শিবাজীর নেতৃত্বে মারাঠা শক্তির উত্থান

শিবাজীর নেতৃত্বে মারাঠা শক্তির উত্থান

index 9
শিবাজী

শিবাজীর নেতৃত্বে মহারাষ্ট্রে মারাঠা শক্তির অভ্যুত্থান ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বিশেষ গুরুত্বপর্ণ ঘটনা । গ্রান্ড ডাফ  মারাঠাদের উত্থানকে ‘ দাবানলের মতাে আকস্মিক ও স্বল্পস্থায়ী ’ একটি ঘটনা বলে উল্লেখ করেছেন । কিন্তু অন্যান্য বহু ঐতিহাসিক মারাঠা শক্তির অভ্যুত্থানের মধ্যে একটি পারম্পর্য , ধারাবাহিকতা ও উদ্দেশ্য লক্ষ্য করেছেন । জি. এস. সরদেশাই এর মতে , ভারতব্যাপী হিন্দুরাষ্ট্র স্থাপন করাই ছিল শিবাজীর চূড়ান্ত লক্ষ্য । তা ছাড়া শিবাজীর বহু পূর্বেই মারাঠাজাতির জাগরণ শুরু হয়েছিল । শিবাজী সেই জাগরণকে পূর্ণতা দিতে সচেষ্টা হয়েছিলেন । 

প্রভাব 

সমকালীন পরিস্থিতি ও আর্থ-সামাজিক প্রভাব শিবাজীর উত্থান ত্বরান্বিত করেছিল । 

প্রথমত , মুঘল সাম্রাজ্যের ভাঙনের ফলে বহু মারাঠা মুঘল সেনাবাহিনী থেকে কর্মচ্যুত হয়েছিল । মুঘল প্রশাসনের উপর ক্ষুব্ধ এই মারাঠা জনশক্তিকে শিবাজী ঐক্যবদ্ধ করে নিজের শক্তিবৃদ্ধি করতে পারেন । 

দ্বিতীয়ত , মারাঠা জাতির কোনাে রাজতান্ত্রিক ঐতিহ্য ছিল না , সামরিক দক্ষতা সত্ত্বেও এরা ছিল বিছিন্ন , বিক্ষিপ্ত । শিবাজীর নেতৃত্ব এদের মধ্যে রাজতন্ত্রের আশা জাগরিত করে । তাই মারাঠা জাতি খুব সহজেই শিবাজীর আহ্বানে ঐক্যবদ্ধ হয় । 

তৃতীয়ত , প্রাকৃতিক ও ভৌগােলিক প্রভাব মারাঠাজাতির অভ্যুত্থানকে প্রভাবিত করেছিল । মহারাষ্ট্র ছিল পর্বতবেষ্টিত দেশ । উত্তর-দক্ষিণে প্রসারিত সহায়দ্রি পর্বতমালা এবং পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত সাতপুরা ও বিন্ধ্য পর্বতমালা মহারাষ্ট্রকে এক স্বাতন্ত্র্য দান করেছে । ভূমির অনুর্বরতা ও বৃষ্টিপাতের স্বল্পতা মারাঠাদের করেছে পরিশ্রমী , কষ্টসহিষ্ণু ও সংগ্রামী । সেইসঙ্গে সামাজিক সাম্য তাদের করেছে ঐক্যবদ্ধ । 

চতুর্থত , রামদাস , তুকারাম , বামন পণ্ডিত প্রভৃতি ধর্মগুরুর ঐক্যের বাণী ও মারাঠা সাহিত্য এবং ‘ পােবড়া ’ নামক বীরগাথা মারাঠাদের অতীত ঐতিহ্য প্রচার করে মারাঠাদের মনে জাতীয় ঐক্যের প্রেরণা জাগিয়ে তুলেছিল । অনিশ্চিত অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মারাঠাজাতি রাষ্ট্রীয় তত্ত্বকে আঁকড়ে ধরেছিল । শিবাজী তার অনন্য সাংগঠনিক প্রতিভার দ্বারা সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে মারাঠা ঐক্যের কাজকে বাস্তবায়িত করেন । 

