ভার্সাই সন্ধির শর্ত গুলি আলােচনা করাে

ভার্সাই সন্ধির শর্ত গুলি আলােচনা করাে

১৯১৮ খ্রি. ১১ নভেম্বর জার্মানি আত্মসমর্পণ করলে মিত্রশক্তি ও তার সহযােগী ৩২ টি দেশের প্রতিনিধিরা ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে একটি সম্মেলনে মিলিত হন । এই সম্মেলনে পাঁচটি সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়েছিল । যার একটি হল জার্মানি ও মিত্রপক্ষের মধ্যে প্যারিসের ভার্সাই নগরীতে স্বাক্ষরিত ভার্সাই সন্ধি ( ১৯১৯ খ্রি. ২৮ জুন ) । এই সন্ধিটি ছিল প্যারিস শান্তি সম্মেলনে স্বাক্ষরিত সন্ধিগুলির মধ্যে সবথেকে দীর্ঘতম ( ৩৩৯ টি ধারাবিশিষ্ট ) । 

ভার্সাই সন্ধির শর্তাবলী

১৫ টি অধ্যায়ে বিভক্ত ২৩০ পৃষ্ঠার ভার্সাই সন্ধির মূল ধারাগুলি ছিল— 

ভার্সাই সন্ধির আঞ্চলিক পুনর্গঠন শর্তাবলী : 

ভার্সাই সন্ধির শর্ত হিসেবে ঠিক করা হয় — জার্মানি বিভিন্ন দেশকে বিভিন্ন অঞ্চল ছেড়ে দেবে । যেমন —

1. ফ্রান্সকে তার হারানাে কয়লা খনি আলসাস ও লৌহখনি লােরেন ফিরিয়ে দেবে । 

2. বেলজিয়াম মনসেরেট , মেলমেডি , ইউপেন পাবে ।  

3. ডেনমার্ক স্লেজউইগ অঞ্চল লাভ করবে ।

4. লিথুয়ানিয়া পাবে মেমেল বন্দর । 

5. পােল্যান্ড লাভ করবে পােজেন ও পশ্চিম প্রাশিয়ার একাংশ । 

6. জামার্নির পূর্ব সীমান্তে পােল্যান্ডকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্ররূপে গঠন করা হবে । 

7. পােল্যান্ডের সমুদ্র পথে যােগাযােগের সুবিধার জন্য জার্মানির মধ্যে দিয়ে পােলিশ করিডর নামক রাস্তা তৈরি হবে । 

8. এশিয়া ও আফ্রিকায় অবস্থিত জার্মানির বিভিন্ন উপনিবেশগুলি মিত্রশক্তিবর্গ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেবে । 

9. জার্মানির ডানজিগ বন্দরকে সকলের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে এবং 

10. রাইন , দানিয়ুব , ওডার , নিয়েমেন নদীগুলির ওপর আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ আরােপ করা হবে ।

ভার্সাই সন্ধির অর্থনৈতিক শর্তাবলী :

ভার্সাই সন্ধিতে জার্মানির ওপর মিত্রপক্ষ যেসব কঠোর অর্থনৈতিক শর্ত চাপিয়েছিল , তার মধ্যে অন্যতম ছিল — 

1. প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জন্য জার্মানিকে দায়ী করে ৬৬০ কোটি পাউন্ড ক্ষতিপূরণের দায় জার্মানির ওপর ন্যস্ত করা ।  

2. জার্মানি কী পদ্ধতিতে ক্ষতিপূরণ পরিশােধ করবে তা নির্ধারণের জন্য একটি ক্ষতিপূরণ কমিশন গঠিত হবে ।  

3. জার্মানি তার অধিকাংশ বাণিজ্যপােত ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডকে সমর্পণ করবে । 

4. জার্মানির সমৃদ্ধ কয়লাখনি অঞ্চল সার ফ্রান্সের অধীনে এবং জাতিসংঘের নিয়ন্ত্রণাধীনে থাকবে । 

5. ফ্রান্স , ইতালি , বেলজিয়াম , লুক্সেমবার্গ ইত্যাদি দেশকে জার্মানি বাধ্যতামূলক কয়লা , লােহা , কাঠ , রবার ইত্যাদির জোগান দেবে ।

ভার্সাই সন্ধির সামরিক শর্তাবলী :

ভার্সাই চুক্তিতে জার্মানির ওপর আরােপিত সামরিক শর্তগুলি হল —

1. জার্মানির সৈন্য সংখ্যা এক লক্ষতে কমিয়ে আনা হবে এবং ওই সেনারা শুধুমাত্র জার্মানির অভ্যন্তরীণ শান্তি ও সীমান্ত সুরক্ষার দায়িত্ব পালন করবে । 

2. জার্মানিতে বাধ্যতামূলকভাবে সামরিক শিক্ষা গ্রহণ নিষিদ্ধ হবে । 

3. জার্মানি তার সমস্ত যুদ্ধজাহাজগুলি ইংল্যান্ডকে দিতে বাধ্য থাকবে । 

4. রাইন নদীর পূর্বতীর বরাবর ত্রিশ মাইল অঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত সমস্ত জায়গা ( হােলিগােল্যান্ড , কিয়েল অঞ্চল ইত্যাদি ) -র সব জার্মান সামরিক ঘাঁটি ও দূর্গগুলি ভেঙে ফেলা হবে । 

5. জার্মানিতে ট্যাংক , বােমারুবিমান , কামান প্রভৃতি উৎপাদন নিষিদ্ধ হবে । 

6. জার্মানির নৌবাহিনীতে ৬ টি করে যুদ্ধজাহাজ ও ক্রুজার , ১২ টি করে টর্পেডাে ও ডেস্ট্রয়ার এবং ২৫ হাজার নৌ – কর্মচারী থাকবে । 

7. ২২৮ ও ২৩১ নং ধারা অনুযায়ী সম্রাট কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়াম ও জার্মান সেনাপতিদের বরখাস্ত করা হবে । 

8. এই সন্ধির সব শর্তগুলি যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে কি না সেদিকে নজর রাখার জন্য জার্মানির খরচেই জার্মানিতে মিত্রপক্ষের একটি সেনাদল মােতায়েন থাকবে ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!