প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণ গুলি আলোচনা করো

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণ গুলি আলোচনা করো

মানব সভ্যতার ইতিহাস পর্যালােচনায় যেসব বিপর্যয় মূলক ঘটনাগুলি প্রত্যক্ষ করা যায় তার মধ্যে সবথেকে মর্মান্তিক ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ । জল , স্থল , অন্তরিক্ষ জুড়ে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় এই যুদ্ধ বিশ্বযুদ্ধের রূপ নেয় । বিভিন্ন কারণের মিলিত ফল ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ । বিগত কয়েক দশক ধরেই ইউরােপের বিভিন্ন ঘটনা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি রচনা করে । অধ্যাপক জেমস জোলের  মতে — প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতাে ঘটনা কোনাে একটি বা আকস্মিক কারণে ঘটেনি ( ‘ Any single explanation for the out break of war is likely to be the simple ’ )।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণ গুলো

পরস্পর বিরোধী শক্তি জোট :

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ইউরােপ দুটি সশস্ত্র শিবিরে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল । একদিকে ছিল জার্মানি , ইতালি ও অস্ট্রিয়াকে নিয়ে ত্রিশক্তি চুক্তির সামরিক জোট ; আর অন্যদিকে ছিল ইংল্যান্ড , ফ্রান্স ও রাশিয়াকে নিয়ে গড়ে ওঠা ত্রিশক্তি আঁতাত । 

জঙ্গিবাদ বা সামরিকবাদ :

ইউরােপে একে একে যখন জাতীয় রাষ্ট্রগুলি গড়ে ওঠে তখন বিভিন্ন দেশের মধ্যে সামরিক প্রতিযােগিতা শুরু হয় । একদিকে জার্মানি ও ইটালি বিশাল সামরিক বাহিনী গঠন করলে ভীত হয়ে ফ্রান্সও সামরিক প্রস্তুতি নিতে শুরু করে । এদিকে ক্রিমিয়ার যুদ্ধের পর রাশিয়ার জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার রুশ সেনাবাহিনীকে পুনর্গঠন করেন । শক্তিশালী দেশগুলির এই সামরিক তৎপরতার ফলে জঙ্গিবাদ শক্তিশালী হয় । নিত্য নতুন মারণাস্ত্রের আবিষ্কারের ফলে ইউরােপের বাতাস বিষিয়ে ওঠে । ইউরােপীয় রাষ্ট্রগুলি কোটি কোটি টাকা ঋণ সংগ্রহ করে নিজ নিজ বাহিনীকে যুদ্ধের প্রয়ােজনে সুসজ্জিত করে তােলে । ইউরােপীয় দেশগুলিতে সামরিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক হয়ে ওঠে । প্রফেসর সি. আর. ব্রেইলির মতে — ‘ The cry of nature the revelation of geography , the bond of war , the balance of peace ‘।

উপনিবেশের জন্য সংঘাত :

ইউরােপীয় রাষ্ট্রগুলির মধ্যে বাণিজ্যিক ও ঔপনিবেশিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম কারণ । জার্মানি ও ইতালিতে শিল্প বিপ্লব শুরু হয় অনেক পরে । তাই কাঁচামাল সংগ্রহ ও শিল্পজাত সামগ্রী বিক্রির জন্য এই দেশগুলির উপনিবেশ বিস্তারের প্রয়ােজন হয়ে পড়ে । এই উপনিবেশ বিস্তারকে কেন্দ্র করে ইংল্যান্ড , ফ্রান্স , রাশিয়া প্রভৃতি দেশগুলির সঙ্গে জার্মানি ও ইতালির সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে । এইভাবে ঔপনিবেশিক সংঘাত ইউরােপীয় দেশগুলির মধ্যে ঘৃণা ও বিদ্বেষের সৃষ্টি করলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে । ভি. আই. লেনিন তাঁর ‘ ইম্পিরিয়ালিজম দি হাইয়েস্ট স্টেজ অব ক্যাপিট্যালিজম ‘ গ্রন্থে বলেছেন ─ উপনিবেশবাদ , পুঁজিবাদ , সাম্রাজ্যবাদ যমজ ভাইয়ের মতাে পরস্পর হাত ধরাধরি করে অগ্রসর হয় ।

উগ্র জাতীয়তাবাদ :

উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের গােড়ার দিকে , পশ্চিম ইউরােপের হল্যান্ড , আয়ারল্যান্ড , বেলজিয়াম এবং পূর্ব ইউরােপের বলকান অঞ্চলে উগ্র জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু হয় । সার্বিয়াকে কেন্দ্র করে প্যান – জার্মান , প্যান – স্লাভ দ্বন্দ্বের উদ্ভব ঘটে । এভাবেই ইউরােপের প্রতিটি জাতিই নিজের দেশ ও জাতিকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে মনে করতে থাকে এবং অন্যান্য দেশ ও জাতিকে পদানত করে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠায় আগ্রাসী ভূমিকা গ্রহণ করে । এই উগ্র জাতীয়তাবাদ ইউরােপে জাতিগত বৈরিতার সৃষ্টি করে বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি তৈরি করেছিল।