রাজনৈতিক উত্থান  

শিবাজী রাজনৈতিক জীবনের প্রথম পর্যায়ে বিজাপুর সুলতানের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে নিজের শক্তিকে সুদৃঢ় করেন । বিজাপুর সুলতানের দুর্বলতার সুযােগে শিবাজী ‘ তােরনা ’ দুর্গটি দখল করেন ( ১৬৪৭ খ্রিঃ ) । রাজগড় , প্রতাপগড় ও রায়গড়ে তিনি একাধিক দুর্গও নির্মাণ করেন । শিবাজীকে শায়েস্তা করার জন্য বিজাপুর সুলতান তার পিতা শাহজীকে বন্দি করেন । শেষ পর্যন্ত শিবাজী তিনটি দুর্গ প্রত্যর্পণ করেন ও ভবিষ্যতে দুর্গ দখল করবেন না — এই প্রতিশ্রুতি দিলে শাহজী মুক্তি পান । পরবর্তী কয়েক বছর শিবাজী দুর্গজয়ের পরিবর্তে নিজ-শক্তিবৃদ্ধিতে আত্মনিয়ােগ করেন । ১৬৫৬ খ্রিস্টাব্দে শিবাজী চন্দ্ররাও মােরে নামক এক ক্ষমতাশালী জমিদারকে হত্যা করে জাবলী বা সাতারা দখল করেন । এর ফলে মােরে পরিবারের সঞ্চিত বহু ধনসম্পদ শিবাজীর হস্তগত হয় । এ ছাড়া জাবলীর বিরাট সংখ্যক মাওলী সেনাবাহিনীও শিবাজীর হস্তগত হয় । এই সময়ে বিজাপুরের সুলতানের মৃত্যুজনিত বিশৃঙ্খলার সুযােগে শাহজাদা ঔরঙ্গজেব বিজাপুর আক্রমণ করেন । ফলে শিবাজীর সাথে মুঘলের প্রত্যক্ষ সংঘর্ষের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয় । কিন্তু শীঘ্রই ঔরঙ্গজেব সিংহাসন দখলের জন্য আগ্রা ফিরে গেলে শিবাজীর সামনে সুর্বণসুযােগ আসে । তিনি আহম্মদ নগরে মুঘল অধিকৃত গ্রাম ও দুর্গগুলি লুঠ করতে শুরু করেন । 

আফজল খাঁ হত্যা 

ইতিমধ্যে বিজাপুরের সাথে মুঘলদের এক সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়েছে । এবারে বিজাপুরের সুলতান শিবাজীকে দমন করার জন্য বিখ্যাত সেনাপতি আফজল খাঁ’কে নির্দেশ দেন ( ১৬৫৯ খ্রিঃ ) । আফজল খাঁ দম্ভভরে বলেছিলেন , তিনি ঘােড়া ছুটিয়ে যাবেন এবং ঘােড়া থেকে না নেমেই শিবাজীকে বন্দি করে ফিরে আসবেন । অবশ্য ফিরতে তাকে আর হয়নি । যাই হােক , আফজল খাঁ শিবাজীর অনেক গুলি দুর্গ দখল করতে সক্ষম হন । কিন্তু ‘ পার্বত্য মুষিক ’ শিবাজী গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকেন । এই অবস্থায় চক্রান্ত করে তিনি শিবাজীকে হত্যা করতে সচেষ্ট হন । এই উদ্দেশ্যে কৃষ্ণাজী ভাস্কর নামক এক পণ্ডিতকে দূতরূপে শিবাজীর কাছে পাঠান । উদ্দেশ্য ছিল শিবাজী আলােচনার জন্য এলেই তাকে অতর্কিতে আক্রমণ করা হবে । চতুর শিবাজী পূর্বেই এই চক্রান্তের কথা অনুধাবন করতে পারেন , এবং আফজল খাঁ আক্রমণের পূর্বেই শিবাজী ‘ বাঘনখ ’ ও ‘ বিছুয়া ’ নামক ছুরি দ্বারা আফজলকে হত্যা করেন । অতঃপর বিজাপুর বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে । শিবাজী কোলাপুর ও উত্তর কোঙ্কন দখল করেন । শেষ পর্যন্ত বিজাপুর সুলতান শিবাজীর সাথে সন্ধি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন ( ১৬৬২ খ্রিঃ ) । 

