মিউনিখ চুক্তি কি

মিউনিখ চুক্তি কি

index 11
মিউনিখ চুক্তি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের জার্মান তোষণ নীতির এক চরম প্রকাশ হল ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের ‘ মিউনিখ চুক্তি ’। হিটলারের সুদেতান অঞ্চল গ্রাস তথা চেকোস্লোভাকিয়া আক্রমণে উদ্যত হওয়াকে কেন্দ্র করে এই চুক্তির অবতারণা । ঐতিহাসিক ল্যাংসামের  মতে – মিউনিখ চুক্তি ছিল জার্মান তোষণ নীতির শ্রেষ্ঠ উদাহরণ । 

মিউনিখ চুক্তির প্রেক্ষাপট

১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে অস্ট্রিয়া গ্রাস করার পর হিটলার চেকোশ্লোভাকিয়ার দিকে দৃষ্টি দেন । জার্মান সীমান্তে অবস্থিত চেকোস্লোভাকিয়ার সুদেতান অঞ্চলে বসবাসকারী জার্মান সংখ্যালঘু গণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানালে হিটলার সেই সুযােগে সুদেতানকে জার্মান সাম্রাজ্যভুক্ত করার দাবি পেশ করেন । ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স জার্মানির এই প্রস্তাবের বিরােধিতার পরিবর্তে সম্মতি জানায় । শুধু তাই নয় , চেকোস্লোভাকিয়া যাতে এই প্রস্তাব মেনে নেয় সে ব্যাপারে তারা চাপ দেয় । অবশেষে চেকোস্লোভাকিয়া নতিস্বীকার করলেও হিটলার আরও বেশি অঞ্চল দাবি করে চেকোস্লোভাকিয়া আক্রমণে উদ্যত হন । ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলেন এতে বিচলিত হয়ে ওঠেন ও বার্লিনে ছুটে গিয়ে হিটলারকে চেকোস্লোভাকিয়া আক্রমণ থেকে বিরত হওয়ার অনুরােধ জানান । 

মিউনিখ চুক্তি স্বাক্ষর

এরই প্রেক্ষিতে শেষ পর্যন্ত ইতালির ফ্যাসিস্ট নেতা মুসােলিনির মধ্যস্থতায় জার্মানির মিউনিখে চেম্বারলেন , ফরাসি প্রধানমন্ত্রী দালাদিয়ের , হিটলারমুসোলিনির মধ্যে এক চুক্তি সম্পাদিত হয় । এই চুক্তিই মিউনিখ চুক্তি ( ২৯ সেপ্টেম্বর , ১৯৩৮ খ্রি. ) নামে পরিচিত । চেম্বারলেন  এই চুক্তি সম্পর্কে বলেন — আমার বিশ্বাস এটা আমাদের সময়কার শান্তিরক্ষক ( ‘ I believe it is peace in our time ‘ ) । 

মিউনিখ চুক্তি শর্ত

মিউনিখ চুক্তিতে বলা হয় — 

1. ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের ১ থেকে ১০ অক্টোবরের মধ্যে সুদেতান জেলা থেকে চেকোস্লোভাকিয়ার সেনা ও সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে । 

2. উল্লিখিত সময়কালের মধ্যে জার্মান সেনাবাহিনী ধাপে ধাপে সুদেতান অঞ্চলের দখল নেবে । 

3. চার সপ্তাহের মধ্যে চেক সরকার সুদেতানের জার্মানদের চেক পুলিশ ও সেনাদল থেকে মুক্তি দেবে । 

4. ব্রিটেন , ফ্রান্স ও ইতালি সুদেতানের ও অবশিষ্ট চেকোস্লোভাকিয়ার সীমানা নির্দিষ্ট করে দেবে । 

5. ব্রিটেন ও ফ্রান্স অবশিষ্ট চেকোস্লোভাকিয়ার স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব নেবে ।

হিটলারের মিউনিখ চুক্তি লঙ্ঘন

মিউনিখ চুক্তিকে তােয়াক্কা না করে হিটলার মাত্র ছ-মাসের মধ্যেই সমগ্র চেকোস্লোভাকিয়া অধিকার করে নেন ( মার্চ , ১৯৩৯ খ্রি. ) । এরপরেই হিটলার পোল্যান্ডের ডানজিগ বন্দর দাবি করেন । পোল্যান্ড এই দাবি অগ্রাহ্য করলে হিটলার পোল্যান্ড আক্রমণ করেন । ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক জটিল পরিস্থিতির উদ্ভব হয় । 

মিউনিখ চুক্তির গুরুত্ব

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিকায় মিউনিখ চুক্তি ছিল এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আপসরফা । 

হিটলারের কূটনৈতিক জয় : 

মিউনিখ চুক্তি সম্পাদন করে হিটলার কূটনৈতিক দিক থেকে জয়ী হয়েছিলেন বলা চলে । কেননা এই আপসরফার মাধ্যমেই হিটলারের সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ নীতি ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স মেনে নিয়েছিল । 

জার্মান অর্থনীতিতে সমৃদ্ধি : 

অস্ট্রিয়া সংলগ্ন সুদেতান অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ ও উৎপাদন সংস্থাগুলিকে কাজে লাগিয়ে জার্মানির আর্থিক ভিত অনেকটাই মজবুত ও সমৃদ্ধ হয় । 

সামরিক সুবিধা : 

সুদেতান অঞ্চলের সীমানা বরাবর চেক সরকার যে সামরিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছিল তার সুবিধা লাভ করেছিল হিটলারের জার্মানি । তাই জিওফ লেটন  বলেছেন — এই সীমান্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কর্তৃত্ব লাভ করেছিল জার্মানি ( ‘ Its frontier defences were simply taken over by Germany ‘ ) ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!