লেনিনের নতুন অর্থনৈতিক নীতি

লেনিনের নতুন অর্থনৈতিক নীতি

Vladimir Ilich Lenin 1918
লেনিনের নতুন অর্থনৈতিক নীতি

সাম্যবাদের প্রত্যক্ষ প্রয়ােগের ফলে রাশিয়ার অর্থনৈতিক জীবনে বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল । শিল্প শ্রমিকেরা এবং কৃষকেরা উপযুক্ত পরিমাণ দ্রব্যসামগ্রী উৎপাদনে ব্যর্থ হয়েছিল । ফলে সবক্ষেত্রে যে ঘাটতি দেখা যায় তার ফলে গােটা দেশ জুড়ে এক অর্থনৈতিক বিপর্যয় শুরু হয় । এই অবস্থায় লেনিন এক নতুন অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করেন , যা নব অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ( New Economic Policy , NEP ) নামে পরিচিত । অর্থনীতিতে কৃষি , শিল্প ও বাণিজ্যের ব্যাপারে নতুন কিছু বিষয় উল্লেখ করা হয় । ঐতিহাসিক কার্লটন হেইজ – এর মতে — নতুন অর্থনীতি সমাজতন্ত্র বা ধনতন্ত্র কোনােটিই নয় , কিন্তু উভয়ের মিশ্রণ ছিল ( ‘ New Economic Policy was neither Socialism , nor Capitalism , but a temporary mixture of both ‘ ) ।

লেনিনের নতুন অর্থনৈতিক নীতির বিষয়বস্তু

লেনিনের নতুন অর্থনৈতিক নীতি কার্যত ধনতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের এক কার্যকরী মিশ্রণ বলা যেতে পারে । এই নীতিতে বলা হয় — 

কৃষি : 

1. উদ্বৃত্ত ফসল কৃষকরা ন্যায্য মূল্যে বাজারে বিক্রি করতে পারবে ।

2. শস্যের পরিবর্তে কৃষকরা নগদ অর্থে কর দিতে পারবে । 

3. জমিতে সরকারি কর্তৃত্ব থাকলেও মালিকানাস্বত্ব কৃষকদের হাতে থাকবে । 

4. গ্রামাঞ্চলে সমবায় ব্যবস্থা গড়ে তুলে কৃষি অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করা হবে । 

5. কৃষি ব্যাংক গঠন ( ১৯২৪ খ্রি. ) এবং কৃষিক্ষেত্রে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে কৃষি ব্যবস্থার উন্নতি ঘটানাে হবে ।

শিল্প : 

1. বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলি বাদে ছােটো ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলির ওপর থেকে সরকারি নিয়ন্ত্রণ তুলে দিয়ে সেগুলিতে ব্যক্তিগত মালিকানাস্বত্ব দেওয়া হবে । 

2. বৃহৎ ও ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলি , যেমন — লােহা , কয়লা , ইস্পাত , রেলপথ ইত্যাদি সরকারি মালিকানায় থাকবে । 

3. শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলিকে স্বতন্ত্র সংস্থায় ভাগ করে সেগুলির ওপর কাঁচামাল জোগাড় , নির্দিষ্ট দামে শিল্পজাত পণ্য বিক্রয় ইত্যাদি দায়িত্ব দেওয়া হবে । ও কর্মদক্ষতা , কাজের মান , অভিজ্ঞতা , কাজের পরিমাণ ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে শ্রমিকরা মজুরি , ভাতা , ছুটি ও অন্যান্য সুযােগসুবিধা পাবে । 

6. শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলির ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে বিভিন্ন শিল্পের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা হবে ।

ব্যাবসা বাণিজ্য :

1. বিভিন্ন বাণিজ্যিক সংস্থার দ্বারা বৈদেশিক বাণিজ্য পরিচালিত হবে । 

2. অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মূলধন বিনিয়ােগ নীতির প্রয়ােগ ঘটানাে হবে । 

3. জিনিসপত্রের দাম যাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম ভাবে বাড়াতে না পারে তার জন্য সরকারি বিক্রয় কেন্দ্র গড়ে তােলা হবে । ঐ ক্রেতারাও যাতে তাদের পছন্দ মতাে জিনিস সাধ্য অনুযায়ী কিনতে পারে তার জন্য সমবায় সমিতি প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করা হবে । 

লেনিনের নতুন অর্থনৈতিক নীতির প্রকৃতি

সকল অর্থনৈতিক কাজের মধ্যে যাতে ঠিক মতাে সমন্বয় সাধিত হয় , তার জন্য গঠিত হয় জেনারেল প্ল্যানিং কমিশন । লেনিনের নতুন অর্থনৈতিক নীতির স্বরুপ প্রসঙ্গে পরস্পর বিরােধী মতামত রয়েছে । ঐতিহাসিক লিপসন  মনে করেন যে , লেনিনের এই নব অর্থনীতি ছিল একটি মিশ্র অর্থনীতি । 

লেনিনের নতুন অর্থনৈতিক নীতির ফলাফল

লেনিনের নতুন অর্থনৈতিক নীতির সুফল রূপে রাশিয়ায় অতি দ্রুত কৃষি , শিল্প ও বাণিজ্যের উন্নতি ঘটে । 

1. কৃষিজ উৎপাদন বাড়ে , 

2. শিল্পজাত পণ্যসামগ্রীর উৎপাদন বৃদ্ধির হার বেড়ে হয় ৪১ শতাংশ , 

3.খাদ্য উৎপাদন বাড়ে ,

4. পূর্ণ রেশনিং ব্যবস্থা চালু হয় , 

5. শিক্ষা , স্বাস্থ্য , পরিবহনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকার প্রচুর অর্থ লগ্নি করায় সার্বিকরূপে রুশবাসীর জীবনযাত্রার মানের উন্নতি ঘটে । রাশিয়ার অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে এই নীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । এই প্রয়ােজন – ভিত্তিক মিশ্র অর্থনীতির প্রবর্তন করে লেনিন রাশিয়া তথা রুশ বিপ্লবকে সফলতার পথে এগিয়ে নিয়ে যান ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!