চীনের ৪ঠা মে আন্দোলন

চীনের ৪ঠা মে আন্দোলন

index 17
৪ঠা মে আন্দোলন

ভার্সাই সন্ধির দ্বারা জাপানকে শানটুং প্রদেশের অধিকার দান করা হলে চীনের পিকিং -এ ৫০০০ ছাত্র যে বিক্ষোভ সমাবেশ করে তা ৪ মে আন্দোলন বা মে ফোর্থ আন্দোলন নামে পরিচিত । আসলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে চীনের শানটুং প্রদেশটিকে জাপান ভার্সাই সন্ধির একুশ দফা শর্তের অন্যতম শর্ত হিসেবে লাভ করলে চীনের অখণ্ডতা , সংহতি ও সার্বভৌমত্ব বিনষ্ট হয় । এতে ক্ষুব্ধ হয়ে চিনের ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী গােষ্ঠী এই আন্দোলন গড়ে তােলে ( ১৯১৯ খ্রি. ৪ মে ) । 

চীনের ৪ঠা মে আন্দোলনের কারণ

চীনের ৪ঠা মে আন্দোলনের কারণ বা পটভূমি বিশ্লেষণে বলা যায় — 

অনুবাদ গ্রন্থ ও পত্রিকার প্রভাব : 

বিভিন্ন দেশের দর্শন , গণতন্ত্র , সমাজতন্ত্রবাদ ও বিজ্ঞানচেতনা বিষয়ক গ্রন্থগুলি চীনা ভাষায় অনূদিত হতে শুরু করে । পাই হুয়া ( চীনা কথ্যভাষা ) ভাষায় অনূদিত হয় জাগরণ ( The Awakenning ) , ‘ জ্ঞানের আলো ’ ( The lamp of knowledge ) , ‘ নতুন তারুণ্য ’ ( The new youth ) ইত্যাদি পত্রিকা । 

বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা : 

চীনের বুদ্ধিজীবী গােষ্ঠী বিশেষত পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক চেন তু শিউ নতুন তারুণ্য ( The new youth ) পত্রিকার সম্পাদকরূপে চীনের যুবসমাজে নতুন সাংস্কৃতিক ভাবাদর্শের প্রচার করেন ।

ভার্সাই চুক্তির দায়িত্ব : 

ভার্সাই সন্ধিতে চীনের অখণ্ডতা বিনষ্ট করা হয় । জাতীয় স্বার্থবিরোধী ভার্সাই সন্ধির বিরুদ্ধে তাই সমগ্র চীনজুড়ে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ মিছিল সংগঠিত হয় । 

চীনের ৪ঠা মে আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য

৪ মে আন্দোলনের উল্লেখযােগ্য কয়েকটি বৈশিষ্ট্য ছিল — 

জাপানি পণ্য বয়কট : 

চীনা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের নেতারা এই আন্দোলন চলাকালীন প্রতিবাদ স্বরূপ ধর্মঘট , মিছিল , জাপানি পণ্য বয়কট কর্মসূচি গ্রহণ করে । 

যৌথ স্বার্থের প্রকাশ : 

এই আন্দোলনের ফলস্বরূপ জাতীয় ও শ্রেণী স্বার্থের প্রকাশ ঘটে । জাঁ শ‍্যেনাের  মতে — জাতীয় ও শ্রেণী স্বার্থের এই যৌথ প্রকাশ ৪ মে আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল ।

চীনের ৪ঠা মে আন্দোলনের প্রকৃতি

এই আন্দোলনের প্রকৃতি বিশ্লেষণে দেখা যায় — 

ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীদের আন্দোলন : 

৪ মের আন্দোলন ছিল ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীদের আন্দোলন । 

আর্থ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব : 

সে সময়ে চীনের অধিবাসীদের মনােজগতে যে আর্থ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটেছিল তারই চরম পরিণতি ছিল ৪ মের আন্দোলন । 

রাজনৈতিক আন্দোলন : 

বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা গড়ে ওঠা এই আন্দোলন ক্রমশ সাংস্কৃতিক থেকে রাজনৈতিক চরিত্র লাভ করে । 

চীনের ৪ঠা মে আন্দোলনের গুরুত্ব

চীন দেশের ইতিহাসে ৪ মের আন্দোলনের গুরুত্ব ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ─

কমিউনিস্ট দল প্রতিষ্ঠায় : 

এই আন্দোলনের মাধ্যমেই চীনে কমিউনিস্ট দল প্রতিষ্ঠিত হয়। 

বিদেশি শক্তির স্বরূপ উন্মােচনে : 

এই আন্দোলনের মধ্যে দিয়েই চীনবাসী দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিদেশি শক্তিবর্গের অন্যায় দাবিগুলির স্বরূপ বুঝতে পারে । 

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে : 

এই আন্দোলন প্রমাণ করেছিল চীনবাসী নিজেদের দেশের উন্নতি ঘটিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকারে সক্ষম । 

উপসংহার 

৪ মে আন্দোলন চিনের ভৌমিক অখণ্ডতা রক্ষার পাশাপাশি আধুনিকীকরণের পথ প্রশস্ত করেছিল । এ ছাড়াও এই আন্দোলনের প্রভাবেই চীনা দেশীয় সাহিত্যে মানবতাবাদ , রােমান্টিকতাবাদ , জাতীয়তাবাদ প্রভৃতি নতুন ভাবধারার অনুপ্রবেশ ঘটে । এই আন্দোলন প্রসঙ্গে চীনা ঐতিহাসিক হাে কান চি  তাঁর ‘ A History of the Modern Chinese Revolution ‘ গ্রন্থে বলেছেন — দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ ৪ মের গণ আন্দোলন নতুন বিপ্লবী ঝড়ের জন্ম দিয়েছিল এবং চীনের বিপ্লবকে একটি নতুন স্তরে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল ( ‘ May 4th Movement marked the outbreak of a new revolutionary storm and the advance of the Chinese revolution to a new stage ‘ ) ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!