সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদ আন্দোলনে বালগঙ্গাধর তিলকের ভূমিকা

সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদ আন্দোলনে বালগঙ্গাধর তিলকের ভূমিকা

ভারতের চরমপন্থী আন্দোলনের পথ প্রদর্শক ছিলেন বালগঙ্গাধর তিলক । ভারতবর্ষের সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদের প্রসারের জন্য তিলক আজীবন প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন । জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতারূপে তিলকই প্রথম বলেন — স্বরাজ আমার জন্মগত অধিকার , আমি তা অর্জন করবই ( ‘ Swaraj is my birth right , and I will have it ‘ ) ।

Pix 115201716281750 1
বালগঙ্গাধর তিলক


বালগঙ্গাধর তিলকের রাজনৈতিক মতাদর্শ

জাতীয় কংগ্রেসের আবেদন নিবেদন নীতির তীব্র সমালােচক ছিলেন তিনি । ভারতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবনের আহ্বান জানিয়ে রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের জন্য তিনি ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করেন ; ঘােষণা করেন তাঁর একমাত্র লক্ষ্য — স্বরাজ অর্জন । তিলকের রাজনৈতিক মতাদর্শের মূল ভিত্তি ছিল গণশক্তি । তিনি ভারতবাসীকে চরমপন্থী জাতীয়তাবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ব্রিটিশ বিরােধী সংগ্রামে যােগ দেওয়ার আহ্বান জানান । তিলক মনে করতেন রাজনীতি শুধুমাত্র কিছু উচ্চ শিক্ষিত মানুষের বৈঠকখানার আড্ডা নয় । তিনি রাজনীতিকে জনগণের নীতিরূপে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন । জাতীয় কংগ্রেসের প্রথমযুগে নরমপন্থী নেতৃবৃন্দের রাজনৈতিক ভিক্ষা বৃত্তির কড়া সমালােচক ছিলেন তিনি । তিলকের রাজনৈতিক আদর্শের একটিই মন্ত্র ছিল , তা হল পূর্ণ স্বাধীনতা ।

বালগঙ্গাধর তিলকের প্রথম জীবন

মহারাষ্ট্রের পুনায় রত্নগিরিতে এক চিতপাবন ব্রাহ্মণ বংশে ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে বালগঙ্গাধর তিলক জন্মগ্রহণ করেন । তিলকের পিতা গঙ্গাধর রামচন্দ্র তিলক ছিলেন সংস্কৃত শিক্ষক । পিতার কাছ থেকে তিনি প্রথম জাতীয়তাবাদী ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হন । আইন পরীক্ষায় পাস করেও তিনি ওকালতিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেননি । তিনি কিছুদিন পুনা ফার্গুসন কলেজে গণিত ও সংস্কৃত সাহিত্যে অধ্যাপনা করেন । কিন্তু খুব বেশিদিন নিজেকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেননি । তিনি রােম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হওয়ার পর দেশসেবায় ব্রতী হন । স্নাতক হওয়ার পরেই তিনি প্রথম জীবনে পুনা নিউ ইংলিশ স্কুল ( ১৮৮০ খ্রি. ) , ডেকান এডুকেশন সােসাইটি ( ১৮৮৪ খ্রি. ) , ফার্গুসন কলেজ ( ১৮৮৫ খ্রি. ) প্রতিষ্ঠা করেন ।

বালগঙ্গাধর তিলকের জাতীয় চেতনা জাগরণের প্রয়াস

পত্রিকা সম্পাদক হিসেবে তিলক তার ক্ষুরধার লেখনীর সাহায্যে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত মারাঠা ( ১৮৯৫ খ্রি. ) ও মারাঠি ভাষায় প্রকাশিত কেশরি ( ১৮৯৪ খ্রি. ) নামে দুটি সাপ্তাহিক পত্রিকার মাধ্যমে শিক্ষিত মারাঠি যুবকদের মধ্যে বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে দেন ।

গণপতি ও শিবাজি উৎসবের দ্বারা

অলিম্পিয়া ও পাইথিয়ান উৎসব যেমন গ্রিস ও রােমের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ঐক্য সাধন করেছিল , তেমন ভাবেই তিলক গণপতি ও শিবাজি উৎসবের দ্বারা ভারতের জনগণের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন । সাধারণ মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবাদের আদর্শ প্রচারের জন্য প্রচলিত গণপতি পূজাকে তিনি মহারাষ্ট্রের সর্বত্র গণপতি উৎসবে পরিণত করেন ( ১৮৯৩ খ্রি. ) । সেই সঙ্গে দেশবাসীর মনে স্বদেশপ্রেম , আত্মত্যাগ ও ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লবের আদর্শ প্রচারের জন্য ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে শিবাজি উৎসব – এর আয়ােজন করেন । ক্রমে এটিও মহারাষ্ট্রের জাতীয় উৎসবে পরিণত হয় ।

দুর্ভিক্ষে তিলকের ভূমিকা

১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে মহারাষ্ট্রে এক ব্যাপক দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় । সরকারি তরফে দুর্ভিক্ষ পীড়িতদের প্রতি কোনােরকম সাহায্য করা তাে দূরের কথা , উলটে সরকার দুর্ভিক্ষের সময়ে মজুতদারি ও কালােবাজারিতে সাহায্য করে । তিলক ব্রিটিশের কাছে দুর্ভিক্ষ নিবারণ আইন অনুযায়ী সাহায্যের আবেদন জানান । কিন্তু সরকারি তরফে কোনাে সাহায্য না মেলায় তিনি মহারাষ্ট্রবাসীদের খাজনা বয়কটের ডাক দেন । তিনি বলেন — মৃত্যুর মুখােমুখি দাঁড়িয়েও কি আপনারা সাহসী হবেন না ।

