জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের উদ্দেশ্য

জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের উদ্দেশ্য

মার্কিন নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী জোট ও সােভিয়েত নেতৃত্বাধীন সাম্যবাদী জোটের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব থেকে উদ্ভূত ‘ ঠান্ডা লড়াই ’ – এর আর্বত থেকে নিজেকে দূরে রেখে , জাতীয় স্বার্থ ও নবলব্ধ স্বাধীনতাকে রক্ষার জন্য ভারত জোটনিরপেক্ষ বিদেশ নীতি গ্রহণ করে । ভারতে জোটনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণের কারণ বা উদ্দেশ্য গুলি হল— 

ভৌগোলিক সুরক্ষা

এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণে এমন একটা জায়গায় ভারতের অবস্থান যা তাকে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযােগ স্থাপনকারী দেশে পরিণত করেছে । আফগানিস্তান , পাকিস্তান , নেপাল , ভুটান , চিন , ব্ৰহ্মদেশ , শ্রীলঙ্কা এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতির পরােক্ষ প্রভাব জোটনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণে ভারতকে প্রভাবিত করেছে । 

জাতীয় ঐতিহ্য রক্ষা 

সুপ্রাচীন কাল থেকেই অহিংসা , শান্তি , সহমর্মিতা ও সহনশীলতার আদর্শে ভারত বিশ্বাসী । হিংসা জর্জরিত পৃথিবীতে বুদ্ধ ও অশােকের শান্তির বাণী ভারতবর্ষের সীমানা ছাড়িয়ে দেশ বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল । ক্ষমতার শীর্ষে উঠেও আকবর ও শিবাজি সহনশীলতার কথা প্রচার করেন । এই সুমহান আদর্শ ও জাতীয় ঐতিহ্য বহন করার উদ্যোগ থেকেই ভারত সরকার জোটনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণে অগ্রসর হয় । 

রাজনৈতিক স্বতন্ত্রতা 

রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভারত পুঁজিবাদ বা সাম্যবাদ কোনাে একটিকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করেনি । কারণ ভারত গণতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী । ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু নিজেই ঔপনিবেশিকতাবাদ , সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের ঘােরতর বিরােধী ছিলেন । জওহরলাল নেহরু  বলেছিলেন — বিশ্বের পক্ষে ও আমাদের পক্ষে যা ক্ষতিকর তা আমরা নির্দ্বিধায় নিন্দা করব । 

আর্থ সামাজিক উন্নতি

স্বাধীনতা লাভের ঠিক পরের মুহূর্ত থেকেই ভারত এক গভীরতর আর্থ সামাজিক সংকটের মুখে পড়ে । দেশভাগ , উদ্বাস্তু সমস্যা , বেকারত্ব , খাদ্যাভাব , কালােবাজারি , সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা — এসব সমস্যার ফলে ভারতীয় অর্থনীতি একেবারে ভেঙে পড়লে নেহরু স্বতন্ত্র আর্থিক পরিকল্পনা গ্রহণের দ্বারা আর্থসামাজিক পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে সচেষ্ট হন । 

জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ

জাতীয় স্বার্থকে উপেক্ষা করে কোনাে দেশেরই পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারিত হয় না । তবে এই স্বার্থ সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে , কিন্তু কখনােই উপেক্ষিত হতে পারে না । সাম্যবাদী বা ধনতন্ত্রবাদী কোনাে জোটের মধ্যে না গিয়ে নেহরু মিশ্র অর্থনীতি ও স্বাধীন বিদেশনীতি গ্রহণের দ্বারা জাতীয় স্বার্থের সংরক্ষণ চেয়েছিলেন । এ প্রসঙ্গে নেহরু  বলেছেন — স্বাভাবিকভাবেই আমি ভারতের স্বার্থের দিকে লক্ষ রেখেছি , কারণ এটাই আমার কর্তব্য ( ‘I have naturally looked into the interests of India because it is my first duty ‘ )।

আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সাম্যবাদী ও ধনতন্ত্রবাদী — এই দুই পরস্পরবিরোধী শক্তিজোটে বিভক্ত বিশ্ব যখন ঠান্ডা লড়াইয়ে মত্ত , তখন ভারত কোনাে জোটেই অংশগ্রহণ না করে নিরপেক্ষনীতি গ্রহণ করে । কারণ দ্বিমেরু যুক্ত বিশ্বে কোনাে এক পক্ষ অবলম্বন করলে ভারতকেও যুদ্ধের দায়ভার নিতে হত , এতে ভারতের অগ্রগতি ব্যাহত হত । 

তৃতীয় শক্তি জোটের নেতৃত্ব

যে সমস্ত দেশ ঠান্ডা লড়াইয়ের বাইরে থাকতে চাইছিল , কী আয়তন , কী জনসংখ্যা উভয় ব্যাপারেই ভারতের কাছে তারা ছিল নিতান্তই নগণ্য । সুতরাং নিজের নেতৃত্বে বিশ্বে একটা জোটনিরপেক্ষ গােষ্ঠী বা তৃতীয় শক্তি জোট গড়ে তােলার লক্ষ্যেও ভারত জোটনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণ করে ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!