জাপান কেন মাঞ্চুরিয়া আক্রমণ করেছিল

জাপান কেন মাঞ্চুরিয়া আক্রমণ করেছিল

চীনা রাজশক্তির দুর্বলতার কারণে মাঞ্চুরিয়া হয়ে উঠেছিল বিদেশি হানাদারদের লীলাভূমি ।

জাপানের মাঞ্চুরিয়া আক্রমণের কারণ 

জাপান কর্তৃক চীনের মাঞ্চুরিয়া আক্রমণের কারণকে দু-ভাগে ভাগ করা চলে — 

প্রকৃত কারণ : 

প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ : উত্তর-পূর্ব চীনের অন্তর্গত মাঞ্চুরিয়া ছিল প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ একটি অঞ্চল । বিভিন্ন ইউরােপীয় শক্তির মতাে জাপানেরও এই অঞ্চলটির ওপর লােভাতুর দৃষ্টি ছিল । 

ভৌগােলিক অবস্থান : ভৌগােলিক বিচারে মাঞ্চুরিয়া ছিল কোরিয়া উপদ্বীপের উত্তরে জাপানের নিকটবর্তী এক অঞ্চল । আবার এটি ছিল রাশিয়ার দক্ষিণ সীমান্তের নিকটবর্তী অঞ্চল । এখানকার ভৌগােলিক অবস্থানগত সুবিধা লাভের উদ্দেশ্যে জাপান ও রাশিয়ার মধ্যে আর্থিক বিরােধ শুরু হয় । শেষ পর্যন্ত জাপান মাঞ্চুরিয়া আক্রমণ করে বসে । 

রুশ দুর্বলতা : রুশ-জাপান যুদ্ধে ( ১৯০৪ খ্রি. ) রাশিয়ার শােচনীয় পরাজয় ঘটলে জাপান মাঞ্চুরিয়ায় প্রভাব বিস্তারে সচেষ্ট হয় । এদিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লব ঘটলে রাশিয়ার পক্ষে সুদূর প্রাচ্যে যােগাযােগ রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে । সেই সুযােগে জাপান মাঞ্চুরিয়া আক্রমণ করে । 

আপাত কারণ : 

বাড়তি জনসংখ্যার বাসস্থান ও কর্মসংস্থান : জনসংখ্যার বিস্ফোরণ জাপানকে মাঞ্চুরিয়ায় হস্তক্ষেপে উৎসাহিত করেছিল । ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে যা জনসংখ্যা ছিল , ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে তা হয়ে দাঁড়ায় দ্বিগুণেরও বেশি । এমতাবস্থায় জাপানের বিপুল জনসমষ্টির বাসস্থান ও কর্মসংস্থান ঠিক করে দেওয়ার তাগিদ থেকে মাঞ্চুরিয়াই সঠিক স্থান হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় জাপান মাঞ্চুরিয়া আক্রমণ করে । 

আর্থিক মহামন্দা : বিশ্বব্যাপী আর্থিক মহামন্দা জাপানের অর্থনীতিতেও বিরূপ প্রভাব ফেলে । এর ফলে জাপানে মার্কিনসহ অন্যান্য বিদেশি বিনিয়ােগ ও বৈদেশিক বাণিজ্য ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় । রপ্তানি পণ্যের মূল্য হ্রাস পায় , শিল্পে সংকোচন বেকার সমস্যাকে তীব্র করে । এভাবে যখন আর্থিক সমস্যায় জাপানিরা জর্জরিত তখন তাদের দৃষ্টি অন্যত্র ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য ক্ষমতাসীন দক্ষিণপন্থী সামরিক গোষ্ঠী বিস্তার ধর্মী পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করে , যার অঙ্গ হিসেবে জাপান মাঞ্চুরিয়া আক্রমণ করে ।

জাপানের মাঞ্চুরিয়া আক্রমণ

১৯৩১ খ্রিস্টাব্দের ১৮ সেপ্টেম্বর জাপান মাঞ্চুরিয়ার রাজধানী মুকডেন -এ আক্রমণ হানে । চিন জাতিসংঘ বা লিগের কাছে সুবিচার প্রার্থনা করলে লিগ তার সদস্যরাষ্ট্র জাপানকে সেনা অপসারণের নির্দেশ দেয় । কিন্তু জাপান লিগের নির্দেশ মেনে চলা তাে দূরের কথা , সমগ্র মাঞ্চুরিয়াই দখল করে । শুধু তাই নয় , মাঞ্চুরিয়ার মাঞ্চুকুয়াে নামকরণ করে জাপান সেখানে একটি তাঁবেদার সরকারও ( ৯ মার্চ , ১৯৩২ খ্রি. ) প্রতিষ্ঠা করে । এই সরকারের প্রধান হন চীনের শেষ মাঞ্চু সম্রাট পু-ই । 

জাতিসংঘে চীনের আবেদন

প্রকৃত অর্থে আক্রান্ত হওয়ার পরই চীন জাতিসংঘে জাপানের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়ে বলে যে জাপান যেন মাঞ্চুরিয়া আক্রমণের পূর্বেকার অবস্থায় ফিরে যায় । কিন্তু তার সে আবেদন ব্যর্থ হওয়ায় পুনরায় চীন জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ প্রার্থনা করে অনুরােধ জানায় — জাতিসংঘ যেন লিগের চুক্তিপত্রের ১০ ও ১৫ নং ধারা প্রয়ােগ করে জাপানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয় । 

জাতিসংঘের ভূমিকা

জাতিসংঘ জাপানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে নীরব থাকে । নিজের ব্যর্থতা ঢাকার জন্য লিগ অন্য পদক্ষেপ নেয় । লিগ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র , ব্রিটেন , ফ্রান্স , জার্মানি ও ইতালি এই পাঁচটি বৃহৎ শক্তিবর্গের প্রতিনিধিদের নিয়ে লিটন কমিশন গঠন করে মাঞ্চুরিয়া সমস্যার প্রকৃতি অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয় । ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে কমিশন তার প্রতিবেদনে জাপানকে আক্রমণকারী দেশ হিসেবে চিহ্নিত করে ; কিন্তু কোনাে শাস্তির সুপারিশ করেনি । ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দের ২৪ ফেব্রুয়ারি লিগের সাধারণ সভায় কমিশনের প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয় । 

জাপানের জাতিসংঘের সদস্যপদ ত্যাগ 

লিটন কমিশন নিয়ে জাতিসংঘের সংসদে ভােটাভুটি হলে উপস্থিত ৪৪ টি দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে ৪২ টি দেশ লিটন কমিশনের রিপাের্টকে মঞ্জুর করে । একমাত্র জাপান বিপক্ষে ভােট দেয় আর থাইল্যান্ড ভােটদান থেকে বিরত থাকে । লিটন কমিশনের রিপাের্ট আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হওয়ার এক মাস পরে জাপান জাতিসংঘের সদস্যপদ ত্যাগ করে । ফলে লিগের পক্ষে আর কিছুই করার থাকে না । 

উপসংহার 

মাঞ্চুরিয়া সমস্যা লিগের দুর্বলতা ও ব্যর্থতাকে সর্বসমক্ষে প্রকট করে তার মর্যাদা ও প্রয়ােজনীয়তা সম্বন্ধেই প্রশ্ন তুলে ধরে । মাঞ্চুরিয়া আক্রমণের মধ্যে দিয়ে জাপান সুদূর প্রাচ্যে তার সাম্রাজ্য বিস্তার নীতির সূচনা ঘটায় , যা বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক বড়াে প্রশ্ন চিহ্ন তুলে ধরে ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!