন্ধিহান ও রুষ্ট করে । তিনি গােপনে বিষ প্রয়ােগ করে জয়সিংহকে হত্যা করেন । এই ঘটনা ঔরঙ্গজেব সম্পর্কে রাজপুতদের সচেতন করে তােলে । 

মারওয়াড়ের সাথে বিরােধ 

মারওয়াড় রাজ্যের অভ্যন্তরীণ একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজপুত-মুঘল সংঘর্ষের সূচনা ঘটে । মারওয়াড় রাজ্যের প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি ঔরঙ্গজেব সুনজরে দেখতেন না । তাই যশােবন্ত সিংহকে সুদূর উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে নিয়ােগ করে মারওয়াড়কে দুর্বল করে রাখতে চেয়েছিলেন । ১৭৬৮ খ্রিস্টাব্দে যশােবন্ত সিংহ অকস্মাৎ মারা গেলে ঔরঙ্গজেব অভূতপূর্ব দ্রুততার সাথে মুঘলবাহিনী পাঠিয়ে মারওয়াড়ের বিভিন্ন দুর্গ দখল করেন এবং সেখানে মুঘল কর্তৃত্ব স্থাপন করেন । যশােবন্তের মৃত্যুকালে তার কোনাে পুত্রসন্তান ছিল না । তার স্ত্রী ছিলেন সন্তানসম্ভবা । এই অবস্থায় ঔরঙ্গজেব একজন তাবেদারকে শাসনভার দিয়ে ওই রাজ্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিলেন । ঔরঙ্গজেব-নিযুক্ত ইন্দর সিংহ মুঘলদের ক্রীতদাসরূপে মারওয়াড়ের শাসন চালাতে থাকেন । কিন্তু ওই সময়ে প্রয়াত যশােবন্তের স্ত্রী দুটি পুত্রসন্তানের জন্ম দিলে অবস্থা জটিল হয়ে ওঠে । নবজাত পুত্রদের মধ্যে একজন মারা যায় । অপরজন অজিত সিংহকে মারওয়াড়ের উত্তরাধিকার মনােনয়নের দাবি নিয়ে যশােবন্তের বিধবা স্ত্রী ও পুত্রসহ মন্ত্রী দুর্গাদাস দিল্লিতে আসেন । কিন্তু অজিত সিংহ দিল্লির প্রাসাদে পালিত হবেন এবং ইসলামধর্ম গ্রহণ করবেন — এই শর্তে ঔরঙ্গজেব তাকে মারওয়াড়ের রাজা বলে মানতে রাজি হন । ঔরঙ্গজেবের দুরভিসন্ধি বুঝতে পেরে দুর্গাদাস কোনােরকমে অজিত সিংহ ও তাঁর মাতাকে নিয়ে মারওয়াড়ে ফিরে যান । সেখানে রাজপুত সর্দারের সাথে মিলিতভাবে অজিত সিংহকে ‘ মারওয়াড়ের রাজা ’ বলে ঘােষণা করেন । ক্রুদ্ধ ঔরঙ্গজেব তাঁর তিন পুত্রকে তিন দিক থেকে মারওয়াড় আক্রমণের নির্দেশ দেন । মুঘলবাহিনী বহু রাজপুতকে হত্যা করে এবং বহু মন্দির ধ্বংস করে । দুর্গাদাস অজিত সিংহকে নিয়ে মেবারে পালিয়ে যান ।

মেবারের সাথে বিরােধ  

মেবারের রানা ছিলেন অজিত সিংহের আত্মীয় । তাই দুর্গাদাস মুঘল বিরােধী যুদ্ধে তার সাহায্য প্রার্থনা করেন । এদিকে মেবারের রানা রাজসিংহও ঔরঙ্গজেবের উপর ক্ষুব্ধ ছিলেন । ঐতিহাসিক টড্ – এর মতে , ঔরঙ্গজেব মেবারের উপর জিজিয়া কর চাপালে রানা ভীষণ অপমানিত বােধ করেন । তা ছাড়া মারওয়াড়ের প্রতি ঔরঙ্গজেবের ব্যবহার তাকে শঙ্কিত করে তােলে । তিনি বুঝতে পারেন যে , মারওয়াড়ের পতন ঘটলে মুঘল থাবা থেকে মেবারও রেহাই পাবে না । তাই তিনি অজিত সিংহকে সাহায্য করতে রাজি হন । এবারে ঔরঙ্গজেব মেবার আক্রমণ করেন । মুঘলবাহিনী সহজেই মেবার জয় করে । মুঘল-সৈন্য শত শত মন্দির ধ্বংস করে ও বহু রাজপুতকে হত্যা করে । মেবারের দায়িত্ব পুত্র আকবরের উপর ন্যস্ত করে ঔরঙ্গজেব ফিরে যান । এই সময় রাজসিংহ আরাবল্লী পাহাড় থেকে গেরিলা পদ্ধতিতে আক্রমণ চালাতে থাকেন । এক আকস্মিক আক্রমণে বহু মুঘল সৈন্য নিহত হয় । এই সংবাদে বিচলিত হয়ে ঔরঙ্গজেব আকবরকে অপসারিত করে অপর পুত্র আজমকে মেবারের দায়িত্ব দেন । সম্রাটের এই বদলিতে অপমানিত হয়ে আকবর পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হন এবং রাজপুতদের সাথে যােগদান করেন । কিন্তু কূটকৌশলী ঔরঙ্গজেব এক কূটচালে আকবরের সাথে রাজপুতদের ভুল বােঝাবুঝির সৃষ্টি করেন । রাজপুতগণ আকবরকে পরিত্যাগ করে ; অবশ্য আকবরকে ঔরঙ্গজেবের হাতে তুলে দিয়ে তাকে শিবাজীর কাছে পাঠিয়ে দেয় । 

