মুসোলিনি কিভাবে আবিসিনিয়া দখল করেন

মুসোলিনি কিভাবে আবিসিনিয়া দখল করেন

প্রাচীন রােমের গৌরবগাথার স্মরণ করে মুসোলিনি যুদ্ধবাজ বিদেশনীতি গ্রহণ করেন । বিশ্বজুড়ে মহামন্দার সুযােগে মুসােলিনি আবিসিনিয়া দখল করেন । ঐতিহাসিক জি. এম. গ্যাথর্ন হার্ডির  মতে — আবিসিনিয়া আক্রমণ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ইতিহাসের এক প্রামাণ্য ঘটনা ( ‘ Abicinia attack mark a crucial turning point in war history ‘ ) । 

মুসোলিনির আবিসিনিয়া আক্রমণের কারণ বা পটভূমি

আর্থিক দুর্দশা : 

বিশ শতকের তিনের দশকে বিশ্ব-অর্থনীতি যখন মহামন্দার সংকটে ধুকছে , তখন থেকেই ইতালি তার অর্থনৈতিক দুর্দশা থেকে মুক্তি পেতে পূর্ব আফ্রিকার প্রাকৃতিক সম্পদে পূর্ণ আবিসিনিয়া ( ইথিওপিয়া ) দখলের উদ্যোগ নেয় । 

ওয়াল ওয়াল ঘটনা :

১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে ইথিওপিয়ার সম্রাট হাইলে সেলাসি ওয়াল ওয়াল মরুদ্যানটিকে ইথিওপিয়া ভুক্ত একটি অঞ্চল বলে দাবি করলে ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের ৩ অক্টোবর মুসোলিনি হঠাৎ তাঁর সেনাবাহিনী নিয়ে ইথিওপিয়া আক্রমণ করে বসেন । 

মুসোলিনির আবিসিনিয়া আক্রমণের উদ্দেশ্য

ইতালির আবিসিনিয়া আক্রমণের উল্লেখযোগ্য উদ্দেশ্য হল —

1. স্যাডোয়ার যুদ্ধ ( ১৮৯৬ খ্রি. )-এ আবিসিনিয়ার কাছে ইতালির হারের প্রতিশোধ তােলা । 

2. প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ আবিসিনিয়া দখলের মাধ্যমে কাঁচামালের অভাব মেটানাে এবং উৎপাদিত পণ্যের বাজার তৈরি । 

3. উদ্বৃত্ত জনসংখ্যার বাসস্থান করে দেওয়া এবং ভয়াবহ বেকার সমস্যার সমাধান করা ।

4. শক্তিশালী দেশরূপে বিশ্বে ইতালির আত্মপ্রকাশ ঘটানাে ও মর্যাদা বাড়ানাে ।  

মুসোলিনির আবিসিনিয়া আক্রমণের ফলাফল

সংকট বৃদ্ধি : 

লিগ ইতালিকে আক্রমণকারী দেশ বলে ঘােষণা করে এবং সমস্ত সদস্যরাষ্ট্রকে ইতালির বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরােধ গড়ে তুলতে বলে । কিন্তু লিগের দুই অগ্রগণ্য সদস্য রাষ্ট্র ব্রিটেন ও ফ্রান্স যেমন লিগের প্রস্তাবের কোনাে বিরােধিতা করেনি , তেমনি আবার ইতালির বিরুদ্ধাচরণ ও করেনি । বরং এক গােপন চুক্তিতে দুই রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা আবিসিনিয়ার মােট আয়তনের দুই-তৃতীয়াংশ ইতালিকে ছেড়ে দিতে সম্মত হন । ফলে সংকট আরও বাড়ে ।

সম্রাটের দেশত্যাগে :

গােপন চুক্তি নিয়ে ইউরােপে হইচই পড়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত ইতালির প্রবল চাপে আবিসিনিয়া ভেঙে পড়ে । সম্রাট হাইলে সেলাসি দেশত্যাগে বাধ্য হন ( ১ মে , ১৯৩৬ খ্রি. ) । ৯ মে ইতালির রাজা আবিসিনিয়ার সম্রাট বলে ঘােষিত হন । 

নতুন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা : 

ইরিত্রিয়া , সোমালিল্যান্ড ও আবিসিনিয়া নিয়ে ইতালীয় পূর্ব আফ্রিকা নামে একটি নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয় । এর পরই ইতালি জাতিসংঘ ত্যাগ করে ( ১৯৩৭ খ্রি. ) ।

মুসোলিনির আবিসিনিয়া আক্রমণের গুরুত্ব

ইতালির আবিসিনিয়া আক্রমণ বিশ্ব রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা —

আবিসিনিয়ার বিলুপ্তিতে : 

ইতালির আবিসিনিয়া দখলের ফলে আফ্রিকার এক অতি প্রাচীন রাষ্ট্রের স্বাধীন সত্তা বিলুপ্ত হয় । 

লীগের ব্যর্থতায় : 

ইতালির আবিসিনিয়া আক্রমণ রােধে ব্যর্থ হয় লীগ অব নেশনস । এর ফলে প্রমাণিত হয়েছিল যুদ্ধোন্মাদ শক্তিশালী রাষ্ট্রের সিংহগর্জনের কাছে লিগ কতটা অসহায় ।

যুদ্ধােন্মাদনা বৃদ্ধিতে : 

ইথিওপিয়ায় ইতালির সেনাবাহিনী যে নারকীয় বীভৎসতার নমুনা রেখেছিল তা ইতিপূর্বে আর কোনাে সভ্য দেশে দেখা যায়নি । এই ঘটনা ইতালি , জার্মানি ও জাপান এই তিন যুদ্ধবাজ অক্ষশক্তির যুদ্ধোন্মাদনাকে আরও তীব্র করে । 

মুসোলিনির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে :

ইথিওপিয়া বা আবিসিনিয়া দখলের পর নিজের দেশ ইতালিতে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রনেতা হিসেবে মুসোলিনির জনপ্রিয়তা বহুগুণ বেড়ে যায় ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!