কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সংকট কি

কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সংকট কি

images 9
কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সংকট

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে ক্যারিবিয়ান সাগরের বুকে কিউবায় ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি নির্মাণকে কেন্দ্র করে সােভিয়েত রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এক স্বল্পকালীন অথচ প্রবল দ্বন্দ্ব শুরু হয় । যার ফলে বিশ্ব এক পারমাণবিক যুদ্ধের মুখােমুখি এসে দাঁড়ায় । শেষ পর্যন্ত উভয় দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে শুভবুদ্ধির উদয় হওয়ায় বিধ্বংসী যুদ্ধের হাত থেকে বিশ্ব রক্ষা পায় । 

কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের পটভূমি

কিউবা স্পেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেওয়ার পর উন্নতির লক্ষ্যে মার্কিন মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে । এই সুযােগ নিয়ে মার্কিন পুঁজিপতিরা কিউবার অর্থনীতির মূল ভিত্তি আখের খেতের ৪০ ভাগ দখল করে নেয় । কিউবার ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমেরিকা তার অনুগামী ফ্যালজেনিকো বাতিস্তা কে রাষ্ট্রপতি পদে বসায় । কিন্তু মার্কিন পুঁজিবাদের তাঁবেদারে পরিণত হওয়ায় কিউবাবাসী বাতিস্তা সরকারের বিরুদ্ধে চলে যায় । এ. বালে. অ্যাডলফ  তাঁর ‘ The USA and Cuba ‘ গ্রন্থে লেখেন — কিউবাতে মূলত বহুদিন ধরেই সামাজিক এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তনসহ সামগ্রিক পরিবর্তনের প্রয়ােজন ছিল ( ‘ Wholesale social and economic changes were needed indeed , was long overdue – in Cuba ’ ) ।

ফিদেল কাস্ত্রোর ভূমিকা 

বাতিস্তা সরকারের জনবিরোধী কাজকর্মের প্রতিবাদে কিউবার তৎকালীন ছাত্রনেতা ফিদেল কাস্ত্রো তীব্র সরকার বিরােধী আন্দোলন গড়ে তােলেন । ক্রমশ জনসমর্থন আদায় করে এক বৈপ্লবিক অভ্যুত্থানের দ্বারা বাতিস্তা সরকারের পতন ঘটিয়ে কাস্ত্রো কিউবার ক্ষমতা দখল করেন ( ১৯৫৯ খ্রি. ১ জানুয়ারি ) । কিউবার রাষ্ট্রপতি কাস্ত্রো এরপর পুঁজিবাদী আমেরিকার দিক থেকে সরে এসে সাম্যবাদী সােভিয়েত রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তােলার উদ্যোগ নেন । এ উদ্দেশ্যে তিনি কিউবায় মার্কিন পুঁজিপতিদের চিনি কলগুলি জাতীয়করণ করেন । এর পাশাপাশি মার্কিন পুঁজিপতি গােষ্ঠীর পরিচালনাধীন ব্যাংক ও অন্যান্য শিল্পকেন্দ্রগুলিও জাতীয়করণ করেন । 

কাস্ত্রো অপসারণে আমেরিকার ভূমিকা 

আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র কাস্ত্রোর এরকম কার্যকলাপে অত্যন্ত ক্ষুদ্ধ হয়ে নানাভাবে কাস্ত্রো সরকারের পতনের পরিকল্পনা নেয় । মার্কিন গােয়েন্দা বিভাগের ( C.I.A. ) গােপন সহায়তায় ১,৫০০ ভাড়াটে সৈন্য মার্কিন জাহাজে করে কিউবার ফ্লোরিডা উপকূলের কাছে পিগ উপসাগরে পৌঁছােয় । কিন্তু কিউবার সেনাদল তাদের চূড়ান্তভাবে পরাজিত করলে মার্কিন চক্রান্ত ব্যর্থ হয় । 

কিউবায় ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি গঠন 

কাস্ত্রো সরকার ৫০ লক্ষ কিউবাবাসীকে রক্ষার জন্য সােভিয়েত রাশিয়ার সাহায্যে কিউবাতে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি গড়ার সিদ্ধান্ত নেয় । ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকে কিউবার রাষ্ট্রপতি ফিদেল কাস্ত্রো সােভিয়েত ইউনিয়ন থেকে মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ( IRBM অর্থাৎ Intermediary Range Ballistic Missiles ) গােপনে আমদানি করে কিউবাতে প্রতিস্থাপন করেছিলেন । এর আগে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির সবই ছিল তার দেশের মধ্যেই । তা ছাড়া সেগুলি ছিল সীমিত শক্তির । কাজেই বিদেশের মাটিতে এটিই ছিল রাশিয়ার প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি । 

আমেরিকার প্রতিক্রিয়া 

১৯৬২ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে আমেরিকা তার গুপ্তচর বিমানের তােলা ছবি থেকে জানতে পারে যে , কিউবায় সােভিয়েত ইউনিয়ন একটি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি তৈরি করেছে । কিউবা আমেরিকার দক্ষিণসীমা ফ্লোরিডা থেকে মাত্র ১৫০ কিলােমিটার দূরে অবস্থিত । কাজেই এখান থেকে নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্র তাে বটেই , সমগ্র পশ্চিম গােলার্ধের নিরাপত্তাই ব্যাহত করতে পারে । কিউবার বুকে সােভিয়েত রাশিয়ার এই প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিটি তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট কেনেডিকে অস্থির করে তােলে । 