মেবারের সাথে সন্ধি 

দীর্ঘকাল যুদ্ধ চালিয়েও কোনাে ফল না-হওয়ায় ঔরঙ্গজেব রাজপুতদের সাথে সন্ধির প্রস্তাব করেন । তদনুযায়ী মেবারের রানা জয়সিংহের সাথে ঔরঙ্গজেবের এক সন্ধি স্বাক্ষরিত হয় ( ১৬৮১ খ্রিঃ ) । এই সন্ধি দ্বারা জয়সিংহকে ঔরঙ্গজেব মেবারের রানা বলে স্বীকার করে নেন এবং পাঁচ হাজারি মনসবদারি দেন । জয়সিংহ জিজিয়া করের পরিবর্তে কয়েকটি পরগনা মুঘলদের হাতে অর্পণ করেন । মুঘল-সৈন্য মেবার ত্যাগ করে । মেবার যুদ্ধবিরতি ঘােষণা করলেও মারওয়াড় ঔরঙ্গজেবের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে । অবশেষে ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর সম্রাট বাহাদুর শাহ অজিত সিংহকে মারওয়াড়ের রানা বলে স্বীকার করে নিতে বাধ্য হন । 

ঔরঙ্গজেবের রাজপুত নীতির ফলাফল  

ঔরঙ্গজেবের রাজপুত নীতি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় এবং পরিণামে সাম্রাজ্যের ক্ষতি করেছিল । 

প্রথমত , এই যুদ্ধের ফলে মুঘল রাজকোষের প্রচুর অর্থব্যয় হয়েছিল এবং বহু লােকক্ষয় হয়েছিল । যদুনাথ সরকারের ভাষায় – “ ঔরঙ্গজেবের রাজপুত যুদ্ধের ফলে সাম্রাজ্যের মর্যাদা তাে ক্ষুন্ন হয়েই ছিল ; বৈষয়িক ক্ষতির পরিমাণও কম ছিল না ” ( “ Damaging as this resalt was to imperial prestige , its material consequences were worse still . ” ) ।

দ্বিতীয়ত , রাজপুতদের প্রতি বৈরী-মনােভাবের ফলে মুঘল রাজতন্ত্র রাজপুত-জাতির সাহায্য ও সহানুভূতি থেকে বঞ্চিত হয়েছিল । যে রাজপুত-জাতির মৈত্রীর উপর নির্ভর করে আকবর মুঘল সিংহাসনকে নিরাপদ ও সুদৃঢ় করে তুলেছিলেন , হঠকারী ঔরঙ্গজেব তা বিনষ্ট করেন । আকবরের মৈত্রীনীতির ফলে টোডরমল , মানসিংহ প্রমুখ রাজপুত বীর মুঘল প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সাম্রাজ্যের ভিত সুদৃঢ় করেছিলেন । রাজপুত যােদ্ধাদের সহায়তায় সাম্রাজ্যের সীমানা প্রসারিত হয়েছিল । ঔরঙ্গজেবের অদূরদর্শিতার ফলে মুঘল সাম্রাজ্য রাজপুতদের সহযােগিতা থেকে বঞ্চিত হয়েছিল ।

তৃতীয়ত , দাক্ষিণাত্যে মারাঠাদের উত্থান ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে বিদ্রোহী আফগানদের কার্যকলাপ মুঘল-অস্তিত্বের বিপদ স্বরূপ ছিল । ওই দুই বিপদের বিরুদ্ধে রাজপুতদের সহযােগিতা মুঘল সাম্রাজ্যের পক্ষে অধিক কাম্য ছিল । কিন্তু ঔরঙ্গজেবের অদূরদর্শিতার ফলে তিনি তা হারান । 

চতুর্থত , দীর্ঘকাল রাজপুত যুদ্ধে ব্যাপৃত থাকার ফলে দক্ষিণে মুঘল শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে । ফলে ওই স্থানে মারাঠাদের উত্থান সহজতর হয় । এইভাবে তাঁর ভ্রান্ত রাজপুত নীতি মুঘল সাম্রাজ্যের ক্ষতিসাধন করে ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!