জার্মানিতে নাৎসিবাদ ও হিটলারের উত্থান

জার্মানিতে নাৎসিবাদ ও হিটলারের উত্থান

PROD Adolf Hitler whrend einer Rede
জার্মানিতে নাৎসিবাদ ও হিটলারের উত্থান

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সমাজতান্ত্রিক সােভিয়েত ইউনিয়ন বাদে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেই গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় । যুদ্ধ পরবর্তীকালের জার্মানিতেও রাজতন্ত্রের বিরােধিতা শুরু হয় । ব্যাভেরিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে গণ বিদ্রোহ শুরু হলে সম্রাট কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়ম হল্যান্ডে চলে যান । জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেতা ফ্রেডারিক ইবার্ট – এর পরিচালনায় সােশ্যালিস্ট রিপাবলিকান দল জার্মানিতে রাজতন্ত্রের পরিবর্তে প্রজাতান্ত্রিক সরকার গঠন করে । যার নাম হয় ভাইমার প্রজাতন্ত্র । এই প্রজাতান্ত্রিক সরকারের আমলে বিভিন্ন কারণে হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসিবাদের উন্মেষ ঘটে । 

জার্মানিতে নাৎসিবাদের উত্থানের কারণ

ভাইমার প্রজাতন্ত্রের ব্যর্থতা : 

ভাইমার প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়ে । এই সরকার ভার্সাই চুক্তির অপমানজনক শর্তগুলি মেনে নিলে এবং ৬৬০ কোটি পাউন্ড ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হলে জার্মানবাসী এই সরকারের প্রতি ক্ষোভে ফেটে পড়ে । ফলে ভাইমার প্রজাতন্ত্র জনপ্রিয়তা হারায় । এই পরিস্থিতিতে হিটলারের নাৎসি দলের উত্থানের পথ প্রশস্ত হয় ।

আর্থিক সংকট : 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত জার্মানি আর্থিক দিক থেকে দুর্বল হয়ে পড়ে । মুদ্রা স্ফীতি ও নিত্য প্রয়ােজনীয় জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধিতে জার্মানবাসীর আর্থিক জীবন একেবারে ভেঙে পড়ে । ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মহামন্দা দেখা দিলে ইউরােপের অন্যান্য দেশের মতাে জার্মানিও মার্কিন পুঁজির লগ্নির আশা করে । কিন্তু মার্কিন পুঁজিপতিরা ইউরােপে অর্থলগ্নী করতে অস্বীকার করলে জার্মানির অর্থ সংকট আরও তীব্র হয় । পশ্চিমি শক্তিবর্গ ডাওয়েজইয়ং পরিকল্পনার মাধ্যমে জার্মানবাসীর অর্থ সংকট মেটাতে চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয় ।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভূমিকা : 

ভাইমার প্রজাতন্ত্রে রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য কোনাে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের ক্ষমতা স্থায়ী হয়নি । সােশ্যাল ডেমােক্র্যাট সেন্টার ডেমােক্রাটদের নিয়ে গঠিত যৌথ মন্ত্রীসভা স্থায়ী হয়নি । ১৯১৯-১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে জার্মানিতে মােট ১৫ টি মন্ত্রীসভা ক্ষমতায় আসে । ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবরে বিশিষ্ট জার্মান রাজনীতিবিদ তথা বিদেশমন্ত্রী স্ট্রেসম্যান মারা যাওয়ার পর জার্মান রাজনীতি পুনরায় সংকট গ্রস্থ হয়ে পড়ে । এই সংকটের সুযােগ নেয় হিটলার ও তাঁর নাৎসি দল ।

জার্মান বিদেশ নীতির ব্যর্থতা : 

জার্মান সাধারণতন্ত্রী সরকারের বিদেশ নীতির উদ্দেশ্য ছিল সামরিক ক্ষেত্রে জার্মানির স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা , রাইন অঞ্চলকে পুনরায় জার্মানির অন্তর্ভুক্ত করা এবং বিদেশিদের কবল থেকে দেশকে রক্ষা করা । কিন্তু যুদ্ধের পর জার্মানি রাশিয়ার সঙ্গে র‍্যাপালাে সন্ধিতে আবদ্ধ হলে ( ১৯২২ খ্রি. ) জার্মান বিদেশনীতির উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয় , এতে জার্মানবাসী ক্ষুদ্ধ হয় ।

সংসদীয় গণতন্ত্রে অশ্রদ্ধা : 

জার্মানির গণতান্ত্রিক সংবিধানের ত্রুটির জন্য গণতন্ত্রের ভীত দুর্বল ছিল , যার জন্য রাজনৈতিক ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা আসেনি । জার্মান জাতির গণতান্ত্রিক অধিকারগুলি সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সরকার ব্যর্থ হয় , ফলে গরিষ্ঠ সংখ্যক জার্মানবাসী প্রচলিত গণতান্ত্রিক সংসদীয় ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারান । যার পূর্ণ সুযােগ নেয় হিটলারের নাৎসি দল ।

কমিউনিস্ট ভীতি : 