কিউবা অবরোধ 

কালবিলম্ব না করে বিচলিত কেনেডি কিউবায় আর কোনাে ক্ষেপণাস্ত্র যাতে প্রবেশ করতে পারে সেজন্য তার চতুর্দিকে নৌ অবরােধের আদেশ দেন । সেই সঙ্গে ২২ অক্টোবর ( ১৯৬২ খ্রি. ) এক বেতার ঘােষণা মারফত বিশ্ববাসীকে এই ব্যবস্থার কথা জানিয়েও দেন । তিনি আরও ঘােষণা করেন যে , কিউবাগামী সমস্ত জাহাজ , এমনকি সােভিয়েত রাশিয়ার জাহাজও যথাযথ অনুসন্ধানের পরই কিউবায় ঢােকার অনুমতি পাবে । কেনেডি  বলেন — সকল আক্রমণাত্মক সামরিক সরঞ্জামের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে বাধা দেওয়া হবে ( Strict quarantine on all offensive military equipment )।

রাশিয়ার প্রত্যুত্তর 

কিউবায় অনুপ্রবেশ বিরােধী মার্কিন রাষ্ট্রপতি কেনেডির ঘােষণায় সােভিয়েত রাশিয়ায় মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় । সােভিয়েত সরকার তার সেনাবাহিনীকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেয় । সেনাবিভাগের কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয় এবং সবাইকে কাজে যােগ দিতে বলা হয় । এমনকি আসন্ন বিদায়ী কর্মচারীদের অবসরগ্রহণ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয় । সেইসঙ্গে রাশিয়া দৃপ্তকণ্ঠে জানিয়ে দেয় যে , কিউবাগামী কোনাে সােভিয়েত জাহাজ পথিমধ্যে বাধাপ্রাপ্ত হলে যেন সঙ্গে সঙ্গে গুলি চালানাে হয় । 

রাষ্ট্রসংঘের উদ্যোগ 

কিউবা , যুক্তরাষ্ট্র ও সােভিয়েত রাশিয়া তিনপক্ষই রাষ্ট্রসংঘে বিষয়টি উত্থাপন করে । রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিব উ থান্ট এবং বিশ্বের জোটনিরপেক্ষ বিভিন্ন রাষ্ট্র দুপক্ষের ( আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র , সোভিয়েত রাশিয়া ) কাছেই শান্তির জন্য অনুরােধ জানাতে থাকে । শেষ পর্যন্ত ২৭ অক্টোবর ( ১৯৬২ খ্রি. ) কুশ্চেভ কেনেডিকে জানান যে —

1.মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি কিউবা আক্রমণ না করার প্রতিশ্রুতি দেয় ; 

2. কিউবা থেকে যদি নৌ-অবরােধ প্রত্যাহার করা হয় এবং 

3. তুরস্ক থেকে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি যদি অপসারণ করা হয় তাহলে সােভিয়েত রাশিয়াও কিউবা থেকে সমস্ত সামরিক বাহিনী অপসারণ করবে । 

কিউবা ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের গুরুত্ব

কিউবা ক্ষেপণাস্ত্র সংকট সাময়িক হলেও এটির গুরুত্ব ছিল অসামান্য । 

যুদ্ধোদ্যোগ হ্রাস : 

এই সংকটের ফলেই শেষ পর্যন্ত মস্কো ও ওয়াশিংটনের তরফে যুদ্ধোদ্যোগ হ্রাস পেতে থাকে । 

মানবতার জয় : 

কিউবা সংকটকে কেন্দ্র করেই রুশ-মার্কিন উভয় পক্ষই আণবিক যুদ্ধের ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় । ফলে হিংসার বিরুদ্ধে সংযম , শুভবুদ্ধি ও মানবতাবাদ শেষ পর্যন্ত জয়যুক্ত হয় । ধ্বংসের হাত থেকে পৃথিবী রক্ষা পায় । 

পারস্পরিক আলোচনা :

উভয়শক্তিই এর পর থেকে পারস্পরিক আলােচনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সমস্যা সমাধানের পথ গ্রহণ করে । উভয়ের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠতে শুরু করে । 

পারমাণবিক পরীক্ষা নিরোধ চুক্তি : 

এই সংকটের এক গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি হল পারমাণবিক পরীক্ষা নিরােধ চুক্তি স্বাক্ষর । ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে সােভিয়েত রাশিয়া , আমেরিকা ও ফ্রান্সের মধ্যে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয় । 

হটলাইন স্থাপন :

এই সংকটের পরবর্তী সময় থেকে যে-কোনাে সংকটের সরাসরি সমাধানের জন্য হােয়াইট হাউস ও ক্রেমলিনের মধ্যে হটলাইন এর মাধ্যমে টেলিযোগাযোগ স্থাপিত হয় । 

কিউবায় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা : 

সবশেষে , ভৌগােলিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের এত কাছাকাছি একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে খুবই গুরুত্বপূর্ণ । উল্লেখ্য , কিউবাই হল পশ্চিম গােলার্ধের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র । 

উপসংহার 

অবশেষে ( ২০ নভেম্বর , ১৯৬২ খ্রি. ) সােভিয়েত রাশিয়া কিউবা থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি সরিয়ে নিলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও কিউবার বিরুদ্ধে নৌ অবরােধ তুলে নেয় । এইভাবে দুই মহাশক্তিশালী রাষ্ট্রের শুভবুদ্ধির প্রভাবে বিশ্ব একটি সর্বনাশা মহাযুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা পায় । কিউবা সংকট মিটে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও স্বস্তি ফিরে আসে । কিউবা সংকটের অবসানের পর থেকেই ওয়াশিংটন ( আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ) ও ক্রেমলিন ( সােভিয়েত রাশিয়ার রাজধানী ) -এর মধ্যে ঠান্ডা লড়াইয়ের বরফ গলতে শুরু করে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

x
error: Content is protected !!