1917 সালের রুশ বিপ্লবের কারণ

1917 সালের রুশ বিপ্লবের কারণ

বিশ্বের যে-কটি ঘটনা মানুষের রাজনৈতিক , সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে আলােড়ন তুলে ইতিহাসে যুগান্তর সৃষ্টিতে সহায়তা করেছে , ১৯১৭ সালে রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লব নিঃসন্দেহে সেগুলির অন্যতম । স্বৈরতন্ত্র ও নবাগত সমাজতন্ত্রের চিরাচরিত দ্বন্দ্বের ফল হল এই বিপ্লব । এই বিপ্লব রাশিয়ায় স্বৈরাচারী জারতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিশ্বে এক নতুন ধরনের সভ্যতা সৃষ্টি করেছে , তুলে ধরেছে সমাজতন্ত্রবাদের সুদূর প্রসারী সম্ভাবনা । 

image 1
1917 সালের রুশ বিপ্লবের কারণ

রাশিয়ার এই রাজতন্ত্র – বিরােধী বিপ্লবের পেছনে রাজনৈতিক , অর্থনৈতিক , সামাজিক ইত্যাদি নানা কারণ কাজ করেছিল । 

রুশ বিপ্লবের রাজনৈতিক কারণ

জারের স্বৈরাচার : 

ইউরােপের অন্তর্গত হলেও মহাদেশের অন্যান্য দেশের তুলনায় রাশিয়া ছিল নিতান্ত অনগ্রসর । উনিশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত সেখানে মধ্যযুগীয় সামন্ততন্ত্র প্রচলিত ছিল । রাশিয়ার রােমানভ বংশীয় জারগণ অত্যাচারী সৈন্যদল এবং গুপ্ত পুলিশবাহিনীর সাহায্যে স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা কায়েম করেছিল । জার নিজের ইচ্ছেমতাে ডুমা ( জাতীয় আইন সংসদ ) ও জেমেস্টভাে ( স্বায়ত্তশাসন মূলক প্রতিষ্ঠান ) ভেঙে দিতে পারতেন । স্বৈরাচারী জারতন্ত্রের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার লক্ষ্যে রুশ বিপ্লবের ডাক দেয় ।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভূমিকা : 

বলশেভিক দল ছাড়াও আরও কিছু রাজনৈতিক দল বিপ্লবের পটভূমি রচনাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল । এই দলগুলির মধ্যে ছিল মধ্যবিত্তদের কনস্টিটিউশনাল ডেমােক্র্যাটিক পার্টি , কৃষকদের সােশ্যাল রিভােলিউশনারি পার্টি , শিল্প শ্রমিকদের সােশ্যাল ডেমােক্রাট পার্টি । এ ছাড়াও সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী  নারদনিক পপুলিস্ট এই বিপ্লবের পটভূমি রচনায় সাহায্য করে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব : 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যােগদান রাশিয়ার জারতন্ত্রের পতন ত্বরান্বিত করে । প্রথম বিশ্বযুদ্ধ রাশিয়াকে আর্থিক ও সামরিক দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত করে । প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যােগ দেওয়ার খেসারত হিসেবে ১০ মিলিয়ন সেনার খাদ্য , পােশাক , অস্ত্র ও বেতন জোগাতে গিয়ে রাজকোশ শূন্য হয়ে পড়ে । যুদ্ধ পরিচালনার জন্য জার সরকার বাধ্য হয়ে বিদেশ থেকে ৩০০ মিলিয়ন রুবল ঋণ গ্রহণ করে । এর ফলে রাশিয়ায় যে অভ্যন্তরীণ সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল তা জার সরকার সমাধান করতে অপারক হয় । তাই রাশিয়ার প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যােগদানের সিদ্ধান্ত রুশ বিপ্লবের পটভূমি তৈরি করে বলা যায় । বি. এইচ. সুমনার বলেছেন — প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যােগ না দিলে জারতন্ত্রের পতন ঘটত না ( Tsarism would not have collapsed as it did but for the war ‘ ) ।  

রুশ বিপ্লবের সামাজিক কারণ

রুশীকরণ নীতি : 

অস্ট্রিয়া সাম্রাজ্যের মতাে জার – শাসিত রাশিয়াতেও পােল , ফিন , তুর্কি , জর্জীয় , আর্মেনীয় , ইউক্রেনীয় , বাইলাে – রুশ প্রভৃতি বিভিন্ন জাতি গােষ্ঠীর মানুষ বসবাস করত । ১৯০৫ – এর বিপ্লবের পর জার সরকার ওই জাতিগুলির জাতীয় সত্তাকে অগ্রাহ্য করে তাদের ওপর রুশ ভাষা , সংস্কৃতি ও কৃষ্টি চাপিয়ে দেয় । এই রুশীকরণ নীতির বিরুদ্ধে গােটা রাশিয়ায় প্রবল বিক্ষোভ সঞ্চারিত হয় এবং অরুশ জাতিগােষ্ঠীগুলি নিজ নিজ স্বাতন্ত্র্য রক্ষা জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয় ।

