দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার যোগদানের কারণ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার যোগদানের কারণ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিরপেক্ষতার নীতি গ্রহণ করেছিল আমেরিকা ইউরােপের ব্যাপারে জড়িত হবে না ( America shall not go to Europe ) — এই নীতি মেনে আমেরিকা আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ থাকে । তাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রথম ২৭ মাসে যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যক্ষ ভাবে যােগদান করেনি । শেষ পর্যন্ত ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ৭ ডিসেম্বর জাপানিদের হাতে মার্কিন নৌঘাঁটি পার্ল হারবার আক্রান্ত হলে তার পরের দিন ( ৮ ডিসেম্বর ) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিত্রশক্তির পক্ষে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে । 

অধ্যাপক উইলফ্রেড ন্যাপ  ৭ ডিসেম্বর ( ১৯৪১ খ্রি. ) অর্থাৎ জাপান কর্তৃক পার্ল হারবার আক্রমণের দিনটিকে জাপানের পক্ষে ‘ এক সর্বনাশা মূঢ়তার দিন ’ বলে চিহ্নিত করেছেন । কিন্তু জাপান কেন হঠাৎ ওই ‘ মূঢ় ’ কাজটা করে বসল তা জানা দরকার । তাহলেই বােঝা যাবে , যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধে যােগদানের আগেই কীভাবে এক অঘােষিত পরােক্ষ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল । 

আটলান্টিক সনদকে মর্যাদা দান 

বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল উভয়ে উত্তর আটলান্টিকের নিউ ফাউন্ডল্যান্ডের নিকটে মার্কিন যুদ্ধ জাহাজ আগাস্টা এবং ব্রিটিশ যুদ্ধ জাহাজ প্রিন্স অব ওয়েলস – এ পারস্পরিক আলােচনা চালান । অবশেষে তাঁরা এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন যার নাম আটলান্টিক সনদ ( Atlantic Charter ) । এই সনদ আইনের আদর্শ শান্তি প্রতিষ্ঠাকে মর্যাদা দিতে আমেরিকা যুদ্ধে যােগ দেয় । 

ক্যাশ অ্যান্ড ক্যারি নীতি

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিরপেক্ষতা নীতি গ্রহণ করলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনালগ্ন থেকেই মিত্রশক্তি জোটভুক্ত দেশগুলির প্রতি আমেরিকা সহানুভূতিশীল ছিল । কারণ এই দেশগুলিতেও আমেরিকার মতােই গণতান্ত্রিক আদর্শ বজায় ছিল । এ ছাড়াও ব্রিটেনের ওপর জার্মানির ব্যাপক বিমান আক্রমণ , বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধের সম্প্রসারণ ইত্যাদি যুক্তরাষ্ট্রকে সচকিত করে তােলে । মার্কিনদের মনে শঙ্কা জাগে যে , এরপর হিটলার হয়তাে আমেরিকার দিকে অগ্রসর হবেন । তাই রুজভেল্ট আমেরিকার নিরপেক্ষতামূলক আইনগুলিকে বাতিল করার প্রয়ােজনীয়তা সেনেটে তুলে ধরেন । গৃহীত হয় অর্থের বিনিময়ে সমরােপকরণ বিক্রির ক্যাশ অ্যান্ড ক্যারি নীতি

লেন্ড লিজ আইন 

১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন সেনেট লেন্ড লিজ আইন গ্রহণ করে মিত্রশক্তি বর্গকে সমস্ত রকম যুদ্ধাস্ত্র সাহায্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় । এইভাবে গণতন্ত্রের অস্ত্রাগার – এ পরিণত আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র জার্মানির বিষ নজরে পড়ে । জার্মান ডুবােজাহাজ মার্কিন বাণিজ্য জাহাজগুলিকে ক্রমাগত আক্রমণ করতে থাকে । ক্ষুদ্ধ আমেরিকা তখন জার্মান যুদ্ধজাহাজ ও ডুবােজাহাজগুলিকে আটলান্টিকে ‘ দেখামাত্র গুলি ’ করার আদেশ দেয় । শুরু হয় মার্কিন জার্মান অঘােষিত যুদ্ধ । 

নিরপেক্ষতা নীতি ত্যাগ 

রুজভেল্ট আমেরিকাকে তার নিরপেক্ষতার নীতি থেকে সরিয়ে আনতে শুরু করেন । পাশাপাশি শুরু হয় আমেরিকাকে যুদ্ধোপযােগী করে গড়ে তােলার সবরকম চেষ্টা । ওইসব চেষ্টার মধ্যে উল্লেখযােগ্য ছিল — 

1. ২১ থেকে ৩১ বছর বয়স্ক সমস্ত নাগরিকের বাধ্যতামূলক সামরিক শিক্ষা ; 

