ভারতীয় গণপরিষদের প্রকৃতি বা চরিত্র

ভারতীয় গণপরিষদের প্রকৃতি বা চরিত্র

ভারতীয় জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত যে সংস্থাটি দেশের সংবিধান রচনা করে , তা হল গণপরিষদ । গণপরিষদে একদলীয় , দক্ষিণপন্থী , পুঁজিবাদী শ্রেণির প্রতিনিধিবর্গেরও সমাবেশ ঘটেছিল । শতকরা চৌদ্দ ভাগ ভারতীয় নাগরিকের ভােটাধিকারের ভিত্তিতে গঠিত প্রাদেশিক আইনসভাগুলি গণপরিষদের সদস্যদের নির্বাচিত করে । ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট থেকে গণপরিষদ সার্বভৌম পরিষদের মর্যাদা লাভ করে ।

গণপরিষদের প্রকৃতি বিশ্লেষণে দেখা যায় —

জনপ্রতিনিধিত্বহীন 

ভারতীয় গণপরিষদকে কোনােভাবেই জনপ্রতিনিধিত্বমূলক বলা চলে না । কেননা সদস্যগণ ভারতীয়দের দ্বারা সরাসরি নির্বাচিত ছিলেন না । অর্থাৎ গণপরিষদের সদস্যগণ সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্কের ভােটাধিকারের ভিত্তিতে সরাসরি ভারতীয়দের দ্বারা নির্বাচিত হননি । তাই প্রকৃতিগত বিচারে গণপরিষদ জনপ্রতিনিধিত্বহীন এক পরিষদ । 

আইনবিদদের প্রাধান্য 

গণপরিষদ ছিল আইনবিদদের প্রাধান্য বিশিষ্ট এক পরিষদ । সংবিধান রচনার ক্ষেত্রে মূলত যে একুশজন সদস্য মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন , তার মধ্যে এগারাে জনই ছিলেন বিশিষ্ট আইনবিদ । এই আইনবিদগণ সংবিধান রচনার ক্ষেত্রে আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকেই বিভিন্ন ধারা-উপধারাগুলির বিচার বিবেচনাকে প্রাধান্য দিয়েছেন । আইভর জেনিংস  তাই গণপরিষদকে ‘ আইনজীবীদের স্বর্গ ’ বলে উল্লেখ করেছেন ।

একদলীয় 

সকল রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি না থাকায় ভারতীয় গণপরিষদ সর্বজনীন চরিত্র লাভ করতে পারেনি । দেশ বিভাগের ফলে লীগের সদস্যরা পাকিস্তানে চলে গেলে ভারতীয় গণপরিষদ সম্পূর্ণরূপে একটি একদলীয় সংস্থায় পরিণত হয় । সােমনাথ লাহিড়ি কমিউনিস্ট দলের তরফে গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হলেও দেশবিভাগ জনিত কারণে তাঁকে সদস্যপদ খােয়াতে হয় । তাই কেউ কেউ গণপরিষদের চরিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেছেন — গণপরিষদই ছিল কংগ্রেস এবং কংগ্রেস ছিল ভারত ( The Constituent Assembly was the Congress and the congress was India ) ।

আপসমুখী 

ভারতীয় গণপরিষদ ছিল ব্রিটিশের সঙ্গে কংগ্রেসি নেতৃবৃন্দের আপসরফার ফল । গণপরিষদে দেশীয় রাজন্যবর্গের তরফে যােগদানকারী প্রতিনিধিবর্গ সর্বদা সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থাকে রক্ষা করার প্রয়াস চালান । এ ছাড়াও গণতন্ত্রের সঙ্গে প্রতিক্রিয়াশীল সামন্ততন্ত্রের আপসরফার ফলশ্রুতি হিসেবে দেশীয় রাজন্যবর্গের স্বার্থ সুরক্ষিত হয় । যেমন — দেশীয় রাজন্যবর্গকে ভাতা , খেতাব , উপাধি প্রভৃতি দান আপসমুখীতারই নিদর্শন ।  

অগণতান্ত্রিক 

দেশীয় রাজন্যবর্গকে গণপরিষদে ৯৩ জন সদস্য মনােনয়নের ক্ষমতা দেওয়ার ফলে গণপরিষদ তার গণতান্ত্রিক প্রকৃতি হারায় । দামােদর স্বরূপ শেঠ  সমালােচনার সুরে বলেছেন — দেশবাসীর শতকরা ১৪ ভাগ কর্তৃক পরােক্ষভাবে নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে গঠিত গণপরিষদ কখনােই সকল দেশবাসীর হয়ে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!