বলশেভিকদের ভূমিকা : 

বলশেভিকরা যুদ্ধ বিরতি , শান্তির জন্য যে – কোনাে মূল্যে জার্মানির সঙ্গে সন্ধি , শ্রমিকদের আট ঘণ্টা কাজ ও মজুরি বৃদ্ধি , কৃষকদের মধ্যে ভূমি বণ্টন প্রভৃতি দাবি নিয়ে দেশের বিভিন্ন অংশে জনমত গড়ে তুলতে শুরু করে । দলীয় পত্রিকা প্রাভদা-র মাধ্যমে তারা প্রচার চালায় । এই অবস্থায় রুশ জনগণের একটা বড়াে অংশ বলশেভিক মতাদর্শে আকৃষ্ট হয়ে লেনিনের নেতৃত্বে বিপ্লব ঘটায় ।

সামাজিক অনগ্রসরতা : 

রাশিয়ার সমাজ ব্যবস্থা ছিল বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত । একদিকে ছিল অভিজাত সম্প্রদায় , অপরদিকে ছিল কৃষক ও শ্রমিকদের নিয়ে সাধারণ সম্প্রদায়ের মানুষ । এদের মাঝে ছিল মুষ্টিমেয় মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় । শিক্ষার আলােক স্পর্শ সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছােয়নি । কুসংস্কার ও গোঁড়ামিতে ডুবে থাকা সমাজের অধিবাসীদের মনে সামাজিক উন্নয়নের কোনাে ধারণাই ছিল না । বলশেভিক দল রুশবাসীর সামাজিক অনগ্রসরতাকে তুলে ধরে তাদের বিপ্লবের পথে চালিত করে ।

রুশ বিপ্লবের অর্থনৈতিক কারণ

কৃষকদের শােষণ : 

রাশিয়ার মােট জনসংখ্যার শতকরা ৮০ ভাগই ছিল ভূমিদাস । করভারে জর্জরিত এই ভূমিদাসরা ছিল সমাজের সবথেকে নিম্নশ্রেণির সদস্য । ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার রাশিয়া থেকে ভূমিদাস প্রথা উচ্ছেদ করলেও কৃষকদের অবস্থার খুব একটা উন্নতি হয়নি । কেবল শােষকের পরিবর্তন হয়েছিল মাত্র । জমিদারদের অধিকার কেবল হস্তান্তরিত হয়েছিল মীর নামে গ্রাম্য সমিতির ওপর । অবশেষে ১৯০৫ থেকে ১৯১০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ‘ মীর ’ – এর হাত থেকে কৃষকরা জমির মালিকানাস্বত্ব ফিরে পায় । কিন্তু দারিদ্র্যের জ্বালায় ওইসব জমি অধিকাংশ কৃষকই কুলাকদের কাছে বিক্রি করে তাদেরই মজুরে পরিণত হয় , নয়তাে শহরে চলে যায় । এ ছাড়াও সেনাবাহিনীতে যােগদান বাধ্যতামূলক করা হলে শতকরা পঞ্চাশ ভাগ কৃষক জমি থেকে সরে যায় । আইজ্যাক ডয়েসচারের  মতে — বলশেভিক বিপ্লবের পূর্বে রাশিয়ায় কৃষকদের মধ্যে অগ্নিগর্ভ বিপ্লবী পরিস্থিতি তৈরি হয় । 

শ্রমিকদের অসন্তোষ : 

প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও শিল্পক্ষেত্রে রাশিয়া মােটেই উন্নত ছিল না । তবে ইউরােপে শিল্প বিপ্লবের ফলে রাশিয়াতেও কিছু কিছু শিল্প গড়ে উঠতে শুরু করে । কিন্তু সেগুলির মালিক ছিল রাশিয়ার অভিজাতদের সঙ্গে ইংরেজ , ফরাসি , জার্মান প্রভৃতি বিদেশিরা । অল্প মজুরি , উদয়াস্ত পরিশ্রম ও অস্বাস্থ্যকর বস্তি – জীবনের অভিশাপ সাধারণ রুশ শ্রমিকদের জীবনকে জর্জরিত করে তুলেছিল । শ্রমিকরা বুঝে যায় , জারতন্ত্রের উচ্ছেদ ছাড়া তাদের অবস্থার উন্নতি সম্ভব নয় । একটু ভালােভাবে বেঁচে থাকার অধিকার চাওয়ার বিনিময়ে তাদের জীবনে নেমে এল ১৯০৫ খ্রি. ( ২২ জানুয়ারি ) -এর রক্তাক্ত রবিবার – এর ঘটনা । এই অবস্থায় সােশ্যাল ডেমােক্র্যাটিক পার্টির বলশেভিক গােষ্ঠী শ্রমিকদের মধ্যে প্রচার চালিয়ে তাদের সংগঠিত করতে থাকে । পরিণতি হিসেবে ১৯০৫ – এর পর রাশিয়ার দিকে দিকে সংঘটিত শ্রমিক ধর্মঘটগুলি বিপ্লবের পটভূমি রচনায় সাহায্য করে । 

