নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা

নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা

বিশ শতকের শেষ লগ্নে আন্তর্জাতিক রাজনীতির পট পরিবর্তন নতুন এক বিশ্ব ব্যবস্থা বা নয়া জমানার সূচনা ঘটায় । ঠান্ডা লড়াইয়ের অবসান তথা সােভিয়েত রাশিয়ার ভাঙনের ফলে সমগ্র বিশ্বজুড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বিস্তৃত হয় , ব্যাহত হয় বিশ্বের শক্তিসাম্য । বিশ্বরাজনীতির এই একমেরুকেন্দ্রিক রূপকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জর্জ এইচ. বুশ নয়া বিশ্ব ব্যবস্থা ( New World Order ) বলে অভিহিত করেছেন ।  

নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার মূল কথা

এই নয়া বিশ্ব ব্যবস্থার মূলকথা হল গণতন্ত্র , জাতীয়তাবাদ এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক সাহায্য ও বােঝাপড়া । তাই আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সংঘাতের পরিবর্তে দারিদ্র্য , ক্ষুধা , অশিক্ষা ও ব্যাধিমুক্ত এক নতুন বিশ্ব গড়ে তােলাই এই নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার লক্ষ্য । বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতি , অত্যাধুনিক যােগাযােগ ব্যবস্থা , রাষ্ট্রের পারস্পরিক বােঝাপড়া বিশ্বকে আজ অনেক নিকট করে দিয়েছে । এই নতুন বিশ্ব জুড়েই আজ মানুষের ঘর । শান্তি ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে সহযােগিতাই হল এর মূল মন্ত্র । 

নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য 

নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার কয়েকটি উল্লেখযােগ্য বৈশিষ্ট্য হল — 

বিশ্বে মার্কিন আধিপত্য প্রতিষ্ঠা : 

ঠান্ডা লড়াইয়ের অবসানের পর থেকেই বিশ্বজুড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় । বিশ্বরাজনীতিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র । মহাশক্তিধর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যে পরিমাণ পরমাণু বােমা মজুত রয়েছে তা দিয়ে সমগ্র বিশ্বকে একশােবার ধ্বংস করা সম্ভব । ফলে বিশ্বের অন্যান্য দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঔদ্ধত্য ও শক্তির কাছে অসহায় । যদিও রাশিয়া , চিন , ভারতের মতাে দেশগুলি বিভিন্ন ক্ষেত্রে আজ আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত । 

এশিয়া ও আফ্রিকার নবজাগরণ : 

অন্ধকারে ডুবে থাকা এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলি এক নতুন রূপে জেগে উঠতে শুরু করেছে । এশিয়ার চিন , সূর্যোদয়ের দেশ জাপান এত দ্রুত অর্থনৈতিক ও শিল্পে উন্নতি ঘটিয়েছে যে , তারা বিশ্ব অর্থনীতিতে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে । 

ইউরোপীয় সংহতি :

বিংশ শতকের দ্বিতীয় পর্বে ইউরােপের বহু দেশ উন্নয়নশীল অবস্থা থেকে উন্নত অবস্থায় পৌঁছে যায় । ইউরােপীয় ইউনিয়নকে কেন্দ্র করে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতার প্রসার ঘটতে শুরু হওয়ায় ইউরােপের সংহতি আরও মজবুত হয় ।

ইউরাে প্রচলন : 

বিংশ শতকের নতুন বিশ্বের এক নতুন ঘটনা ইউরােপের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা ইউরাের প্রচলন । ইউরােপ জুড়ে অভিন্ন মুদ্রা প্রচলন এক নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পথ খুলে দেয় । অভিন্ন ইউরােপীয় মুদ্রার প্রচলন হলে অর্থনৈতিক আদান প্রদান সহজে হবে বলে বিবেচিত হয় । 

বিশ্বায়ন : 

নতুন বিশ্ব ব্যবস্থায় বিশ্বায়ন ( Globalisation ) -এর হাত ধরে বিশ্বের বহু দেশ নতুন ভাবে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে পর্যন্ত যে চিন , জাপান , এমনকি ভারতকে বিশ্বের বৃহৎ শক্তিসমূহ হিসেবেই আনত না , তারাই আজ বিশ্বায়নের সুযােগে বিভিন্ন শিল্প , পণ্য উৎপাদন ও বাণিজ্যের মাধ্যমে বিশ্বে এক স্বতন্ত্র জায়গা করে নিয়েছে । বিশ্বায়নের মূল চারটি উপাদান উন্নত প্রযুক্তির প্রয়ােগ , বিশ্বজুড়ে পুঁজির বিনিয়ােগ , বিশ্বকেন্দ্রিক রাজনীতির প্রসার আর আন্তর্জাতিক পরিকল্পনা রূপায়ণ ইত্যাদি বিভিন্ন দেশে নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সাহায্য করছে ।

সন্ত্রাসবাদ ও তার প্রতিকার : 

নতুন বিশ্ব পরিস্থিতির সবথেকে বড়াে চ্যালেঞ্জ সন্ত্রাসবাদ রােধ । বিশ্বে নিজেদের নিরাপত্তাকে আরও সুনিশ্চিত করার জন্য অনুন্নত দেশগুলিও আজ নিরাপত্তা খাতে প্রচুর অর্থ খরচ করছে । বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জঙ্গি সংগঠনগুলি যেভাবে উদ্দেশ্যহীন নাশকতামূলক কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে তাতে নতুন বিশ্বব্যবস্থার নতুন সভ্যতাই বিপন্ন হয়ে পড়েছে । 

নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা

নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা বা নয়া জমানা যে ত্রুটি মুক্ত একথা বলা চলে না । কারণ —

1. বিশ্বজুড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এককেন্দ্রিকতা বিশ্বের সার্বিক উন্নয়নের পক্ষে শুভ নয় । 

2. নয়া জমানায় বা নতুন বিশ্বে ধনী দরিদ্রের বৈষম্য এখন আরও বৃদ্ধি পেয়েছে । জেম্‌স রসনুর  মতে —বিশ্বায়ন অনৈক্য সাধনকারী প্রবণতাকে প্রশ্রয় দিয়েছে । অর্থনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে এখনও ব্যর্থ তথাকথিত বৃহৎ শক্তিবর্গ । তাই উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে কিছু দেওয়া আর কিছু নেওয়ার মাঝে তৈরি হচ্ছে সমঝােতার সমীকরণ । 

3. নয়া জমানায় বিশ্বজুড়ে যে পুঁজিবাদী অর্থনীতির তত্ত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে তা আগামী দিনের অর্থনৈতিক সংঘাতকেই হাতছানি দেবে বলা যায় । অর্থনীতিবিদ ফ্রেড বার্গস্টেনের  মতে — নিরাপত্তা বিষয়ক আশঙ্কা দূর হলেই প্রকাশ্য অর্থনৈতিক সংঘাতের সূচনা ঘটতে পারে । 

উপসংহার 

আজ একবিংশ শতকের নয়া জমানায় যে হাওয়া বিশ্ব জুড়ে বইতে শুরু করেছে তাতে আগামী দিনে মার্কিন আধিপত্য বিনাশের অশনিসংকেত রয়েছে । তাই নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা এমন এক যুগসন্ধিক্ষণের মধ্যে অবস্থান করছে যখন বেশ কিছু পরস্পর বিরােধী উপাদান আলােছায়ার মতােই বিশ্বরাজনীতি তথা অর্থনীতিকে কখনও আলোকিত করছে আবার কখনও বা অন্ধকারাচ্ছন্ন করে ফেলছে ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!