বালগঙ্গাধর তিলক বিপ্লব বাদের জনক

তিলক ছিলেন ভারতীয় বিপ্লববাদের জনক । তিনিই প্রথম ভারতবাসীর উদ্দেশে ব্রিটিশ বিরােধী প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ডাক দেন । তিনি চেয়েছিলেন জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনার প্রকাশ ঘটিয়ে জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম পরিচালিত করতে । তিলকের মতে জাতীয়তাবাদ বলতে শুধুমাত্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তিকেই বােঝাত না , তাঁর কাছে জাতীয়তাবাদ ছিল ভারতবাসীর আত্মার সম্পূর্ণ প্রকাশ । ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে বয়কট , স্বদেশি আন্দোলনজাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাকে সমর্থন করে ‘ কেশরি ’ ও ‘ মারাঠা ’ – য় একাধিক প্রবন্ধ রচনার মাধ্যমে তিনি জনগণকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে উৎসাহিত করতে থাকেন । তিনি ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে এমনই গতিশীল , গণমুখী ও উগ্র করে তুলেছিলেন যে , ভ্যালেন্টাইন চিরল নামে এক ইংরেজ সাংবাদিক তাঁকে ভারতীয় বিক্ষোভের জনক ( The father of Indian unrest ) বলে অভিহিত করেছেন । ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে মজঃফরপুরে কিংসফোর্ডকে হত্যার উদ্দেশ্যে ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকীর বােমা নিক্ষেপের ঘটনাকে সমর্থন করে প্রবন্ধ প্রকাশ করলে রাজদ্রোহিতার অভিযােগে তাকে দীর্ঘ ৬ বছরের জন্য মান্দালয়ের জেলে নির্বাসনদণ্ড দেওয়া হয় ১৯০৮ খ্রি. ) ।

বালগঙ্গাধর তিলকের হোমরুল আন্দোলনের নেতৃত্ব

মান্দালয় থেকে ফিরে তিলক হােমরুল আন্দোলন গড়ে তােলেন । তিলক বােম্বাইয়ের প্রাদেশিক সভায় হােমরুল লিগ গঠন করেন ( ১৯১৬ খ্রি. এপ্রিল ) । তিনি কংগ্রেসের নরমপন্থী নেতাদের ওপর বিরক্ত হয়ে হােমরুল লিগ গঠন করেছিলেন ; তিনি চেয়েছিলেন পূর্ণ স্বরাজ অর্জন করতে । তিলক ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কাছে দাবি জানিয়ে বলেন — ভারতবাসী স্বরাজ চাইছে , ব্রিটিশ দীর্ঘদিন ধরে এই দাবি আটকে রাখতে পারবে না । তিলকের একক প্রচেষ্টায় ভারতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন মহিরুহের আকার ধারণ করে ।

বালগঙ্গাধর তিলক লোকমান্য উপাধি প্রাপ্তি

তিলক শিবাজীর আদর্শে মারাঠিদের স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে তােলার চেষ্টা করেন । পুনায় প্লেগ প্রতিরােধের অজুহাতে ব্রিটিশ সেনারা জনগণের ওপর অত্যাচার চালালে তিলক তার তীব্র বিরােধিতা করেন । তার ১৮ মাস সশ্রম কারাদণ্ড হয় । জেল থেকে ছাড়া পেলে তিনি পুনরায় চরমপন্থী মতবাদের প্রচার শুরু করেন । ব্রিটিশ তাঁর বিরুদ্ধে রাজদ্রোহিতার অজুহাত এনে ৬ বছরের জন্য তাঁকে মান্দালয় জেলে নির্বাসিত করে ( ১৯০৮ খ্রি. ) । দেশের জন্য তাঁর আত্মত্যাগে মুগ্ধ হয়ে দেশবাসী তিলককে লােকমান্য উপাধিতে ভূষিত করে । আর. সি. মজুমদারের  মতে — He earned the epithet ‘ Lokamanya ‘ and was almost worshipped as a God ।

মূল্যায়ন

একজন নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিক , নির্ভীক স্বাধীনতা সৈনিক ও অনন্য সাধারণ তেজস্বী পুরুষ হিসেবে তিলক ভারতের ইতিহাসে স্বতন্ত্র স্থানের অধিকারী । জাতীয় আন্দোলনের পাশাপাশি মারাঠা জাতির মধ্যেও সংগ্রামী মানসিকতার বীজ বপন করেছিলেন তিলক । নিঃস্বার্থ দেশপ্রেম , অদম্য সাহস ও আত্ম বলিদানের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের যে দৃঢ় সংকল্প তিলক দেখিয়েছেন তার ফলেই জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের ক্ষেত্রে আগামী প্রজন্ম নতুন পথের সন্ধান পায় । তার মৃত্যু ছিল ভারতের কাছে অপূরণীয় ক্ষতি । তাই তিলকের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে গান্ধিজি বলেছিলেন — আমার সবচেয়ে বড়াে ভরসাস্থল চলে গেল ( ‘ My strongest bulwark is gone ‘ ) ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!