2. লাতিন আমেরিকার রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্কে সহযােগিতার নীতিগ্রহণ ; 

3. কানাডার সঙ্গে যুগ্ম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ; 

4. ব্রিটেনের কাছ থেকে বারমুডা ও নিউফাউন্ডল্যান্ড নিয়ে সেখানে সামরিক ঘাঁটি গঠন ইত্যাদি । 

দূরপ্রাচ্যের সংকটমোচন 

দূরপ্রাচ্যের সংকটমােচনের লক্ষ্যে আমেরিকা যুদ্ধে যােগ দেয় । ইউরােপের যুদ্ধে পশ্চিমি দেশগুলির ব্যস্ততার সুযােগে জাপান চিন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে । ইন্দোচিনে তারা সামরিক ঘাঁটি গড়ে তােলে । আমেরিকা ইন্দোচিন থেকে জাপানি সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানায় । এ ছাড়াও আমেরিকায় অবস্থিত সকল জাপানি সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয় । 

রোম বার্লিন টোকিও অক্ষ চুক্তি

রোম বার্লিন টোকিও অক্ষ চুক্তি ( ১৯৩৭ খ্রি. ) সম্পাদিত হলে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিবাদ জানায় এবং চিন ও ইন্দোচিন থেকে জাপানি সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানায় । সেইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ১৯১১ খ্রিস্টাব্দের জাপ-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করে দিয়ে সমস্ত রকম পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য , বিমান জ্বালানি ইত্যাদি জাপানে রপ্তানি বন্ধ করে দেয় । জাপান তখন তৈল সম্পদে ভরপুর ইন্দোনেশিয়ার ওপর নজর দেয় এবং দক্ষিণ ইন্দোচিন দখল করে । প্রতিক্রিয়া হিসেবে আমেরিকা একযােগে ইংল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়াকে পাশে নিয়ে জাপানের সঙ্গে সমস্ত রকম বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করে । মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট  স্বয়ং বলেন — এ ধরনের বিপজ্জনক পরিস্থিতির সম্মুখীন এর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে হতে হয়নি ( USA has never before faced such a dangerous situation ‘ ) । 

পার্ল হারবার ঘটনা 

বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এই অংশগ্রহণের পেছনে একটা সর্বনাশা ঘটনা ছিল । জাপান ইন্দোচিন থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে অস্বীকার করলে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে । এ ব্যাপারে আলােচনার জন্য দুইপক্ষ ওয়াশিংটনে মিলিত হয় । কিন্তু এরই মধ্যে জাপান পার্ল হারবারে বােমা বর্ষণ করে । ৭ ডিসেম্বর ( ১৯৪১ খ্রি. ) সকালবেলায় ৭২ টি যুদ্ধজাহাজ ও ৩৩৫ টি যুদ্ধবিমান নিয়ে জাপানি নৌ ও বিমানবহর একযােগে উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের পার্ল হারবারে মার্কিন নৌঘাঁটি আক্রমণ করে । ধ্বংস হয়ে যায় পার্ল হারবার । ওই আক্রমণে মার্কিন সেনা ও অফিসার মিলে ২৭৯৫ জন নিহত হন । অধিকাংশ মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস হয় । ঐতিহাসিকদের মতে জার্মানির পােল্যান্ড আক্রমণের মধ্যে দিয়ে যে বিশ্বযুদ্ধের সূচনা ঘটে , জাপানের পার্ল হারবার আক্রমণের মধ্যে দিয়ে তা চরম আকার ধারণ করে । ক্ষুদ্ধ মার্কিন রাষ্ট্রপতি রুজভেল্ট দিনটিকে কলঙ্কিত বলে উল্লেখ করে পরদিনই জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করেন । এইভাবে নিরপেক্ষতা ত্যাগ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে যােগদান করে । 

উপসংহার 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনার সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এতে যােগ দেয়নি । আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট এবং পররাষ্ট্রসচিব কর্ডেল হাল ইউরােপীয় রাজনীতিতে আমেরিকাকে অংশগ্রহণ করাতে অনাগ্রহী ছিলেন । তথাপি ইতালি ও জার্মানির একনায়কতন্ত্রী আগ্রাসন রােখার জন্যই যে আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যােগ দিয়েছিল এ সম্পর্কে কোনাে সন্দেহ নেই । যুদ্ধে আমেরিকা যােগ দেওয়ার সময় উড্রো উইলসন  ঘােষণা করেন — বিশ্বে গণতন্ত্রকে নিরাপদ করার জন্য আমেরিকা যুদ্ধে যােগ দিচ্ছে ( ‘ America has joined the war to make world safe for democracy ‘ ) ।

1 thought on “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার যোগদানের কারণ”

Leave a Comment

error: Content is protected !!