দীন-ই-ইলাহি

দীন-ই-ইলাহি

ভারতের মুসলমান সম্রাটদের মধ্যে সম্রাট আকবর সর্বাধিক উদার ধর্মনীতিজ্ঞানের অধিকারী ছিলেন । একজন সুন্নি মুসলমান হিসেবে জীবন শুরু করে নানা অভিজ্ঞতার আলােকে তিনি এক ‘ সমন্বয়ী ধর্মবিশ্বাসে ’ ব্রতী হয়েছিলেন । তবে এটা কোনাে আকস্মিক ঘটনা নয় । আকবর আন্তরিকভাবেই বিভিন্ন ধর্মের স্বরূপ উদঘাটনে উদ্গ্রীব থাকতেন । আকবরের এই ধর্মীয় অনুসন্ধিৎসার কথা তার গোঁড়া সমালােচক বদায়ুনীও স্বীকার করেছেন । বদায়ুনী  লিখেছেন যে , “ আকবর উষাকালে প্রাসাদের নির্জন স্থানে নতমস্তকে ভাবাবিষ্ট হয়ে উপবেশন করে স্বর্গীয় আশীর্বাদ প্রার্থনা করতেন ” ( ” Akbar would sit many a morning alone in prayers and malancholy …. near the palace in a lonely spot with his head bent over his chest and gathering the bless of early hours . ” ) । বিভিন্ন ধর্ম বিশ্বাসের স্বরূপ উদঘাটনের এই অদম্য আকাঙ্ক্ষা তার ধর্মচিন্তায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সাহায্য করেছিল । সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল বিভিন্ন সামাজিক ও দার্শনিক প্রভাব , যা তাকে গোঁড়ামি বর্জিত , উদার ও সর্বজনীন ধর্মবিশ্বাসে আকৃষ্ট করেছিল ।

দীন-ই-ইলাহি ঘােষণা 

১৫৮২ খ্রিস্টাব্দ থেকে তার ধর্মজীবনের তৃতীয় বা শেষ পর্যায় শুরু হয় । ইবাদৎখানার আলােচনা থেকে তিনি বুঝেছিলেন যে , সব ধর্মেই ঈশ্বরের মহিমা প্রচার করা হয়েছে । তত্ত্বগত পার্থক্য থাকলেও প্রত্যেক ধর্মে কতকগুলি মৌলিক সত্য বিরাজ করেছে । তার মনে হয় , বিভিন্ন ধর্মের কল্যাণকর দিকগুলির সমন্বয় সাধন করতে পারলে মানবসমাজ উপকৃত হবে । এর পর ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে তিনি তার বিখ্যাত ‘ তৌহিদ ইলাহি ’ বা ‘ দীন-ই-ইলাহি ‘ মতবাদ ঘােষণা করেন । 

দীন-ই-ইলাহি মতাদর্শ 

আকবর প্রবর্তিত ‘ দীন-ই-ইলাহি ’ শব্দের অর্থ ‘ ঈশ্বরের আদেশ ’ । এই মতবাদে কোনাে দেবদেবীর স্থান ছিল না । সম্পূর্ণভাবে যুক্তিনির্ভর এই মতবাদে জাগতিক বিষয় সম্পর্কে উদারতা ও চারিত্রিক পবিত্রতার উপর সর্বাধিক জোর দেওয়া হয়েছে । ঐতিহাসিক ঈশ্বরীপ্রসাদের  মতে , “ দীন-ই-ইলাহি ছিল সকল ধর্মমতের সারযুক্ত সর্বেশ্বরবাদী ধারণা , যার অন্তর্ভুক্ত ছিল অতিন্দ্রীয়বাদ , দর্শন ও প্রকৃতিপূজা । এর নিজস্ব কোনাে তত্ত্ব , দেবদেবী বা প্রচারক ছিল না । সম্রাটই ছিলেন এই ব্যবহারিক দর্শনের একমাত্র প্রচারক ” ( ” Din – I – Ilahi was an eclectic pantheism containing the good of all religions – a combination of mysticism , philosophy and nature worship …. it upheld no dogma , recognised no gods or prophet and emperor was its chief exponent .” ) । 

এই মতবাদে ধর্মানুসরণের জন্য চারটি মার্গের কথা বলা হয়েছে , যথা — সম্পত্তি ত্যাগ , অহং ত্যাগ , মাশ্চর্য ত্যাগ এবং গোঁড়ামি ত্যাগ । দীন-ই-ইলাহিদের পালনীয় কর্তব্য সম্পর্কে বলা হয়েছে — গােমাংস তথা আমিষ ভক্ষণ থেকে বিরত থাকা , জন্মমাসে দান করা , দীন-দরিদ্র-আতুরকে সাধ্যানুযায়ী সেবা করা ইত্যাদি । ‘ দীন-ই-ইলাহি ’ গ্রহণে সম্রাটের অনুমতি ছিল বাধ্যতামূলক । যে কোনাে রবিবার এই ধর্মগ্রহণেচ্ছু ব্যক্তি নতজানু হয়ে সম্রাটের পায়ে মাথা রেখে ‘ আল্লাহু আকবর ’ অর্থাৎ ‘ ঈশ্বর মহান ’ এই শব্দটি উচ্চারণ করবেন । তারপর সম্রাট সেই ব্যক্তির মাথায় হাত রেখে তাকে দাঁড় করিয়ে দেবেন । অতঃপর ওই ব্যক্তি ‘ ইলাহি ’ সম্প্রদায়ভুক্ত বলে বিবেচিত হবেন ।

1 thought on “দীন-ই-ইলাহি”

  1. খুব ভালো প্রশ্ন এর উত্তর ।।। আমার খুব ভালো লাগলো পড়ে।।

    Reply

Leave a Comment

error: Content is protected !!