লং মার্চ কী

লং মার্চ কী

index 16
লং মার্চ

মাও জে দঙ -এর নেতৃত্বে চীনা কমিউনিস্টরা ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে চীনের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের কমিউনিস্টদের সঙ্গে যােগ দেবার উদ্দেশ্যে দক্ষিণ-পূর্ব চীনের কিয়াং সি প্রদেশ থেকে উত্তরে শেনসি পর্যন্ত যে দীর্ঘ ৬০০০ মাইল পদযাত্রা করেছিলেন , চীন তথা বিশ্বের ইতিহাসে তা লং মার্চ বা দীর্ঘ অভিযাত্রা নামে খ্যাত । ঐতিহাসিক ইমান্যুয়েল সু  লঙ মার্চের গুরুত্ব প্রসঙ্গে বলেছেন , ক্ষমতার শীর্ষে মাওয়ের উত্থান ও দলের ইতিহাসে এটি ছিল একটি উল্লেখযােগ্য ঘটনা ‘ … it was a landmark in the history of the party and in Mao’s rise to the pinnacle of power ‘ ।

লং মার্চ এর পটভূমি 

কিয়াং সি ও তার নিকটবর্তী এলাকায় কমিউনিস্টরা প্রচণ্ড শক্তিশালী হয়ে উঠলে প্রজাতন্ত্রী চীনের কমিউনিস্ট বিরােধী রাষ্ট্রপতি চিয়াং কাই শেক আতঙ্কিত হয়ে তাদের দমন করার জন্য সেনা পাঠান ( ১৯৩৪ খ্রি. ) । এদিকে ওই সময় জাপান মাঞ্চুরিয়া দখল করে উত্তর চীনের জোহাল পর্যন্ত ঢুকে পড়ে । কিন্তু চিয়াং জাপানের এই আগ্রাসনের কোনাে প্রতিকার না করে কমিউনিস্ট নিধনে অধিকতর সক্রিয় হয়ে ওঠেন । এই কারণে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই পদযাত্রাকারী কমিউনিস্টগণ তাদের পরিবার-পরিজনসহ কিয়াং সি ত্যাগ করে উত্তর চীনে পীত নদীর বাঁকে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ শেনসি প্রদেশ অভিমুখে দীর্ঘ পদযাত্রা শুরু করেন । 

লং মার্চ পদযাত্রায় অংশগ্রহণকারীগণ

মাও জে দঙ এবং চু-তের মিলিত প্রচেষ্টায় কমিউনিস্টদের ঐক্যবদ্ধ করে শুরু হয় লং মার্চ বা দীর্ঘ পদযাত্রা । লং মার্চ বা দীর্ঘ পদযাত্রায় প্রায় এক লক্ষ চীনবাসী অংশগ্রহণ করেন । পদযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৮৫ হাজার জন ছিলেন সেনা ( যারা এই আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন ) এবং ১৫ হাজার জন ছিলেন সরকারি ও কমিউনিস্ট দলের কর্মী । এদের মধ্যে ৩৫ জন ছিলেন মহিলা । 

পদযাত্রার বর্ণনা 

১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দের ১৫ অক্টোবর কিয়াং সি প্রদেশ থেকে শুরু হওয়া ওই পদযাত্রা শেষ হয় পরের বছর ২০ অক্টোবর । দীর্ঘ ওই ৩৭০ দিনের প্রবল দুঃখ দুর্দশার মধ্যে ১৮ টি গিরি শ্রেণি , ২৪ টি নদনদী অতিক্রম করে যখন তারা শেনসি প্রদেশের ইয়েনানে এসে পৌছােন ততদিনে এক লক্ষ মানুষের মধ্যে ৯২ হাজারই মৃত্যুবরণ করেছেন । ছ-হাজার মাইলের ওই দীর্ঘ পথে সেনাবাহিনীর সঙ্গে লড়াই করতে করতে তারা কোয়াং টুং , হুনান , কোয়াং সি , কোয়ােইচো , য়ুনান , সিকাং , জেকুরান , কানসু , শেনসি প্রভৃতি ১১ টি চিনা প্রদেশ অতিক্রম করেন ।

লং মার্চ এর গুরুত্ব 

অভিজ্ঞতায় : 

দীর্ঘ পদযাত্রায় কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দের কাছে নতুন করে ধরা দেয় তাদের দেশ , দেশের মানুষ ও বিভিন্ন জাতিগােষ্ঠী । ভবিষ্যৎ দেশগঠনের ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতা তাদের দারুণভাবে সাহায্য করে । 

কষ্ট সহিষ্ণুতায় : 

দীর্ঘ পদযাত্রার ওই অসহ্য পরিশ্রম চীনা কমিউনিস্টদের কষ্ট সহিষ্ণুতা ও নিয়মানুবর্তিতা সম্বন্ধে নতুন করে শিক্ষা দেয় । যা পরে কুয়ােমিনটাং বাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে তাদের শক্তি জুগিয়েছিল ।

অপ্রতিদ্বন্দ্বী মানসিকতা গঠনে : 

যে-কোনাে প্রতিরােধ বা বাধাকে তুচ্ছ করে অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানাে যায় দৃঢ় মানসিকতার সাহায্যে , তার উজ্জ্বল নিদর্শন এই পদযাত্রা । চীনের মাটিতে লালফৌজ যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী একথা প্রমাণিত হয় । 

সহানুভূতি লাভে : 

দীর্ঘ ওই পদযাত্রায় কমিউনিস্টরা সাধারণ মানুষের কাছে আন্তরিকভাবেই সহানুভূতি ও সাহায্য লাভ করে । যা ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে তাদের বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল । 

দক্ষতা ও আস্থা অর্জনে : 

লং মার্চ -এর ওই বিশাল সাফল্যের শেষে চীনা কমিউনিস্টরা যে-কোনাে সংকটকে অতিক্রম করার মতাে দক্ষতা ও আস্থা অর্জন করেছিল । 

এডগার স্নাের  মতে — লং মার্চ শুধুমাত্র নিরাপদ স্থানে পৌঁছােনাের প্রচেষ্টা ছিল না , তা ছিল একসঙ্গে দেশ , দেশবাসী এবং আরও অনেক কিছুকে নতুনভাবে আবিষ্কারের অভিযান ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!