আইন অমান্য আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণ

আইন অমান্য আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণ

gandhi small 041818084924
Civil Disobedience Movement

আইন অমান্য আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার অনেক কারণ ছিল — 

আন্দোলন প্রত্যাহারের ভ্রান্ত সিদ্ধান্ত

বহু আশা নিয়ে সকল স্তরের ভারতবাসী আইন অমান্য আন্দোলনে যােগ দিয়েছিল । কিন্তু হঠাৎ গান্ধিজির আন্দোলন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে তাদের সে আশা পূরণ হয়নি । পাটনায় অনুষ্ঠিত ( ১৯৩৪ খ্রি. ৮ মে ) নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির অধিবেশনে আনুষ্ঠানিকভাবে আইন অমান্য আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেওয়া হয় । এ প্রসঙ্গে অমলেশ ত্রিপাঠী , ‘ স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস ’ গ্রন্থে লিখেছেন , “ … দেখা গেল সৈনিকরা সংগ্রাম চালাতে প্রস্তুত , অথচ সেনানায়ক যুদ্ধ বিরতির আদেশ দিলেন । ” 

ব্রিটিশ সরকারের নিষ্ঠুর দমননীতি

ব্রিটিশের নিষ্ঠুর দমননীতির জন্য আইন অমান্য আন্দোলন স্থায়ীভাবে দানা বাঁধতে পারেনি । ব্রিটিশ ইন্ডিয়া লিগ পরিচালিত ‘ ডেলিগেশন রিপাের্ট ’ থেকে জানা যায় আন্দোলনের প্রথম পর্ব থেকেই গ্রেফতার , বেত্রাঘাত , লাঠিচার্জ সমানে চলতে থাকে । কেবল পেশােয়ারেই পুলিশের গুলিতে ৩০০ সত্যাগ্রহীর মৃত্যু হয় । প্রায় এক লক্ষ কুড়ি হাজার সত্যাগ্রহীকে গ্রেফতার করা হয় । এ প্রসঙ্গে বড়ােলাট লর্ড উইলিংডন  বলেছিলেন — আমি একজন ক্ষুদ্র মুসােলিনিতে পরিণত হয়েছি । 

অপরিকল্পিত কর্মসূচি 

অপরিকল্পিত ও ত্রুটিপূর্ণ কর্মসূচির জন্য এই আন্দোলন তার ঘােষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয় ।

প্রয়োজনীয় অর্থের অভাব

আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে অর্থের প্রয়ােজন ছিল তা শিল্পপতিদের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি । পুঁজিপতিশ্রেণি সাহায্যের হাত গুটিয়ে নেওয়ায় আন্দোলনকে দীর্ঘমেয়াদি করা সম্ভব হয়নি । 

সাংগঠনিক দৃঢ়তার অভাব 

আন্দোলনকে দীর্ঘদিন ধরে এগিয়ে নিয়ে যেতে গেলে যে সাংগঠনিক শক্তির দরকার , সেসময়ে কংগ্রেসের তা ছিল না । একটি গণ আন্দোলনকে সুসংহত রূপ দেওয়ার জন্য ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে যে দৃঢ় সংগঠনের প্রয়ােজন ছিল সেদিকে কংগ্রেস নজর দেয়নি । বড়লাট উইলিংডন বলেন — কংগ্রেস ভেঙে পড়ছে , জনসাধারণের মনে কংগ্রেস প্রভাব হারিয়েছে । 

অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নিষ্ক্রিয়তা

মুসলিম লিগ এই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়নি । অনেকে মনে করেন , কমিউনিস্ট দল শ্রমিকশ্রেণির মুক্তির জন্য যতটা উদগ্রীব ছিল , ভারতের স্বাধীনতাপ্রাপ্তির ব্যাপারে ছিল ঠিক ততটাই উদাসীন ।

মুসলিমদের অসহযােগিতা 

মুসলমানরা এই আন্দোলন থেকে দূরে ছিল । উত্তর – পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ বাদে ভারতের অন্যান্য জায়গার মুসলিম সম্প্রদায় এই আন্দোলনে যােগদান করেনি । এর প্রমাণ এলাহাবাদে আন্দোলন চলাকালীন গ্রেফতার হওয়া ৬৭৯ জনের মধ্যে মুসলিম ছিলেন মাত্র ৯ জন । 

মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অসহযােগিতা

মধ্যবিত্তশ্রেণি ক্রমশ এই আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ায় । ছাত্ররা ধীরে ধীরে স্কুল কলেজে ফিরতে থাকে । আইনজীবীরাও আবার আদালতের কাজকর্ম শুরু করেন । 

শ্রমিক শ্রেণীর উদাসীনতা

বিভিন্ন শ্রমিক নেতা ও ইউনিয়নগুলি আন্তরিকতার সঙ্গে এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করা উচিত বলে মনে করেনি । আসলে আইন অমান্য আন্দোলনের ঠিক পূর্বেই কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে গিরনি কামগার শ্রমিক ধর্মঘট ব্যর্থ হওয়ায় অর্থাৎ শ্রমিক ছাঁটাইয়ের কোনাে সুরাহা না হওয়ায় শ্রমিকশ্রেণী এই আন্দেলনে যােগ দেওয়ার কোনাে উৎসাহ দেখায়নি ।

গান্ধীজীর দায়িত্ব

আইন অমান্য আন্দোলন যখন চরমে পৌঁছেছে , তখন গান্ধিজি ব্রিটিশের সাম্প্রদায়িক নীতির প্রতিবাদে পুনার যারবেদা জেলে আমরণ অনশন শুরু করেন , ফলে আন্দোলন ধামাচাপা পড়ে যায় । জেল থেকে ছাড়া পেয়ে গান্ধিজি ব্যক্তিগত সত্যাগ্রহের ডাক দেন ।

উপসংহার 

বিঠলভাই প্যাটেল এই আন্দোলন সম্পর্কে প্রতিবাদের সুরে বলেন — রাজনৈতিক নেতারূপে গান্ধি ব্যর্থ হয়েছেন । ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে — সৈন্যরা অস্ত্র সমর্পণ না করলেও সেনাপতিরা অস্ত্র সমর্পণ করেন । আইন অমান্য আন্দোলন ভারতের স্বাধীনতা আনতে পারেনি ঠিকই , কিন্তু ভবিষ্যতের স্বাধীনতা আন্দোলনের পথকে মসৃণ করেছিল । আপাত ব্যর্থতা সত্ত্বেও এই আন্দোলন আপামর ভারতবাসীর মনে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে পেরেছিল ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!