মুঘলের সাথে সংঘাত 

এদিকে দিল্লিতে উত্তরাধিকার সংক্রান্ত যুদ্ধ চলতে থাকার ফলে মুঘল শক্তি শিবাজীর ব্যাপারে নিস্পৃহ ছিল । ১৬৫৯ খ্রিঃ নিজেকে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত করার পর ঔরঙ্গজেব শিবাজীর অগ্রগতি রুখতে নতুন উদ্যোগ নেন । এজন্য তিনি মাতুল শায়েস্তা খাঁ কে দাক্ষিণাত্যের সুবাদার নিযুক্ত করেন ( ১৬৬০ খ্রিঃ ) । চতুর শিবাজী মুঘলবাহিনীর সাথে প্রকাশ্য সংঘর্ষে লিপ্ত না হয়ে অতর্কিত আক্রমণ দ্বারা তাদের নাজেহাল করতে থাকেন । এমনকি এক আক্রমণকালে শায়েস্তা খাঁর পুত্র শিবাজীর হাতে নিহত হন এবং শায়েস্তা খাঁ’র একটা আঙুল কাটা পড়ে । শায়েস্তা খাঁ’র ক্রমব্যর্থতায় মুঘল বাহিনীর মনােবল নষ্ট হতে থাকে । তাই ঔরঙ্গজেব শায়েস্তা খাঁ’র পরিবর্তে নিজপুত্র মুয়াজ্জমকে দাক্ষিণাত্যের সুবাদার নিযুক্ত করেন । সহকারী সুবাদার নিযুক্ত হলেন রাজপুত বীর জয়ংসিহ । এই বদলির সুযােগে শিবাজী মুঘলের সুরাট বন্দরটি লুণ্ঠন করে ( ১৬৬৪ খ্রিঃ ) প্রচুর ধনরত্ন লাভ করেন । সুরাটের বিত্তশালী বণিকেরাও শিবাজীকে প্রচুর অর্থ দিতে বাধ্য হন । ইউরােপীয় কুঠিগুলি কামান দেগে নিজেদের রক্ষা করেন । 

পুরন্দরের সন্ধি

জয়সিংহ ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ ও সাহসী সেনাপতি । তিনি বুঝতে পারেন , শিবাজী সাধারণ যােদ্ধা নন । তাই তিনি কূটকৌশলে শিবাজীকে দুর্বল করতে চেষ্টা করেন । প্রথমে তিনি বিজাপুর রাজ্যকে শিবাজীর পক্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন করেন । জায়গিরের লােভ দেখিয়ে কোনাে কোনাে মারাঠা সর্দারকেও মুঘলদের পক্ষে টেনে আনেন । অতঃপর পুরন্দর দুর্গে কামান অভিযান চালিয়ে শিবাজীকে পরাস্ত করেন । শিবাজী ‘ পুরন্দরের সন্ধি ‘ স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন । সন্ধির শর্তানুযায়ী শিবাজী ২৩ টি দুর্গ মুঘলদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেন এবং আগ্রায় যেতে সম্মত হলেন । জয়সিংহের চেষ্টায় তখন মারাঠা-মুঘল মিত্রতার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল । কিন্তু ঔরঙ্গজেবের মূর্খতায় তা ব্যর্থ হয়ে যায় । শিবাজী আগ্রা দরবারে এলে ঔরঙ্গজেব তার প্রতি অসৌজন্যমূলক ব্যবহার করেন এবং শিবাজী ও তার পুত্র শম্ভুজীকে কারারুদ্ধ করেন । কিন্তু শিবাজী কৌশলে পুত্র শম্ভুজীকে নিয়ে আগ্রা থেকে মহারাষ্ট্রে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন । স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পর কিছুদিন তিনি চুপচাপ থাকেন । 

শিবাজীর অভিষেক 

এদিকে মুঘল শক্তি উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে আফগান সমস্যায় বিব্রত হয়ে পড়ার ফলে শিবাজীর বিরুদ্ধে কোনাে ব্যবস্থা নিতে অক্ষম হন । শিবাজীও ‘ পুরন্দর সন্ধি ’ দ্বারা মুঘলকে ছেড়ে দেওয়া স্থানগুলি পুনর্দখল করতে থাকেন । অতঃপর ১৬৭৪ খ্রিস্টাব্দে রায়গড় দুর্গে শিবাজীর অভিষেক ক্রিয়া সম্পন্ন হয় । তিনি ‘ ছত্রপতি ’ উপাধি গ্রহণ করেন । 

শিবাজীর মৃত্যু 

রাজ্যভিষেকের পর শিবাজী , মাত্র ছয় বছর বেঁচেছিলেন । এই সময়ে তিনি বিজাপুর ও গোলকুণ্ডার বিরুদ্ধে একাধিক যুদ্ধে লিপ্ত হন । জিঞ্জি , ভেলাের ও মহীশূরের বৃহদংশ তিনি অধিকার করতে সক্ষম হন । ১৬৮০ খ্রিস্টাব্দে তাঁর দেহান্তর ঘটে । মৃত্যুকালে শিবাজীর রাজ্য উত্তরে সুরাট থেকে দক্ষিণে কানাড়া পর্যন্ত এবং পূর্বে বাগলানা থেকে পশ্চিমে আরব সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল । এ ছাড়া মহীশূরের কিয়দংশ তাঁর রাজ্যভুক্ত ছিল । 

এইভাবে শিবাজী মারাঠা রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন , — যা পেশােয়াদের আমলে বিশিষ্ট শক্তিতে পরিণত হয়েছিল ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!