অতৃপ্ত জাতীয়তাবাদ :

ফরাসি বিপ্লব ইউরােপকে জাতীয়তাবাদের মন্ত্রে দীক্ষিত করে তুলেছিল । জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র গঠনের উন্মাদনায় ইউরােপবাসী মেতে উঠেছিল । কিন্তু ভিয়েনা সম্মেলন সেই জাতীয়তাবাদকে নস্যাৎ করে দিতে চাইলে ইউরােপে এক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় । আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিতে ইউরােপীয় জাতিগােষ্ঠী সােচ্চার হয়ে ওঠে । আলসাস – লােরেন নিয়ে ফরাসিরা ; ট্রেনটিনাে , ট্রিয়েস্ট নিয়ে ইতালীয়রা ; শ্লেজউইগ নিয়ে ডেনরা ; ইংল্যান্ডের বন্ধন মুক্তির জন্য আয়ারল্যান্ডবাসীরা ; সর্বোপরি বলকান জাতীয়তাবাদ ও সর্বস্লাভ আন্দোলন — ইউরােপকে অগ্নিগর্ভ করে তুলেছিল । এইভাবে ইউরােপের আহত ও অতৃপ্ত জাতীয়তাবাদ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে । ঐতিহাসিক ল্যাংসামের মতে — অসম্পূর্ণ ইতালির যুদ্ধ ছিল বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ । 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সংবাদপত্রের ভূমিকা :

প্রথম মহাযুদ্ধ সংঘটনের পেছনে সংবাদপত্রের ভূমিকাও কম ছিল না । এই সময় এক শ্রেণির সংবাদপত্র বিকৃত , দায়িত্বজ্ঞানহীন , মুখরােচক ও মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন করে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ও বাইরে । যুদ্ধের উন্মাদনা সৃষ্টি করতে থাকে । সেরাজেভাে হত্যাকাণ্ডের পর অস্ট্রিয়া – সার্বিয়ার সংবাদপত্রগুলির ভূমিকা এক্ষেত্রে উল্লেখযােগ্য ।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়ামের ভূমিকা :

কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়মের আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম কারণ বলে অনেকেই মনে করেন । সেরাজেভাে হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সার্বিয়া – অস্ট্রিয়ার স্থানীয় যুদ্ধ তাঁরই উসকানিতে মহাযুদ্ধের রূপ নেয় । তা ছাড়া আন্তর্জাতিক নিরস্ত্রীকরণের জন্য ব্রিটেনের আবেদন তিনি বার বার নাকচ করে দিয়ে ইউরােপে অস্ত্র প্রতিযােগিতাকেই বাড়িয়ে তুলেছিলেন । 

আন্তর্জাতিক সংকট :

উত্তর – পশ্চিম আফ্রিকার মরক্কোকে কেন্দ্র করে মরক্কো সংকট ও পরে আগাদির ঘটনা এবং বলকান সংকট আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে জটিলতার সৃষ্টি করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করে তুলেছিল । 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ কারণ 

সেরাজেভো হত্যাকাণ্ড :

অস্ট্রিয়ার সিংহাসনের উত্তরাধিকারী আর্চ ডিউক ফ্রান্সিস ফার্দিনান্দ , তাঁর স্ত্রী সােফিয়াকে নিয়ে বসনিয়ার রাজধানী সেরাজেভাে নগর পরিদর্শনকালে গুপ্ত বিপ্লবী সংস্থা ব্ল্যাক হ্যান্ড সােসাইটির সদস্য ন্যাভারিলাে প্রিন্সেপ ( Navrilo Princip ) – এর হাতে নিহত হন ( ১৯১৪ খ্রি. ২৮ জুন ) ।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত :

এই হত্যাকাণ্ডের জন্য সার্বিয়াকে দায়ী করে অস্ট্রিয়া ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কতকগুলি শর্তপূরণের দাবি জানিয়ে এক চরমপত্র পাঠায় । সার্বিয়া ওই পত্রের অনেক দাবি মেনে নিলেও তার সার্বভৌমত্ব ক্ষুন্ন হতে পারে এমন দাবিগুলি মানতে অস্বীকার করে এবং এ ব্যাপারে আলােচনার জন্য একটি আন্তর্জাতিক বৈঠক ডাকার প্রস্তাব দেয় । কিন্তু অস্ট্রিয়া তা অগ্রাহ্য করে এবং ২৮ জুলাই ( ১৯১৪ খ্রি. ) সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেড আক্রমণ করলে শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ । ঐতিহাসিক ডেভিড টমসনের  মতে — প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল যে এই যুদ্ধ ছিল অযাচিত ও অভাবিত এবং ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দ থেকে যেসব ঘটনা ঘটে তারই চূড়ান্ত পরিণতি ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ( ‘ The most important thing about the First World War is that it was unsought , unintended and product of a long sequence of events which began in 1871 ‘ )।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

x
error: Content is protected !!