ফিরোজ শাহ তুঘলকের শাসন সংস্কার নীতি

ফিরোজ শাহ তুঘলকের শাসন সংস্কার নীতি

অপুত্রক মহম্মদ তুঘলকের মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসেন তাঁর সম্পর্কিত ভ্রাতা ফিরােজ শাহ তুঘলক ( ১৩৫১ – ৮৮ খ্রি. ) । ফিরােজ সিংহাসনে বসার জন্য আমির , মালিক ও উলেমাদের সমর্থন পেয়েছিলেন । তাই সিংহাসনে বসে তিনি এই প্রভাবশালী গােষ্ঠীকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করেন ।

ফিরোজ শাহ তুঘলক

ফিরোজ শাহ তুঘলকের অভ্যন্তরীণ নীতি

ফিরােজ ছিলেন ধর্মপ্রাণ ও প্রজাদরদি শাসক । মুসলমান সম্প্রদায়কে তুষ্ট করার জন্য তিনি একাধিক ব্যবস্থা নেন ।
( i ) মুসলমান অভিজাতদের সমস্ত বকেয়া কর তিনি মকুব করে দেন ।
( ii ) সামরিক বা অসামরিক কোনাে মুসলমানের মৃত্যুর পর তার পুত্র বা আত্মীয় বা ক্রীতদাসকে উক্ত পদে নিয়ােগ করার নীতি চালু করেন ।
( iii ) সেনাদের নগদ বেতনের পরিবর্তে জায়গির দেওয়ার ব্যবস্থা করেন ।
( iv ) প্রচলিত চব্বিশ রকমের কর তুলে দিয়ে কোরান – নির্দেশিত চার ধরনের কর বহাল রাখেন । সেগুলি হল – খারাজ ( উৎপন্ন ফসলের এক – দশমাংশ ) , জাকৎ ( দান ) , খামস ( খনিজ দ্রব্য বা লুণ্ঠিত দ্রব্যের একাংশ ) এবং জিজিয়া ( অ – মুসলমানদের ওপর আরােপিত কর ) ।

ফিরোজ শাহ তুঘলকের কৃষি , শিল্প ও বাণিজ্য সংস্কার

( i ) কৃষিকাজের উন্নতির ওপর ফিরােজ জোর দেন । জল সেচের সুব্যবস্থা করার জন্য তিনি চারটি সুদীর্ঘ খাল খনন করেন । অনেক পুরােনাে খালের সংস্কার করেন । নতুন খালের মধ্যে শতদ্রু নদ থেকে ২০০ কিলােমিটার লম্বা খালটি এবং যমুনার খালটি উল্লেখযােগ্য ।
( ii ) শতাধিক কূপ ও পুষ্করিণী খনন করে তিনি জল সরবরাহ সুনিশ্চিত করেন ।
( iii ) ব্যাবসা বাণিজ্যের উন্নতির জন্যও তিনি একাধিক ব্যবস্থা নেন । অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে ফিরােজ আন্তঃপ্রাদেশিক বাণিজ্য শুল্ক তুলে দেন । ফলে বাণিজ্যে অবাধ চলাচল ঘটে এবং বাণিজ্য বৃদ্ধি পায় ।
( iv ) ফিরােজ অনেকগুলি কারখানা তৈরি করেন । সেগুলি সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযােগ বৃদ্ধি করে । এই ধরনের কারখানার মধ্যে প্রধান ছিল — ফরাসখানা ( ফরাস বা কার্পেট তৈরির ) , জামদারখানা ( শীতবস্ত্র তৈরির ) , আলমখানা ( রাজকীয় প্রতীক তৈরির ) ইত্যাদি ।

ফিরোজ শাহ তুঘলকের জনহিতকর কাজ

( i ) ফিরােজ শাহ বহু জনহিতকর কাজ করেন । তিনি কৃষকদের জন্য তাকাবি ঋণদানের নিয়ম চালু করেন ।
( ii ) সাধারণ মানুষের চিকিৎসার জন্য দিল্লিতে দার – উল সাফা নামে একটি দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করেন ।
( iii ) বেকার যুবকদের একটি তালিকা প্রস্তুত করেন । বেকারদের জন্য কর্ম নিয়ােগ কেন্দ্র স্থাপন করেন ।
( iv ) দরিদ্র মুসলমান রমণীদের বিবাহ এবং অনাথ ও বিধবাদের ভরণ পােষণের জন্য অর্থ সাহায্যের ব্যবস্থা করেন । এজন্য দেওয়ান ই  খয়রাত নামে একটি দপ্তর প্রতিষ্ঠা করেন । তিনি বহু সুন্দর সুন্দর প্রাসাদ , নগরী ও বাগিচা নির্মাণ করেন ।

শিক্ষা – সংস্কৃতি

শিক্ষার ক্ষেত্রেও ফিরােজ ছিলেন স্মরণীয় । তিনি বহু মক্তব ও মাদ্রাসা নির্মাণ করেন এবং সমরখন্দ থেকে মৌলবি আনান । হিন্দু বিদ্বেষী হলেও তিনি বহুদূর থেকে অশােকের দুটি স্তম্ভ এনে সংরক্ষণ করেন । তিনি নগরকোট থেকে নিয়ে আসা ৩০০ টি সংস্কৃত পুঁথি ফারসিতে অনুবাদ করান । বরণীআফিকের ইতিহাস – গ্রন্থ তাঁর আমলেই রচিত হয় । তিনি একটি আত্মজীবনী রচনা করেন ।

মূল্যায়ন

প্রজাদরদি ও কল্যাণমূলক সংস্কার কাজের জন্য জিয়াউদ্দিন বরণী ফিরােজ তুঘলককে একজন আদর্শ মুসলমান শাসক বলে প্রশংসা করেছেন । এলফিনস্টোন প্রমুখ কেউ কেউ তাঁকে ‘ সুলতানি যুগের আকবর ’ নামে আখ্যায়িত করেছেন । ফিরােজের কোনাে কোনাে কাজ নিশ্চয়ই প্রশংসার দাবি রাখে । সেচ খাল খনন , কর মকুব , দান – খয়রাত ইত্যাদি তাঁর দয়া প্রবণতা ও রাষ্ট্র কল্যাণ আদর্শের পরিচায়ক । কিন্তু তাঁর কাজের ত্রুটিও ছিল অনেক । তিনি উলেমাদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করে রাষ্ট্রের ধর্ম নিরপেক্ষতা ক্ষুন্ন করেন । তাঁর জনহিতকর কাজগুলি সাম্রাজ্যের সকল সম্প্রদায়ের জন্য উন্মুক্ত ছিল না । আকবর যেভাবে হিন্দু , মুসলমান ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের প্রতি সমদর্শী নীতি নেন , ফিরােজ তার থেকে দূরে ছিলেন । আকবরের মতাে কোনাে প্রগতিশীল , মৌলিক জাতীয় নীতি গ্রহণে ফিরােজ অপারগ ছিলেন । আকবরের যেরূপ সাংগঠনিক প্রতিভা ছিল , ফিরােজের মধ্যে তার কিছুই ছিল না । আকবর যেভাবে তার সামরিক দক্ষতায় এক সর্বভারতীয় সাম্রাজ্য স্থাপন করেন ফিরােজ তার ধারে কাছে আসতে পারেননি । স্বভাবতই তাঁকে সম্রাট আকবরের সমতুল্য বলা চলে না । ঐতিহাসিক ভিনসেন্ট স্মিথও আকবরের সঙ্গে ফিরােজের তুলনা অবাস্তব বলেছেন ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!