রুজভেল্টের নতুন ব্যবস্থা / নিউ ডিল / New Deal

Contents

রুজভেল্টের নতুন ব্যবস্থা / নিউ ডিল / New Deal

franklin delano roosevelt
রুজভেল্টের নতুন ব্যবস্থা

মার্কিনবাসীর জীবনে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট হুভারের আমলে মহামন্দার যে কালাে ছায়া নেমে এসেছিল , তার অবসান ঘটিয়েছিলেন ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট তাঁর নতুন আর্থিক নীতি বা নিউ ডিলের মাধ্যমে । এই ব্যবস্থা ছিল মার্কিন বেকার সমস্যার সমাধান এবং শিল্প , কৃষি , বাণিজ্য ও ব্যাংক ব্যবস্থার পুনরুজ্জীবনকল্পে গৃহীত এক কঠোর পদক্ষেপ । রুজভেল্টের পরামর্শদাতা তথা বিখ্যাত সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদ রেমন্ড চার্লস মােলে ‘ নিউ ডিল ‘ ( New Deal ) শব্দটি চয়ন করেন । রুজভেল্ট আমেরিকাবাসীর উদ্দেশ্যে বলেন— “ আমি নিজেকে বন্দক রেখে প্রতিজ্ঞা করছি আমেরিকানদের জন্য একটা নতুন ব্যবস্থা নিয়ে আসব ” ( I pledge you , I pledge myself , to a new deal for American people ) ।

রুজভেল্টের নতুন ব্যবস্থা / নিউ ডিল এর উদ্দেশ্য

রুজভেল্টের নিউ ডিলের মূল উদ্দেশ্য ছিল —

ত্রাণ : 

গৃহহীন , অন্নহীন , দারিদ্র ক্লিষ্ট লক্ষ লক্ষ আমেরিকাবাসীকে সাহায্য দান ।

পুনরুজ্জীবন : 

মহামন্দা থেকে দেশ তথা দেশবাসীকে উদ্ধার করতে আমেরিকার অর্থনীতিকে পুনরায় সচল করা ।

সংস্কার : 

সংস্কারের মাধ্যমে সমাজের বর্তমান দুর্বলতাকে কাটিয়ে ওঠা এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে প্রয়ােজনীয় ব্যবস্থাদি গ্রহণ করা । 

এইভাবে নিউ ডিলকে কার্যকারী করার লক্ষ্যে রুজভেল্ট প্রথমেই রিপাবলিকানদের অবাধ বাণিজ্য নীতির পরিবর্তন ঘটান এবং অত্যন্ত কঠোর পথে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালিত করেন । 

রুজভেল্টের নতুন ব্যবস্থা / নিউ ডিল এর তাৎপর্য

রুজভেল্টের নিউ ডিলের তাৎপর্য বিশ্লেষণে দেখা যায় —

অর্থের গ্যারান্টি : 

মার্কিন সরকার সাময়িকভাবে ব্যাংকগুলি পরিচালনার দায়িত্ব এবং ব্যাংকে জমা রাখা অর্থের গ্যারান্টি নেয় । যাতে আমেরিকাবাসী ব্যাংকে তাদের টাকা জমা রাখতে সাহস পায় ।

দি সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন গঠন : 

১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে গঠিত এই কমিশনের মাধ্যমে শেয়ারবন্ড ও সিকিউরিটির ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ আরােপিত হয় ।

কৃষক ত্রাণ আইন ( ১৯৩৩ খ্রি. ) : 

আমেরিকা সরকার কৃষক ত্রাণ আইনের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া চালু করে । এতদিন ধরে কৃষকরা অতিরিক্ত উৎপাদন করলেও উৎপাদিত পণ্যের সঠিক দাম পেত না । এই আইন পাস হবার ফলে কৃষকরা উৎপাদিত পণ্যের সঠিক দাম পায় , ফলে লাভের পরিমাণ বাড়ে ।

সিভিলিয়ান কনজারভেশন কর্পস গঠন : 

এই সংস্থাটি গঠনের মাধ্যমে গ্রামগুলির লক্ষ লক্ষ বেকার যুবককে নির্মাণ কার্যে নিয়ােগ করে বেকার সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হয় । তাদেরকে মাসে ৩০ পাউন্ড বেতন দেওয়া হত এবং এদের খাদ্য , বস্ত্র ও বাসস্থানের দায়িত্ব ছিল সরকারের ।

