আজাদ হিন্দ ফৌজের ভারত অভিযান

আজাদ হিন্দ ফৌজের ভারত অভিযান

সুভাষচন্দ্রের নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ বাহিনীর ভারত অভিযান আপাতদৃষ্টিতে ব্যর্থ হলেও প্রকৃত অর্থে তাদের ভারত অভিযানের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়নি । রেঙুনের রণাঙ্গনে যখন আজাদ হিন্দ সেনারা পিছু হটছে তখনও আশাবাদী নেতাজি বললেন , “ আমরা অন্ধকারতম মুহূর্ত অতিক্রম করেছি , সূর্যোদয়ের দেরি নেই । ভারত স্বাধীন হবে । ” প্রকৃত অর্থেই ভারতের ভাগ্যাকাশে স্বাধীনতার সূর্যোদয়ের দেরি হয়নি । ভারত অচিরেই স্বাধীন হয়েছিল । আজাদ হিন্দ বাহিনীর ভারত অভিযান ব্যর্থতার কারণগুলি হল— 

পরনির্ভরশীলতা

আজাদ হিন্দ বাহিনীর ব্যর্থতার জন্য অনেকে সুভাষচন্দ্রকেও অনেকাংশে দায়ী করেছেন । ১৯৪১ থেকে ১৯৪৩ সাল ( জানুয়ারি ) পর্যন্ত তিনি জার্মানির সাহায্য লাভের জন্য বার্লিনে অবস্থান করেন । কিন্তু সেই সাহায্য লাভে ব্যর্থ হলে আজাদ হিন্দ সেনাবাহিনী খাদ্য , অস্ত্রশস্ত্র এমনকি রণকৌশলের জন্য জাপানের ওপর নির্ভরশীল হতে শুরু করেছিল । এই পরনির্ভরশীলতাই আজাদ হিন্দ বাহিনীর ব্যর্থতার অন্যতম কারণ । কিন্তু নেতাজির এ ছাড়া আর কিছু করার ছিল না । 

ভারত থেকে সহযোগিতার অভাব 

আজাদ হিন্দ বাহিনীর ভারত অভিযানকে স্বাগত জানিয়ে তাদের সঙ্গে ভারতের জাতীয় নেতৃবৃন্দ যােগসূত্র গড়ে তােলার কোনাে প্রচেষ্টাই গ্রহণ করেনি । এ সময়ে প্রয়ােজন ছিল দেশের মধ্য থেকে একটা গণ অভ্যুত্থান ঘটানাে । দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা না ঘটায় একা আজাদ হিন্দ সেনারা তাদের লক্ষ্যে পৌঁছােতে ব্যর্থ হয় । 

ভ্রান্ত সময় নির্বাচন 

বার্মা ( মায়ানমার ) সীমান্ত ধরে যে সময়ে ভারত অভিযানের পরিকল্পনা রচিত হয়েছিল , তার কিছুদিন পরেই বর্ষা নেমে যাওয়ায় দুর্গম পার্বত্য সংকুল পথ ধরে এগিয়ে চলা প্রায় অসম্ভব ছিল । মিত্রপক্ষ যখন সুবিধাজনক অবস্থায় তখন আজাদ হিন্দ সেনাদের অভিযান শুরু করা ঠিক হয়নি । 

সেনানায়কদের মনোমালিন্য

জাপানি সেনাপতি মুতাগােচিদের সঙ্গে অন্যান্য সেনানায়কের বিরােধিতার ফলে সেনাবাহিনী কোহিমা পর্যন্ত এগিয়েও ডিমাপুর আক্রমণ করেনি । ডিমাপুর অধিকার করে নিতে পারলে ইম্ফল জয় অনেক সহজ হত । 

জাপানের অসহযোগিতা 

বার্মা ( মায়ানমার ) সীমান্তে ইম্ফল অধিকার করার সময় আজাদ হিন্দ সেনারা যেভাবে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য মরিয়া ছিল জাপানিরা সেভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়নি । উলটে জাপান এখানকার সৈন্যদের তুলে নিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বিশ্বযুদ্ধের রণাঙ্গনে পাঠিয়ে দেয় । সেনানায়ক শাহনওয়াজ খান  তাঁর ‘ My Memories of I.N.A. and Netaji ‘ গ্রন্থে লিখেছেন — জাপানিরা প্রয়ােজনীয় রসদ ও সাহায্য না দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে আজাদ হিন্দ বাহিনীকে ব্যর্থতার দিকে ঠেলে দিয়েছিল । 

উপসংহার 

বিশ্ববাসীকে ভারতের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় প্রভাবিত করার সমস্ত কৃতিত্ব নেতাজি ও তাঁর আজাদ হিন্দ ফৌজেরই প্রাপ্য । তাই ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার  বলেছেন ব্যর্থতা সত্ত্বেও ভারতের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে আজাদ হিন্দ বাহিনী এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে ( ‘ In spite of failure , the I.N.A. occupies an important place in the history of India’s struggle for freedom ‘ ) ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!