জার্মানিতে স্পার্টাকান নামক কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে কৃষক – শ্রমিক আন্দোলন এবং বিভিন্ন শিল্প কারখানাগুলিতে ধর্মঘট শুরু হয় । সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শিল্পপতিরা পর্যন্ত এতে ভীত হয়ে পড়ে । তাই কমিউনিস্টদের প্রতিহত করার জন্য তারা নাৎসিদের সাহায্য প্রার্থনা করে ।

ইহুদি বিদ্বেষ : 

জার্মানরা ছিল টিউটন জাতিভুক্ত । তাই তারা জার্মানিতে বসবাসকারী ইহুদিদের সহ্য করতে পারত না । অধিকাংশ জার্মানবাসী তাদের দুরবস্থার জন্য ইহুদিরাই দায়ী বলে মনে করত । তাই নাৎসি দল জার্মানবাসীর মন বুঝে ইহুদি বিতারণকে তাদের অন্যতম কর্মসূচি বলে গ্রহণ করেন । নাৎসি দলের তরফে জার্মানি থেকে ইহুদি বিতরণ কর্মসূচি তাদের ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করে ।

নাৎসি দল গঠন : 

হিটলার অস্ট্রিয়ার একটি ছােটো শহরে জন্মালেও ( ১৮৮৯ খ্রি. ) তেইশ বছর বয়সে মিউনিখে চলে আসেন । প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ব্যাভেরিয়ার সেনাদলে করপােরাল হিসেবে লড়াই করে পুরস্কৃত হন । যুদ্ধ শেষে তিনি অ্যান্টন ড্রেক্সলার প্রতিষ্ঠিত জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি নামে মিউনিখের এক রক্ষণশীল জঙ্গি গােষ্ঠীতে নাম লেখান । পরে এই দলের নাম হয় ন্যাশনাল সােশ্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি ( NSDAP , ১৯২০ খ্রি. ) বা নাৎসি দল । হিটলার হলেন এই দলের সর্বময় কর্তা ( ফুয়েরার ) ।

হিটলারের প্রভাব : 

জার্মানিতে নাৎসিবাদের উত্থানে হিটলারের সাংগঠনিক শক্তি , নেতৃত্ব দক্ষতা , বাগ্মিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল । নিজের আত্মজীবনী ‘ মেঁই ক্যাম্ফে ’ জার্মান জাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার জার্মানবাসীকে হিটলারের প্রতি অনুরক্ত করে তােলে । তাঁর জ্বালাময়ী ভাষণ জনমানসে নতুনভাবে উন্মাদনা সৃষ্টি করেছিল । পশ্চিমি রাষ্ট্র জোটের বিরুদ্ধে তাঁর দুঃসাহসিক অভিযানের প্রস্তুতি নাৎসি দলকে জার্মানবাসীর কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছিল । হিটলার সুকৌশলে মিত্রশক্তি , ভাইমার প্রজাতন্ত্র , বিত্তবান জার্মান সম্প্রদায় , সাম্যবাদী ও ইহুদিদের বিরােধিতা করে জার্মানবাসীর মন জয় করে নেন । ঐতিহাসিক অ্যালান বুলক  তাই বলেছেন — হিটলার ছিলেন জনগণের আবেগ তৈরিতে ওস্তাদ ( ‘ Hitler was a master of mass emotion ‘ ) ।

হেরেনভক তত্ত্ব : 

নাৎসিবাদের প্রধান ভিত্তি ছিল উগ্র জাতীয়তাবাদ । হিটলার প্রচার করেছিলেন জার্মানরাই একমাত্র বিশুদ্ধ আর্য জাতির উত্তরাধিকারী । অন্যান্য সবজাতিই বর্ণসংকর । সুতরাং শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে জার্মানরা অন্যান্য বর্ণসংকর জাতির ওপর আধিপত্য কায়েম করার অধিকারী । এই তত্ত্ব ‘ হেরেনভক তত্ত্ব ’ নামে পরিচিত । এই তত্ত্বকে বাস্তবে প্রয়ােগ করে হিটলার ও তার নাৎসি দল প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করে । 

নাৎসি দলের ক্ষমতা দখল :

১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনে নাৎসি দল ৬০৮ টি আসনের মধ্যে ২৩০ টি আসন পায় । প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গ হিটলারকে সরকার গঠন করতে ডাকলে হিটলার প্রথমে এক বহুদলীয় সরকার গঠন করেন , কিন্তু তাতে শাসন পরিচালনায় বিভিন্ন অসুবিধা দেখা দিলে হিটলারের পরামর্শ মেনে , প্রেসিডেন্ট পুনর্নির্বাচনের আদেশ দেন । ৫ মার্চের এই নির্বাচনে নাৎসি দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হয়ে জোট সরকারে যােগ দেয় । জার্মান সংসদের এক বিশেষ আইন বলে হিটলার শাসন পরিচালনা ও আইন প্রণয়নের সর্বোচ্চ ক্ষমতা লাভ করেন । এই ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়েই রাষ্ট্রপতি হিন্ডেনবার্গ মারা যাওয়ার পর হিটলার নিজেকে ফুয়েরার ঘােষণা করে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি পদ গ্রহণ করেন । হিটলারের নেতৃত্বে জার্মানিতে নাৎসিবাদের উন্মেষ সম্পন্ন হয় ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!