অর্থনৈতিক মন্দা : 

অর্থনৈতিক সমস্যার ফলে রুশবাসী বিপ্লবমুখী হয়ে উঠেছিল । আধুনিক শিল্প স্থাপনের চেষ্টা করলেও জার সরকার একচেটিয়া পুঁজিপতিদের শিল্পোদ্যোগকেই বেশি প্রাধান্য দিতেন । পিটার্সবার্গ ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংকের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ কারখানাগুলির বেশিরভাগ ছিল বিদেশি মূলধনে তৈরি । রাশিয়ার ধাতু ও কয়লা শিল্পে ফরাসি ও বেলজিয়ামের মূলধন , রসায়ন ও ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পে ব্রিটিশ মূলধনের জোগানের ফলে ১৯১৪ সালে বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৪৯৫ মিলিয়ন রুবল । এইভাবে জার সরকারের রাজকোশ একেবারে নিঃশেষিত হয়ে যায় । এককথায় দ্রব্য মূল্য বৃদ্ধি , কৃষি ও শিল্পে অনুৎপাদনতা , প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় অর্থনীতির ওপর চাপ ইত্যাদি সমস্যার সমাধান জার সরকার করতে না পারায় রুশবাসী বিপ্লবের পথকেই বেছে নেয় ।

দার্শনিক ও সাহিত্যিকদের প্রভাব : 

রাশিয়ার জার প্রথম নিকোলাস পশ্চিমের জ্ঞানবিজ্ঞানের ধারা রােধ করতে চেয়েও ব্যর্থ হন । রুশ কবি , সাহিত্যিক , শিল্পীগণ পশ্চিমি উদারনৈতিক ভাবধারা ও মানবতাবাদের প্রসারে সক্রিয় ভূমিকা নেন । গােগল , পুশকিন , গাের্কি , টলস্টয় , ডস্টয়ভস্কি , তুর্গেনেভ , চেখভ প্রমুখ দার্শনিক , কবি , সাহিত্যিক তাঁদের রচনার মাধ্যমে রাশিয়ার অসহায় অবস্থা ও জারের স্বৈরাচার ও অপদার্থ শাসনতন্ত্রের স্বরূপটি তুলে ধরেন । ফলে জারতন্ত্র সম্পর্কে জনমনে দারুণ ঘৃণার সঞ্চার হয় । এরই মধ্যে বুকানিনের নৈরাজ্যবাদকার্ল মার্কসের সমাজতন্ত্রবাদ জনসাধারণের মনে নতুন চেতনার সঞ্চার করে । এইভাবে রুশবাসীর মনােজগতের বিপ্লব বলশেভিক বিপ্লব ঘটাতে সাহায্য করে । 

রুশ বিপ্লবের সূচনা

১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের ৮ মার্চ বা পুরাতন বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী ২৩ ফ্রেব্রুয়ারির ( পূর্বে রাশিয়ায় প্রচলিত জুলিয়ান ক্যালেন্ডার বর্তমানে রাশিয়ায় প্রচলিত ক্যালেন্ডারের তুলনায় ১৩ দিন পিছিয়ে ছিল ) মধ্যে প্রায় ৯০ হাজার শ্রমিক বলশেভিকদের নেতৃত্বে পেট্রোগার্ড শহরে খাদ্যের দাবিতে ধর্মঘঁট শুরু করে । ২ দিনের মধ্যেই এই ধর্মঘট সাধারণ ধর্মঘটের রূপ পায় । বিপ্লবীরা সরকারি অস্ত্রাগার লুঠ করে ও রাজধানী পেট্রোগ্রাড ( বর্তমানের সেন্টপিটার্সবার্গ ) এর দখল নেয় । সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক দলের নেতা প্রিন্স জর্জ লুলভ – এর নেতৃত্বে রুশ অস্থায়ী প্রজাতান্ত্রিক সরকার গঠিত নয় ( ১৯১৭ খ্রিঃ ১৪ মার্চ ) অবসান ঘটে ৩০০ বছরের পুরাতন রােমানভ জারতন্ত্রের ।

1 thought on “1917 সালের রুশ বিপ্লবের কারণ”

Leave a Comment

error: Content is protected !!