তৃতীয় বিশ্ব বলতে কী বোঝায়

তৃতীয় বিশ্ব বলতে কী বোঝায়

images 8
তৃতীয় বিশ্ব

তৃতীয় বিশ্বের সংজ্ঞা

তৃতীয় বিশ্ব হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক নতুন ধারণা । এটির উদ্ভব বিংশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে । তৃতীয় বিশ্বের দেশ বলতে সেইসব দেশকেই বােঝায় যারা ছিল নিরপেক্ষ অর্থাৎ ধনতান্ত্রিক ( প্রথম বিশ্বের দেশ আমেরিকা ) ও সাম্যবাদ ( দ্বিতীয় বিশ্বের দেশ সােভিয়েত রাশিয়া ) আদর্শ অনুকরণে অনুৎসাহী । তবে তৃতীয় বিশ্বের সংজ্ঞা নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও রাষ্ট্রনীতি বিদদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে ।

ফ্যানন -এর সংজ্ঞা :

আলজিরিয়ার সাহিত্যিক ফ্রানজ ফ্যানন ‘ তৃতীয় বিশ্ব ’ কথাটি প্রথম ব্যবহার করেন ফ্যানন  তাঁর ‘ রেচেড অব দি আর্থ ’ গ্রন্থে এ সম্বন্ধে বলেছেন যে , রুশ-মার্কিন ঠান্ডা লড়াইয়ে উভয় জোটের বাইরে অর্থাৎ গণতান্ত্রিক ধনতন্ত্রবাদের জোট এবং সমাজতান্ত্রিক জোটের বাইরে এশিয়া , আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশগুলিকে নিয়েই তৃতীয় বিশ্ব গঠিত । তাঁর মতে পশ্চিমি শিবির হল ‘ প্রথম বিশ্ব ’; আর সমাজতান্ত্রিক শিবির হল ‘ দ্বিতীয় বিশ্ব ’। 

হরােউইজ -এর সংজ্ঞা : 

ফ্রম ইয়াল্টা টু ভিয়েতনাম ’ গ্রন্থে ডেভিড হরােউইজ একটা অর্থনৈতিক বিকাশের ভিত্তিতে তৃতীয় বিশ্বের অর্থ ব্যাখ্যা করেছেন । তিনি বলেছেন , যারা পুঁজিবাদ বা সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির বাইরে সম্পূর্ণ নিজস্ব ধারায় অর্থনৈতিক বিকাশের পথ অনুসরণ করেছে তারাই ‘ তৃতীয় বিশ্ব ’।

মিলার -এর সংজ্ঞা :

দি পলিটিক্স অব দ্য থার্ড ওয়ার্ল্ড ’ গ্রন্থে জে. মিলার এশিয়া ও আফ্রিকার সেইসব দেশকেই তৃতীয় বিশ্ব বলেছেন যারা কমিউনিস্ট বা পুঁজিবাদী শক্তির নিয়ন্ত্রণাধীন নয় । তিনি অবশ্য কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে লাতিন আমেরিকার দেশগুলিকে ‘ চতুর্থ বিশ্ব ’ নামে অভিহিত করেছেন । 

তৃতীয় বিশ্বের উদ্ভবের কারণ 

তৃতীয় বিশ্বের উদ্ভব ঘটেছিল বেশ কয়েকটি কারণে — 

ঔপনিবেশিকতাবাদ এর অবসান :

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রায় ৬৬ টি অনুন্নত দেশ ঔপনিবেশিক শােষণের কবল থেকে মুক্তি পায় । এশিয়া , আফ্রিকা , লাতিন আমেরিকার দেশগুলিতে ইংল্যান্ড , ফ্রান্স , বেলজিয়াম , নেদারল্যান্ডের ঔপনিবেশিকতাবাদ এর অবসান ঘটলে ওইসব সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশগুলি নতুন করে নিজেদেরকে সংগঠিত করার চেষ্টা করে । 

আটলান্টিক চার্টার -এর ভূমিকা : 

