রুশ জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি

রুশ জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ২৩ আগস্ট সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী মলোটভ ও জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিবেনট্রপ দশ বছর মেয়াদি এক রুশ জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষর করেন । মলোটভ রিবেনট্রপ প্যাক্ট নামে পরিচিত এই চুক্তি বিশ্বের কূটনৈতিক ইতিহাসে এক চমকপ্রদ ঘটনা । এই চুক্তির পর হিটলার  বলেন — এখন পৃথিবী আমার পকেটের মধ্যে এল ( ‘ Now I have the world in my pocket ‘ ) । 

রুশ জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষরের কারণ

পরস্পর বিরােধী আদর্শে বিশ্বাসী দুটি দেশ এই চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল বেশ কিছু কারণে ―

রাশিয়ার দিক থেকে : 

জার্মান তোষণ নীতি : ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স জার্মানির প্রতি তোষণ নীতি অনুসরণ করায় রাশিয়ার জার্মান বিরােধী জোট গঠনের প্রস্তাবে সাড়া দিতে পারেনি । ফলে রাশিয়া বাধ্য হয়ে জার্মানির সঙ্গে এই চুক্তি স্বাক্ষর করে । 

সোভিয়েত পরিকল্পনা : জোসেফ স্টালিন নিশ্চিত ছিলেন যে হিটলারের নেতৃত্বে জার্মানি রাশিয়া আক্রমণ করবে । তাই আগাম সতর্কতা হিসেবে সোভিয়েত রাশিয়াকে সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী করে তােলার জন্য কিছু সময়ের দরকার ছিল । এই সময় বের করার লক্ষ্যে রাশিয়া এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে । 

জাপান আক্রমণের ভয় : জাপান যেভাবে তার সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিস্তার ঘটাচ্ছিল তা দেখে রাশিয়া তার পূর্ব সীমান্তে জাপানি আক্রমণের ভয়ে ভীত হয়ে পড়ে ।

জার্মানির দিক থেকে : 

কাঁচামাল : রাশিয়ার অফুরন্ত কাঁচামালের লােভে জার্মানি এই চুক্তিতে আগ্রহী হয় । 

সীমান্তে রুশ সাহায্য লাভ : জার্মানির দুই সীমান্তে ( পূর্ব – পশ্চিম ) যাতে আর যুদ্ধ না হয় , পােল্যান্ড যাতে রাশিয়ার কাছ থেকে সাহায্য না পায় , সর্বোপরি জার্মানি যাতে নির্বিবাদে পশ্চিম ইউরােপে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে তার জন্য জার্মানি সাময়িকভাবে হলেও রাশিয়াকে পাশে পেতে চেয়েছিল । 

রুশ জার্মান অনাক্রমণ চুক্তির শর্ত

এই চুক্তির অন্যতম কয়েকটি শর্ত ছিল — 

1. ১৯৩৯-৪৯ খ্রি. পর্যন্ত ১০ বছর রাশিয়া ও জার্মানি পরস্পরকে আক্রমণ করবে না । 

2. চুক্তিবদ্ধ দুই দেশের কারুর ওপর যদি তৃতীয় কোনাে দেশ আক্রমণ চালায় তাহলে তারা কেউ আক্রমণকারী দেশকে সাহায্য করবে না । 

3. উভয় দেশ এই চুক্তিকে গােপন রাখবে ও নিরপেক্ষ চুক্তি হিসেবে মেনে চলবে । চুক্তির মেয়াদকালের মধ্যে দু-পক্ষে কোনাে মনােমালিন্য হলে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ পদ্ধতিতে তা মীমাংসা করা হবে । 

4. রুশ-জার্মান চুক্তি লঙ্ঘন : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ২২ জুন বিশেষ কয়েকটি কারণে হিটলার এই অনাক্রমণ চুক্তি লঙ্ঘন করে এক অতি বিশাল বাহিনী নিয়ে রাশিয়া আক্রমণ করেন । কাজেই এই চুক্তির স্থায়িত্বকাল ছিল মাত্র দুই বছর । ঐতিহাসিক এ. জে. পি. টেইলরের  মতে রুশ জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি হল বিশ্বাসঘাতকতার চূড়ান্ত পরিণতি । 

রুশ জার্মান অনাক্রমণ চুক্তির গুরুত্ব

জার্মানির ধ্বংস :

হিটলার এই চুক্তিকে অমান্য করে রাশিয়া আক্রমণ করায় , জার্মানির ধ্বংসসাধন ঘটে । 

রুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় : 

পূর্ব জার্মানিতে রুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পূর্ব ইউরােপে হিটলারের দখল করা অঞ্চলগুলির কিছু স্থানে রাশিয়া সাম্যবাদী সরকার প্রতিষ্ঠা করে । 

মন্তব্য 

এই চুক্তির ফলে সোভিয়েত ইউনিয়ন কেবল জার্মানিকে পশ্চিমি কমিউনিস্ট বিরোধী শক্তিজোট থেকে বের করেই আনেনি , তাকে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ঠেলে দিতেও সক্ষম হয়েছিল । এটি সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষে এক অসামান্য কূটনৈতিক সাফল্য । চার্চিল  চুক্তির কথা শুনে বলেছিলেন — এই দুর্ভাগ্যপূর্ণ খবরে বিশ্বে যেন এক বিস্ফোরণ ঘটল ( ‘ The sinister news broke upon the world like an explosion ‘ )।

Leave a Comment

error: Content is protected !!