দ্বিজাতি তত্ত্ব কী

দ্বিজাতি তত্ত্ব কী

দ্বিজাতিতত্ত্বের অর্থ হল দুটি জাতির জন্য আলাদা আলাদা তত্ত্ব । অর্থাৎ ভারতে হিন্দু ও মুসলমান যে দুটি আলাদা জাতি , সেই ধারণার রূপায়ণ । সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প থেকে দ্বিজাতিতত্ত্বের উদ্ভব । উনিশ শতকের প্রথমভাগ থেকেই হিন্দু ও মুসলিম এই দুই সম্প্রদায় সমাজে আলাদা আলাদাভাবে নিজেদের অবস্থানকে দৃঢ় করতে চাইলে এই তত্ত্বের অবতারণা ঘটে । এ প্রসঙ্গে জওহরলাল নেহরু  বলেছেন — একথা ভুললে চলবে না যে ভারতে সাম্প্রদায়িকতা পরবর্তীকালের বৈশিষ্ট্য — আমাদের চোখের সামনেই তা সৃষ্টি হয়েছে ( ‘ Communalism in India is a latter – day phenomenon which has grown up before our eyes ‘ ) ।

দ্বিজাতিতত্ত্বের উদ্ভবের কারণ

হিন্দু – মুসলিম উন্নয়নে বৈষম্য : 

ভারতে ব্রিটিশ শাসনের প্রথম পর্ব থেকেই হিন্দুরা যেভাবে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উচ্চ সরকারি পদগুলি অধিকার করে নিজেদের উন্নয়ন ঘটিয়েছিল মুসলিমরা তা পারেনি , কারণ প্রথমপর্বে ব্রিটিশদের প্রতি তাদের বৈরী মনােভাব তাদের উন্নতির প্রতিবন্ধক হয়ে দাড়িয়েছিল । ফলে এই উন্নয়ন বৈষম্য মুসলিমদের মনে হীনম্মন্যতার জন্ম দেয় । 

মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ভূমিকা :

হিন্দু ও মুসলিম দুই সম্প্রদায় থেকে যে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব ঘটেছিল , তারা কখনােই চায়নি ব্রিটিশ শাসনের অবসান হােক , বরং তারা নিজের নিজের সম্প্রদায়ের স্বার্থরক্ষায় বেশি চিন্তিত ছিল । মধ্যবিত্ত হিন্দুরা সরকারের উচ্চপদগুলি লাভে সচেষ্ট হলে আর মুসলিম মধ্যবিত্তগণ আরও বেশি পরিমাণ জমি অধিগ্রহণে উদ্যোগী হলে এক সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে ।  

নেতাদের ভূমিকা : 

স্যার সৈয়দ আহমেদ থেকে শুরু করে আগা খাঁ , আলি ভ্রাতৃদ্বয় ( সওকৎ আলি ও মহম্মদ আলি ) , চৌধুরী রহমত আলি , মহম্মদ ইকবাল , মহম্মদ আলি জিন্না পর্যন্ত প্রত্যেকে মুসলিমদের স্বার্থরক্ষার জন্য সারাজীবন কাজ করে গেছেন । অপরদিকে হিন্দু মহাসভা , ভারতীয় হিন্দু জনসংঘ প্রভৃতি সংগঠনগুলিও একই রকমভাবে হিন্দু স্বার্থরক্ষায় ব্যস্ত থাকায় দ্বিজাতিতত্ত্বের উদ্ভব ঘটে । 

প্যান ইসলামিক আদর্শ : 

মহম্মদ আলি জিন্না ঘােষণা করেন যে , ভারতীয় মুসলমান সর্ব – ইসলামি ( Pan Islamism ) আদর্শ দ্বারা উদ্বুদ্ধ , শুধুমাত্র ভারতীয় আদর্শ দ্বারা উদ্বুদ্ধ নয় । প্রচুর ভারতীয় মুসলমান প্যান ইসলামিক আদর্শে বিশ্বাসী হয়ে ভারতবর্ষ অপেক্ষা আরব , ইরাক ও সিরিয়ার প্রতি বেশি দরদি ছিল । তাদের এই দ্বিচারিতা দ্বিজাতিতত্ত্বের উদ্ভবের জন্য কম দায়ী নয় ।

মুসলিম দলগুলির ভূমিকা :