জাতীয় শিল্প পুনঃপ্রতিষ্ঠা আইন ( ১৯৩৩ খ্রি. ) : 

এই আইন পাসের মাধ্যমে বিভিন্ন জাতীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মচারীদের কাজকে স্থায়ী করার চেষ্টা করা হয় । শিল্পের বিকাশ ঘটিয়ে অর্থনীতিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় । এই আইনের দ্বারা ‘ পাবলিক ওয়ার্কস অ্যাডমিনিস্ট্রেশান ’ গঠন করে তার ওপর বাঁধ , ব্রিজ , রাস্তা , হাসপাতাল , স্কুল , এয়ারপোের্ট ও সরকারি গৃহ নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয় । এর ফলে বহু লােকের চাকরি হয় ।

দ্য ফেডারেল এমারজেন্সি রিলিফ অ্যাডিমিনিস্ট্রেশন : 

এই সংস্থাটির অধীনে ৫০০ মিলিয়ন ডলার তহবিল গঠন করা হয় । এই অর্থ দিয়ে অসহায়দের ত্রাণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয় এবং তাদের খাদ্যের জোগান দেওয়া হয় । 

রুজভেল্টের নতুন ব্যবস্থা / নিউ ডিল এর ব্যর্থতা

রুজভেল্ট প্রবর্তিত ডিলের বেশকিছু ত্রুটিবিচ্যুতিও ছিল ।

উদ্দেশ্য পূরণে : 

এই ব্যবস্থার প্রাথমিক উদ্দেশ্য হিসেবে প্রত্যেকের জন্য চাকুরি এবং উৎপাদন ব্যবস্থার পুনরুজ্জীবন ঘটানাের ঘােষণা করা হলেও এর কোনােটিই সফল হয়নি ।

শিল্প ক্ষেত্রে : 

ভােগ্য পণ্যজাত উৎপাদন শিল্প বাদে অন্যান্য শিল্পক্ষেত্র গুলিতে সেভাবে বিনিয়ােগ না হওয়ায় সেগুলি অবহেলিত থেকে যায় । 

রুজভেল্টের নতুন ব্যবস্থা / নিউ ডিল এর সাফল্য

রুজভেল্টের ‘ নিউ ডিল ’ বেশ কিছু সাফল্য এনেছিল —

মহামন্দা অবসানে : 

বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়কালে সমগ্র আমেরিকা জুড়ে যে আর্থিক মহামন্দা দেখা দেয় তার অনেকটাই অবসান ঘটায় নিউ ডিল ব্যবস্থা ।

দারিদ্র্য মােচন ও বেকারত্বের অবসানে : 

এই ব্যবস্থা দারিদ্র্য ও বেকারত্বের অবসান ঘটায় । ফলে আমেরিকাবাসীর জীবনে সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ফিরে আসে ।

অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনে : 

এই ব্যবস্থা ভেঙে পড়া আমেরিকার জাতীয় অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন ঘটায় । ফলে সরকারের প্রতি আমেরিকাবাসীর আস্থা ফিরে আসে ।

শ্রমিক কল্যাণে : 

ন্যাশনাল রিকভারি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ( N.R.A. ) গঠনের মাধ্যমে শ্রমিকদের কাজের সময়সীমা সর্বোচ্চ আট ঘণ্টা বেঁধে দেওয়া , সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণ এবং শিশু শ্রমিক নিষিদ্ধ ঘােষণা করা হয় ।

জন কল্যাণে : 

আমেরিকাবাসীর হিত সাধনের লক্ষ্যে দেশের মধ্যে প্রচুর নতুন রাস্তা , স্কুল , হাসাপাতাল তৈরি হয় ।

কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নে : 

কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে জলাধার নির্মাণ , সেচ প্রকল্পের রূপায়ণ , বন্যা রােধে বাঁধ নির্মাণ করা হয় । 

উপসংহার 

রুজভেল্ট তাঁর নিউ ডিল রূপায়ণের মাধ্যমে মার্কিন অর্থনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন । এই ব্যবস্থা অনুযায়ী বিশাল পরিমাণ অর্থ বিনিয়ােগের মাধ্যমে আমেরিকার অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন ঘটানাে হয়েছিল । এ প্রসঙ্গে এ. ও. নােনস্লার  ‘ A Study of World History ‘ গ্রন্থে লিখেছেন— ‘ Roosevelt through legislations began to pour federal money into the American economy ‘ ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!