আটলান্টিক চার্টার বা আটলান্টিক সনদে বিশ্বের সব জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ঘােষিত হয় । ফলে আমেরিকার নিজের প্রচেষ্টায় তৈরি সনদের এই ধারা রক্ষার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন উপনিবেশকে স্বাধীনতা দেওয়ার জন্য ঔপনিবেশিক শক্তিগুলির ওপর চাপ সৃষ্টি করে । ফলে বিভিন্ন দেশ স্বাধীনতা পেয়ে আলাদা ভাবে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদ অনুভব করে । 

জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের ভূমিকা :

ঔপনিবেশিক দেশগুলি ঠান্ডা লড়াইয়ের আবর্তে নিজেদের নিক্ষেপ করে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে শামিল হয় । এই জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন এইসব দেশকে পৃথক পরিচিতি ( তৃতীয় বিশ্ব ) দান করে ।

তৃতীয় বিশ্বের বৈশিষ্ট্য

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির মধ্যেকার মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলি হল ―

ঔপনিবেশিকতাবাদ বিরােধিতা : 

এইসব দেশ একসময় ঔপনিবেশিক বা আধা-ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে থাকায় স্বাভাবিকভাবেই সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশিকতাবাদ বিরােধী । 

উন্নত কামী : 

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি অর্থনৈতিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়ার জন্য ছিল অতি দরিদ্র । তাই তারা স্বভাবতই উন্নত দেশগুলির মুখাপেক্ষী । 

কৃষিনির্ভর : 

কৃষিনির্ভর হলেও আধুনিক উন্নত প্রযুক্তিকে কাজে লাগানাের ক্ষেত্রে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি অনেকটাই পিছিয়ে । 

সামাজিক সমস্যা : 

শিক্ষা , জনস্বাস্থ্য , আবাসন — সমস্ত দিকেই কুসংস্কার , কূপমণ্ডুকতা এখানে এক সাধারণ বিষয় । 

শ্বেতাঙ্গ বিদ্বেষ : 

এখানকার অধিকাংশ মানুষই অশ্বেতকায় এবং এরা অত্যন্ত পশ্চিমি বিরােধী । 

জাতীয় স্বতন্ত্রতা : 

জাতীয় স্বাতন্ত্রের প্রতি এরা যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল এবং সমস্ত রকম পশ্চাৎপদতা কাটিয়ে উঠতে সদাসচেষ্ট । 

জোট নিরপেক্ষতা : 

তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশই জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত । 

প্রগতিমূলক : 

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি অর্থনীতিকে উন্নত করে সমাজ ও দেশের প্রগতির জন্য সদাসচেষ্ট ।

তৃতীয় বিশ্বের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তৃতীয় বিশ্বের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ —

শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা : 

ধনতন্ত্রী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সমাজতন্ত্রী সােভিয়েত রাশিয়ার মেরুকরণ রাজনীতির বাইরে থেকে এই তৃতীয় বিশ্বই হিংসা-জর্জরিত পৃথিবীর বুকে শান্তির বাতাবরণ সৃষ্টি করতে সদাসচেষ্ট । 

বিবাদ মীমাংসায় নিরপেক্ষতা : 

বৃহৎ শক্তির তাঁবেদারি না করে সত্যকে সমর্থন করাই তৃতীয় বিশ্বের অন্তর্ভুক্ত জোট নিরপেক্ষ দেশগুলির নীতি । তাই আন্তর্জাতিক বিবাদগুলির মীমাংসায় তৃতীয় বিশ্বের নিরপেক্ষ ভূমিকা প্রশংসার দাবি রাখে । দুই মহাশক্তিধর রাষ্ট্রও সময়ে সময়ে এদের সক্রিয় সাহায্যের আশায় উগ্রীব থাকে । 

বিভিন্ন সংস্থার প্রতিষ্ঠা : 

তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশ রাষ্ট্রসংঘে নিজেদের সমস্যা তুলে ধরেছে এবং সেই সব সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হয়েছে । এক্ষেত্রে যেসব প্রতিষ্ঠান তৃতীয় বিশ্বের উন্নতির লক্ষ্যে গঠিত হয়েছে সেগুলি হলো – UNCTAD ( United Nation Conference on Trade and Development ) , North-South Conference , South-South Cooperation , OAU ( Organisation for African Unity ) ইত্যাদি। আজকের পৃথিবীতে তৃতীয় বিশ্ব এক গুরুত্বপূর্ণ স্থানের অধিকারী ।

তৃতীয় বিশ্বের ঠান্ডা লড়াইয়ের প্রভাব

ঠান্ডা লড়াইয়ের আবর্তে জড়িয়ে পড়া : 

দুই বৃহৎ শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফলেই ঠান্ডা লড়াইয়ের উৎপত্তি । কিন্তু ওই দুই শক্তি কখনােই নিজেদের মধ্যে প্রত্যক্ষ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েনি । অথচ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির পক্ষে ঠান্ডা লড়াইয়ের আবর্ত থেকে দূরে সরে থাকা কিন্তু সম্ভব হয়নি । যেমন কোরিয়া সংকট , ভিয়েতনাম সংকট । 

আমেরিকা ও রাশিয়ার আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টা :

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে জাপান , ফ্রান্স ও ব্রিটেনের আধিপত্য বিলুপ্ত হয়েছিল । এর ফলে এশিয়া মহাদেশের এক বিশাল অংশে যে রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল তা পূরণের লক্ষ্যে এগিয়েছিল ধনতান্ত্রিক আমেরিকা বা সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া উভয় দেশই । ফলে ঠান্ডা লড়াইয়ের যে সূত্রপাত ইউরােপে হয়েছিল , তা ওই দুই মহাশক্তির হস্তক্ষেপে এবার এশিয়া মহাদেশেও ছড়িয়ে পড়ল । তৃতীয় বিশ্বও তা থেকে রক্ষা পেল না । দুই কোরিয়ার মধ্যে যুদ্ধ , সুয়েজ সংকট , আরব-ইজরায়েল বিরােধ , ভিয়েতনাম সংকট , ইরাক-ইরান যুদ্ধ , ইরাক-কুয়েত লড়াই , পাক-ভারত যুদ্ধ ইত্যাদি হল তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ । 

শক্তিজোট গুলোর প্রভাব :

নিজেদের স্বার্থে বৃহৎ শক্তিবর্গের গড়ে তােলা একাধিক শক্তিজোট তৃতীয় বিশ্বের ওপর ঠান্ডা লড়াইকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে । ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন মদতে কমিউনিস্ট চিনকে প্রতিরােধ ও ভিয়েতনামে কমিউনিস্ট আগ্রাসন রােধ করার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া চুক্তি সংস্থা ( SEATO ) । এ ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যে গড়ে তােলা হয় মধ্যপ্রাচ্য প্রতিরক্ষা সংস্থা ( MEDO ) ( ১৯৫৫ খ্রি. ) । পরবর্তীকালে এটির নাম হয় বাগদাদ চুক্তি বা সেন্ট্রাল ট্রিটি অর্গানাইজেশন ( CENTO ) । মধ্যপ্রাচ্যে রুশ আধিপত্য রােধ ও সেখানকার খনিজ তেল-সম্পদের ওপর মার্কিন কর্তৃত্ব স্থাপনই ছিল এটি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য । 

উপসংহার 

বৃহৎ শক্তিবর্গের মদতে কোরিয়ার যুদ্ধ , ভিয়েতনাম যুদ্ধ , সুয়েজ সংকট , আরব-ইজরায়েল সংঘর্ষ ইত্যাদির প্রেক্ষাপটে তৃতীয় বিশ্বের ওপর ঠান্ডা লড়াইয়ের প্রভাব ক্রমশ তীব্র আকার ধারণ করে । তবুও এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের অন্তর্গত বিভিন্ন দেশ ঠান্ডা লড়াইয়ের প্রভাবকে কাটিয়ে জাতীয়তাবাদ ও মানবতার বিজয়রথ । এগিয়ে নিয়ে চলেছে এবং বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় গৌরবজনক ভূমিকা পালন করে চলেছে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

x
error: Content is protected !!