ডা. আনসারির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জাতীয়তাবাদী মুসলিম দল ( ১৯২৮ খ্রি. ) , মেহের আলি , ইউসুফ প্রমুখের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত কংগ্রেস মুসলিম দল ( ১৯২৯ খ্রি. ) প্রভৃতি সংগঠনগুলিও দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রশ্নকে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন । 

ব্রিটিশের বিভাজন ও শাসন নীতি : 

ব্রিটিশ সরকার আগাগােড়া জাতীয় আন্দোলনের মূলধারা থেকে মুসলমানদের আলাদা করে রাখার চেষ্টা চালিয়েছিল । কারণ ব্রিটিশ সরকার উপলব্ধি করতে পেরেছিল যে জাতীয় আন্দোলনের স্রোত থেকে মুসলিমদের আলাদা করতে পারলে জাতীয় আন্দোলনের গতি অনেক স্তিমিত হয়ে পড়বে । তাই ব্রিটেনের পার্লামেন্টে চার্লস উড  বলেছিলেন — বিভিন্ন ধর্ম , ভাষা , রাজনীতি এবং আচার আচরণে বিভক্ত কয়েকটা জাতির কথা মনে রাখতে হবে । 

দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রবক্তা

দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রচারের ক্ষেত্রে মুসলিম ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের নেতৃবর্গ ও সংগঠনগুলি দায়ী ছিল । আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ থিয়ােডর বেক – এর প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে সৈয়দ আহমেদ দ্বিজাতিতত্ত্বের যে প্রচার শুরু করেছিলেন , সেই ধারা বহন করেছিলেন মহম্মদ ইকবাল , চৌধুরী রহমত আলি , মহম্মদ আলি জিন্না প্রমুখ । মহম্মদ ইকবাল প্রচার করেন যে হিন্দু মুসলিম আলাদা জাতি , আলাদা সম্প্রদায় এবং তাদের সংস্কৃতিও আলাদা । অপরদিকে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার প্রভাব ও ধারা অক্ষুন্ন রাখার জন্য আর্যসমাজ প্রভৃতি হিন্দু সংগঠনগুলি দায়ী ছিল । বিভিন্ন হিন্দু উৎসব পালন ও তার বাড়াবাড়ি মুসলিমদের মনে দ্বিজাতিতত্ত্বের ধারণা আরও দৃঢ় করে ।

দ্বিজাতি তত্ত্বের ফলাফল

দ্বিজাতি তত্ত্বের ফলাফল ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ ―

সাম্প্রদায়িক ঐক্য বিনাশ :

দ্বিজাতিতত্ত্ব সাম্প্রদায়িক ঐক্যকে বিনষ্ট করে । এই একপেশে ধারণা অখণ্ড ও ঐক্যবদ্ধ ভারত প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে ভেঙে দেয় । 

ভারত বিভাজন : 

দ্বিজাতিতত্ত্বের চরম পরিণতি রূপে একটি ঐক্যবদ্ধ দেশ দু – টুকরাে হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি আলাদা রাষ্ট্রের জন্ম দেয় ।

সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা : 

দ্বিজাতিতত্ত্বের বিষবাষ্পে স্বাধীনতার প্রাক্কালে যে রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লক্ষ নির্দোষ , অসহায় হিন্দু ও মুসলিম প্রাণ হারায় । 

আর্থিক প্রগতিতে বাধা : 

দ্বিজাতিতত্ত্বের ধারণার জন্যই আজও সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে প্রগতি ও উন্নতি ব্যাহত হচ্ছে ।

উপসংহার 

হিন্দু – মুসলিম দুটি আলাদা জাতি — এই ধারণার পটভূমিকায় যাবতীয় বিভাজন করা উচিত , এই মত স্বাধীনতার প্রাক্কালে এক ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে । মুসলিমদের মনে এই তত্ত্ব এমনভাবে বাসা বেঁধেছিল যে ভারতের কল্যাণ অপেক্ষা নিজেদের কল্যাণ কামনাতেই তারা বেশি মগ্ন ছিল । এই প্রসঙ্গে স্যার সৈয়দ আহমেদ  বলেছিলেন যে , ইংরেজদের আরও বহুকাল এমনকি অনন্তকাল থাকার জন্য প্রার্থনা করবেন ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

x
error: Content is protected !!