ভারতে বৈপ্লবিক আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণ

ভারতে বৈপ্লবিক আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণ

ভারতের বিপ্লবীদের ত্যাগ , নিষ্ঠা , আদর্শ , সততা , সংগ্রামী মানসিকতা কোনাে কিছুতেই খামতি না থাকলেও তারা সফলতার বিচারে ব্যর্থ হয়েছিলেন । ভারতের মধ্যে থেকে বা ভারতের বাইরে গিয়ে বিপ্লবীরা এদেশ থেকে ব্রিটিশের উচ্ছেদের জন্য যে প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছে তা ছিল অসাধারণ । মার্কসবাদীদের মতে গণসংযােগ ও গণবিপ্লবের প্রচেষ্টা না করে বিচ্ছিন্নভাবে সন্ত্রাসের চেষ্টা ছিল বিপ্লবীদের কৌশলগত ভুল নীতি ।

internet 36
ভারতে বৈপ্লবিক আন্দোলন

বৈপ্লবিক আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণ

বৈপ্লবিক আন্দোলন যেসব কারণে ব্যর্থ হয়েছিল তার মধ্যে অন্যতম ছিল —

সাংগঠনিক দুর্বলতা :

বিপ্লবীদের গুপ্ত সমিতি বা সংস্থাগুলির সংগঠন ছিল অত্যন্ত দুর্বল । এ প্রসঙ্গে অনুশীলন  সমিতি , যুগান্তর দল , সাধনা সমিতি , সুহৃদ সমিতি , ব্ৰতী সমিতির কথা বলা যায় । এই দুর্বলতা ঢাকতে গিয়ে তারা অনেক সময় বিদেশি শক্তির সাহায্য নেওয়ার চেষ্টা করে । কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের সে প্রচেষ্টা সফল হয়নি ।

বিশ্বাসঘাতকদের ভূমিকা :

ভারতে বিপ্লবী আন্দোলনের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ ছিল নরেন গোঁসাই , কৃপাল সিং – সহ অজস্র বিশ্বাসঘাতকদের মিরজাফরীয় ভূমিকা । এই সকল বিশ্বাসঘাতকরা গােপন সংবাদ ও তথ্য জানিয়ে ইংরেজ গােয়েন্দা ও পুলিশদের কাজকে অনেক সহজ করে দিয়েছিল । যার ফলে বিপ্লবীদের একাধিক কর্মসূচির পরিকল্পনা ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ জানতে পেরে তা ব্যর্থ করার জন্য উপযুক্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারত ।

ব্রিটিশের নিষ্ঠুর দমন নীতি :

ব্রিটিশের নিষ্ঠুর দমন নীতির জন্য বিপ্লবীদের অধিকাংশ প্রচেষ্টাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় । অস্ত্র আইন ( ১৮৭৮ খ্রি. ) , নাট্যাভিনয় আইন ( ১৮৭৬ খ্রি. ) , দেশীয় ভাষার সংবাদপত্র আইন ( ১৮৭৮ খ্রি. ) , কার্লাইল সার্কুলার ( ১৯০৫ খ্রি. ) ইত্যাদি দমন মূলক আইনগুলি ভারতবাসীর বিপ্লবী কর্মকাণ্ডকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে ।

মতভেদ ও অন্তর্দ্বন্দ্ব :

বিভিন্ন বিপ্লবী দলগুলির মূল লক্ষ্য এক থাকলেও কার্যপদ্ধতিগত মতভেদ ছিল । প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই বিপ্লবী আন্দোলনে ঐক্য ও সংহতির অভাব লক্ষ করা যায় । প্রমথনাথ মিত্র ( অনুশীলন সমিতি ) , ড. যাদুগােপাল মুখােপাধ্যায় বিপ্লবী আন্দোলনকে গণমুখী করার চেষ্টা করলেও বারীন্দ্রনাথ ঘােষ , ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত ( যুগান্তর দল ) , পুলিনবিহারী দাস ( ঢাকা অনুশীলন সমিতি ) প্রমুখ গুপ্তহত্যা ও সন্ত্রাসের পথে বিপ্লব পরিচালনা করেন ।

আঞ্চলিক সীমাবদ্ধতা :

বিক্ষিপ্তভাবে ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় সংঘটিত হওয়ায় বৈপ্লবিক আন্দোলন সফলতা পায়নি । মূলত বাংলা , পাঞ্জাব , মহারাষ্ট্রে সম্পূর্ণরূপে এবং বিহার , মাদ্রাজ , ওড়িশা , উত্তরপ্রদেশে আংশিকরূপে বিপ্লবী প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায় । বিপ্লবী আন্দোলন কখনােই সর্বভারতীয় ও সর্বাত্মক রূপ পায়নি ।

হিন্দুত্বের প্রাধান্য :

ধর্ম বর্ণ শ্রেণি নির্বিশেষে সমাজের সকল স্তর থেকেই বিপ্লবীরা আসেননি । বিপ্লবীদের শতকরা নব্বই ভাগ হিন্দুসমাজের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন । হিন্দু বিপ্লবী নেতাদের দ্বারা বিপ্লবী আন্দোলন পরিচালিত হওয়ায়  মুসলিমদের গরিষ্ঠ অংশ বিপ্লবী আন্দোলন থেকে দূরে থাকে ।

গণভিত্তির অভাব :

বিপ্লবী আন্দোলনের মুল অংশই চিল উচ্চবিত্ত ছোট ভূস্বামী শিক্ষক , কেরানি , ব্যবসায়ী , সাংবাদিক , ডাক্তার এদের সমন্বয়ে গঠিত । এর পাশাপাশি প্রচুর তরুণ ছাত্র এই বিপ্লবী কার্যকলাপে শামিল হয় । কিন্তু কৃষক ও শ্রমিকশ্রেণিকে নিয়ে গঠিত সমাজের গরিষ্ঠ অংশ বিপ্লবী আন্দোলন থেকে দুরে সরে থাকায় গণভিত্তির অভাব দেখা দেয় , যার জন্য বৈপ্লবিক আন্দোলন ব্যর্থ হয় ।

মন্তব্য

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ব্রিটিশ ভারত রক্ষা আইন প্রবর্তনের মাধ্যমে বাংলা সহ সারাদেশে স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা কায়েম করে । মহাত্মা গান্ধির নেতৃত্বে অহিংস সত্যাগ্রহী আন্দোলন জনপ্রিয় ও গণমুখী হয়ে উঠলে বিপ্লবী  আন্দোলনের রেশ অনেকটাই কমে যায় । এ ছাড়াও বারবার লক্ষ্যে পৌঁছােনাের ব্যর্থতা থেকে বিপ্লবীরা নিজেদের ক্রিয়াকর্মের কার্যকারিতা সম্পর্কে নিজেরাই সন্দিহান হয়ে পড়লে বৈপ্লবিক আন্দোলন শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয় ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!