মেকলে মিনিট কি

Contents

মেকলে মিনিট কি

টমাস ব্যাবিংটন এডওয়ার্ড মেকলে ছিলেন একাধারে লর্ড উইলিয়ম বেন্টিঙ্কের আইন সচিব এবং ‘ কমিটি অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন ‘ – এর সভাপতি । তিনি প্রাচ্যশিক্ষার পরিবর্তে এদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষার বিষয়ে যে বিখ্যাত প্রস্তাব পেশ করেন ( ১৮৩৫ খ্রি . ২ ফেব্রুয়ারি ) তা ‘ মেকলে মিনিটস ‘ বা ‘ মেকলে মিনিট ‘ নামে  পরিচিত । তিনি বলেছিলেন , “ ইউরােপের একটি ভালাে গ্রন্থাগারের বই ভরতি একটি তাকই ভারত ও আরবের সমগ্র সাহিত্যের সমান ” ( A single shelf of a good European library is worth the whole literature of India and Arabia ) ।

Macaulay carousel
টমাস ব্যাবিংটন এডওয়ার্ড মেকলে

পাবলিক ইনস্ট্রাকশন কমিটি গঠন

ইল্যান্ডে হুইগপন্থী দলের সদস্য লর্ড উইলিয়ম বেন্টিঙ্ক বেন্থামের উপযােগবাদে বিশ্বাস করতেন । তিনি মনে করতেন যে , ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে ভারতে পাশ্চাত্য জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রসার ঘটাতে পারলে ভারতবাসীর আর্থসামাজিক , সাংস্কৃতিক মান উন্নত করা সম্ভব । পাশ্চাত্য শিক্ষার সুষ্ঠু প্রসারের লক্ষ্যেই বেন্টিঙ্ক মেকলের সভাপতিত্বে গঠন করেন ‘কমিটি অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন ‘ ।

মেকলে মিনিট এর প্রস্তাব

মেকলের মূল বক্তব্য ছিল ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে ভারতবাসীকে ইউরােপীয় দর্শন , সাহিত্য ও জ্ঞানবিজ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত করে তােলা । কমিটি অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশনের সভাপতি হিসেবে মেকলে তাঁর বিখ্যাত প্রস্তাব বড়ােলাটের কাছে পেশ ( ১৮৩৫ খ্রি . ২ ফেব্রুয়ারি ) করে বলেন —

  • পাশ্চাত্য শিক্ষাকে প্রথমে উচ্চমধ্যবিত্তদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে ।
  • উচ্চ ও মধ্যবিত্তশ্রেণির মধ্যে ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ঘটলে তা নিম্নমুখী পরিশ্রুত নীতি ( Downword filtration theory ) অনুসারে ধীরে ধীরে ভারতবাসীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে ।
  • ইংরেজি শিক্ষাই একমাত্র পারবে অঞ্জ কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভারতবাসীকে শিক্ষার আলােয় নিয়ে আসতে ।

প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যবাদী দ্বন্দ্ব

ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার নিয়ে পাবলিক ইনস্ট্রাকশন কমিটির সদস্যরা দুভাগে ভাগ হয়ে যান । প্রাচ্যবাদী বা ওরিয়েন্টালিস্ট , যথা — উইলসন , কোলব্রুক , এইচ . টি . প্রিন্সেপ প্রমুখ চান ভারতীয় সাহিত্য ও দর্শনকেই উন্নত করা হােক । অপরদিকে পাশ্চাত্যবাদী বা অ্যাংলিসিস্টরা , যথা — আলেকজান্ডার ডাফ , সান্ডার্স , কোলভিন প্রমুখ ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থার প্রসার ঘটাতে চান ।

মেকলে মিনিট এর ফলাফল

মেকলে সংস্কৃত কলেজসহ সকল প্রাচ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি বন্ধ করে দেওয়ার প্রস্তাব দিলেও তা গ্রহণ করা হয়নি । তবে তাঁর প্রস্তাব মেনেই বেন্টিঙ্ক ইংরেজি শিক্ষাকে সরকারি নীতিরূপে ঘােষণা করেন ( ১৮৩৫ খ্রি . ৭ মার্চ ) । এরপরেই কলকাতায় মেডিকেল কলেজ ( ১৮৩৫ খ্রি . ) , রুরকিতে রুরকি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ , মাদ্রাজে মাদ্রাজ ইউনিভার্সিটি হাইস্কুল , বােম্বাইতে এলফিনস্টোন ইন্সটিটিউশন গড়ে ওঠে ।

  • সরকারি কাজে ফারসির পরিবর্তে ইংরেজি ভাষা প্রচলিত হয় ( ১৮৩৭ খ্রি . ) ।
  • ইংরেজি ভাষার দক্ষ ব্যক্তিরা সরকারি কাজে অগ্রাধিকার পাবে বলে ঘােষণা করা হয় ।
  • ইংরেজি ভাষার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় মাতৃভাষায় শিক্ষাদান পদ্ধতি অবহেলিত হয় ।

মেকলে মিনিট এর মন্তব্য

মেকলে মিনিট ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারে নবদিগন্ত উন্মােচন করে । সমাজের উচ্চবর্গের ভারতীয়দের মাধ্যমে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষা চুঁইয়ে পড়ে ( ইনফিলট্রেশন থিয়ােরি ) সমাজের নিম্নবর্গের মানুষের কাছে না পৌঁছালেও নীচু তলায় আধুনিক চিন্তাধারার অনুপ্রবেশ ঘটেছিল । আসলে মেকলে চেয়েছিলেন যে — এমন এক শ্রেণীর ভারতীয় তৈরি করতে যারা বর্ণে ও রক্তে হবে ভারতীয় , কিন্তু ভাবনা ও রুচিতে হবে ইউরােপীয়  (‘ Indian in blood and colour , but English in tastes , in opinions , and in morals and intellect ’) ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!