দাঁতাত কী

দাঁতাত কী

বিশ শতকের সাতের দশকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঠান্ডা লড়াই ক্রমশ স্তিমিত হয়ে পড়ে । আন্তর্জাতিক ইতিহাসে এই পর্বটি ‘ দাঁতাত ’ নামে পরিচিত । অর্থাৎ পারস্পরিক বােঝাপড়ার মাধ্যমে স্বাভাবিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার সুপরিকল্পিত নীতিই হল ‘ দাঁতাত ’ । হেনরি কিসিংগারের  মতে — দাঁতাত হল প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘাত এবং সর্বোপরি পারমাণবিক যুদ্ধ এড়ানাের লক্ষ্যে চিরাচরিত প্রতিদ্বন্দ্বিতার বদলে পারস্পরিক শান্তিপূর্ণ সমঝােতায় গুরুত্ব আরােপ । 

দাঁতাত কথাটির অর্থ

দাঁতাত ’ ( Detente ) একটি ফরাসি শব্দ । এর অর্থ হল উত্তেজনা প্রশমন ( relaxation of tension ) । দাতাঁত হল সােভিয়েত-মার্কিন দুই মহাশক্তিধর রাষ্ট্রের মধ্যেকার বিরােধ ও তিক্ততার শিথিলিকরণ । দাঁতাত ( Detente ) এই শব্দটি প্রথম কূটনৈতিক অর্থে প্রয়ােগ করেন ফরাসি রাষ্ট্রপতি দ্য গ্যল । সাতের দশকে মার্কিন রাষ্ট্রপতি রিচার্ড নিক্সনের নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিংগার সােভিয়েত-মার্কিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘ দাঁতাত ’ নীতির প্রথম প্রয়ােগ করেন । ফরাসি রাষ্ট্রপতি দ্য গ্যল  এই নীতির ওপর ভরসা করে বলেছিলেন — পূর্ব-পশ্চিমের সম্পর্ক দাতাঁতের বিভিন্ন পর্বের মধ্যে দিয়ে স্বাভাবিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ হবে । 

দাঁতাত এর সূচনা

দাঁতাত ঠিক কোন বছর থেকে শুরু হয়েছিল তা নিয়ে মতভেদ আছে । কারও মতে ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে কিউবা সংকটকে কেন্দ্র করে , আবার কারও মতে ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকা ও সােভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার সময় থেকে দাঁতাত -এর সূচনা হয় । কিউবা সংকটকে কেন্দ্র করে সােভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল তার অবসান ঘটে সােভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির মধ্যে দিয়ে ।

দাঁতাতের বিভিন্ন পর্বকাল 

অধিকাংশ ঐতিহাসিক ১৯৭৯ খ্রি. থেকে ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালকে দাঁতাতের মূল পর্ব হিসেবে চিহ্নিত করেছেন । সমগ্র দাঁতাত অধ্যায়টি পাঁচটি বিভেদমূলক স্তর বা পর্বে বিভক্ত , যথা— 

1. মার্কিন-সােভিয়েত , 

2. পশ্চিম ইউরােপ-সােভিয়েত , 

3. মার্কিন-চিন , 

4. মার্কিন-পূর্ব ইউরােপ , 

5. সােভিয়েত চিন ইত্যাদি দ্বন্দ্বমূলক স্তর বা পর্ব । 

দাঁতাতের শ্রেণিবিভাগ 

দাঁতাত মূলত তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত , যথা — 

1. অর্থনৈতিক , 

2. সামরিক , 

3. সংস্কৃতি-বিজ্ঞানমূলক । 

দাঁতাত মূলত সামরিক দ্বন্দ্বমূলক সমস্যাগুলিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হলেও এর অপর দুই বিভাগও কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না । কারণ আর্থিক ক্ষেত্রে মার্কিন-সােভিয়েত লেনদেন বৃদ্ধি , বিজ্ঞান ও মহাকাশ গবেষণা দই রাষ্ট্রকে একে অপরের কাছাকাছি আসতে সাহায্য করেছিল ।

দাঁতাত এর বৈশিষ্ট্য

দাঁতাত রাজনীতির উল্লেখযােগ্য কয়েকটি বৈশিষ্ট্য হল — 

1. উভয়পক্ষ শক্তি জোট অক্ষুন্ন রেখে সামরিক বাহিনী ও অস্ত্রশস্ত্রের পরিমাণ কমিয়ে আনবে ।

2. উভয়ের মধ্যে আদর্শগত দ্বন্দ্ব বজায় রেখেও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান থাকবে । 

3. বিশ্বশান্তির লক্ষ্যে উভয় প্রতিপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা কমিয়ে এনে পারস্পরিক আস্থা ও সমঝােতার চেষ্টা চালু থাকবে ।  

4. দাঁতাতের জন্ম দু-পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহ ও ভীতি থেকে ; আস্থা থেকে নয় ।

5. কেবল আমেরিকা ও সােভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যেই নয় ; চিন ও আমেরিকা , সােভিয়েত ইউনিয়ন ও পশ্চিম ইউরােপ , আমেরিকা ও পূর্ব ইউরােপ প্রভৃতি আন্তর্জাতিক স্তরেও দাঁতাতের প্রয়ােগ ঘটেছিল । 

দাঁতাত এর প্রয়োগ

সােভিয়েত ইউনিয়নের দিক থেকে দাঁতাত নীতির প্রথম প্রয়ােগ করেছিলেন সােভিয়েত প্রধানমন্ত্রী নিকিতা ক্রুশ্চেভ । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ওই প্রস্তাবে সাগ্রহে রাজি হয় । 

1. ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে কিউবা সংকটকে কেন্দ্র করে ক্রুশ্চেভের অসাধারণ সংযম ও বিশ্বশান্তির প্রতি আগ্রহের ভূয়সী প্রশংসা করে মার্কিন রাষ্ট্রপতি কেনেডি বলেছিলেন , সােভিয়েত ইউনিয়ন ও ঠান্ডা লড়াই সম্পর্কে আমেরিকার ধারণার পরিবর্তন করার সময় এসেছে । মার্কিন মনােভাবের এই পরিবর্তন ওই দুই মহাশক্তিকে কাছাকাছি আসতে সাহায্য করেছিল । 

2. ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে মস্কোতে ব্রিটেন-সহ উভয় শক্তির মধ্যে ‘ সীমিত ভাবে পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ চুক্তি ‘ ( P.T.B.T. বা Partial Nuclear Test Ban Treaty ) সম্পাদিত হয় । 

3. মস্কো ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সরাসরি যােগাযােগ ব্যবস্থা , হট লাইন ( Hot line ) স্থাপন করা হয় ( সেপ্টেম্বর , ১৯৬৩ খ্রি. ) । 

4. ক্রুশ্চেভের পদত্যাগের ( ১৯৬৪ খ্রি. ) পর প্রধানমন্ত্রী কোসিগিন দাঁতাত নীতিই অনুসরণ করে চলেন । এরই প্রেক্ষিতে ১৯৬৮ খ্রিস ১ জুলাই উভয় শক্তি এক ‘ পরমাণু অস্ত্র সম্প্রসারণ রদকারী চুক্তি ’ ( N.PT. বা Treaty on the Non-proliferation of Nuclear Weapons ) স্বাক্ষর করে । 

5. ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে মস্কোতে দুই রাষ্ট্রপ্রধান নিকসন ও ব্রেজনেভ -এর মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘ স্ট্র্যাটেজিক আর্মস লিমিটেশন ট্রিটি ’ ( Strategic Arms Limitation Treaty বা , SALT-I ) র মাধ্যমে উভয় দেশ নিজ নিজ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ক্ষেপণাস্ত্র সীমিতকরণের ব্যাপারে রাজি হয় । 

6. এরপর ব্রেজনেভের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে পারমাণবিক যুদ্ধ নিষেধ-সংক্রান্ত আরও একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় । 

5. সবশেষে , ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে গর্বাচভ রুশ রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত হওয়ার পর দার্তাত প্রক্রিয়া এক নতুন মাত্রা পায় । দ্রুত গলতে থাকে ঠান্ডা লড়াইয়ের বরফ । তিনি ‘ গ্লাসনস্ত ’ ও ‘ পেরেস্ত্রোইকা ’ নীতির প্রয়ােগ ঘটিয়ে দাতাঁত প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণতা দেন । 

দাঁতাত এর ব্যর্থতার কারণ

দাঁতাত প্রক্রিয়া ব্যর্থতার অন্যতম কয়েকটি কারণ হল — 

ব্যর্থ নিরস্ত্রীকরণ প্রয়াস : 

পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযােগিতা কমানাের লক্ষ্যে বিভিন্ন চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ও সােভিয়েত রাশিয়া গােপনে নিজেদের পারমাণবিক শক্তিকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়াস নেয় । ফলে দাঁতাতের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয় । 

মতাদর্শগত সংঘাত : 

নিকিতা ক্রুশ্চেভের পর ব্রেজনেভ , অপরদিকে জিমি কার্টার বা রেগনের আমলে যথাক্রমে সােভিয়েত রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই দুই দেশের মধ্যে মতাদর্শগত সংঘাত আবার মাথা চাড়া দিলে দাঁতাতের সফলতা ব্যাহত হয় ।

বাণিজ্যিক লেনদেনের অভাব : 

সােভিয়েতের আর্থিক কাঠামাে ও আমেরিকার আর্থিক কাঠামাের মধ্যে বিস্তর ফারাকের জন্য দুই দেশের মধ্যে শেষপর্যন্ত বাণিজ্যিক যােগসূত্র রক্ষিত হয়নি , ফলে দাঁতাত প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয় । 

সমকালীন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি : 

আটের দশক থেকে মূলত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ঘটনাবলি দাঁতাতের পরিবেশকে নষ্ট করে । যেমন — আফগানিস্তানের ওপর সােভিয়েতের সামরিক হস্তক্ষেপ ; মার্কিন রাষ্ট্রপতি রেগনের নতুন বিদেশনীতি গ্রহণ ; নিকারাগুয়া , এল সালভাডাের ও গ্রেনেডাতে মার্কিন হস্তক্ষেপ এবং অ্যাঙ্গোলা ও মধ্যপ্রাচ্যে সােভিয়েত হস্তক্ষেপ দাঁতাতকে ব্যর্থ করে । 

উপসংহার 

বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে পুনরায় পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলির আস্ফালন শােনা যাচ্ছে , যেখানে কোনাে রাষ্ট্রই কারও বন্ধু নয় । সুতরাং , দাঁতাত প্রক্রিয়া বিশ্বরাজনীতির এক সাময়িক অবস্থা বলা চলে । এ প্রসঙ্গে বার্গম্যান এক সাবধান বাণী শুনিয়ে বলেছেন — মহাশক্তিধর দুটি দেশ যদি দাতাঁতকে এখনও গুরুত্বপূর্ণ বলে ভাবে তাহলে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের লােক দেখানাে প্রসাধন ছেড়ে প্রকৃত অর্থে নিয়ন্ত্রণের দিকে এগােতে হবে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

x
error: Content is protected !!