ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশে সংবাদপত্রের ভূমিকা

Contents

ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশে সংবাদপত্রের ভূমিকা

সাহিত্য হল সমাজের দর্পণ , আর সংবাদপত্র হল জনমত গঠনের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম । ব্রিটিশ শাসনকালে দেশীয় ভাষায় প্রকাশিত সাহিত্য ও সংবাদপত্রগুলি ব্রিটিশ বিরােধী সমালােচকের ভূমিকা পালন করে জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ ঘটিয়েছিল । সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা , যথা — কাব্য , নাটক , উপন্যাস , গল্প , প্রবন্ধ সবকিছুতেই ব্রিটিশের নাগপাশ ছিন্ন করে জাতীয় জাগরণের লক্ষ্যে দেশাত্মবােধের পরিচয় মেলে । বিভিন্ন দেশীয় ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলিতে সরকারি নীতি , ব্যর্থতা ও ব্রিটিশের শােষণমূলক নীতির উল্লেখ করে জাতীয় জাগরণের প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায় । তাই ঐতিহাসিক এ. আর. দেশাই  বলেছেন — “ ভারতীয় জাতীয়তাবাদের গঠন ও বিকাশে সংবাদপত্র ছিল গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ।”

images 30
সংবাদপত্রের ভূমিকা

বাংলা ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্র

সিপাহি বিদ্রোহের পর থেকে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় । এর মধ্যে উল্লেখযােগ্য যেসব বাংলা সংবাদপত্র জাতীয়তাবাদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল তার মধ্যে অন্যতম কয়েকটি ছিল — দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণের ‘ সােমপ্রকাশ ’ ( ১৮৫৮ খ্রি. ) , ভূদেব মুখােপাধ্যায়ের ‘ শিক্ষাদর্পণ ’ ( ১৮৬৪ খ্রি . ) , শিশির কুমার ঘােষের ‘ অমৃতবাজার পত্রিকা ’ ( ১৮৬৮ খ্রি. ) , বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘ বঙ্গদর্শন ’ ( ১৮৭৩ খ্রি. ) , অক্ষয়চন্দ্র সরকারের ‘ সাধারণী ’ ( ১৮৭৩ খ্রি. ) , কেশবচন্দ্র সেনেরসুলভ সমাচার ’ ( ১৮৭০ খ্রি. ) ইত্যাদি ।

ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্র

ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলি ব্রিটিশের বিভিন্ন কাজের কঠোর সমালােচক ছিল । হরিশচন্দ্র মুখােপাধ্যায়ের ‘ হিন্দু পেট্রিয়ট ’ ( ১৮৫৩ খ্রি. ) , কিশােরীচাঁদ মিত্রের ‘ ইন্ডিয়ান ফিল্ড ’ ( ১৮৫৯ খ্রি. ) , কেশবচন্দ্র সেনের সম্পাদনায় ‘ ইন্ডিয়ান মিরর ’ , সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘ দি বেঙ্গলি ’ , রামানন্দ চ্যাটার্জীর ‘ মডার্ন রিভিউ ‘ , পৃথ্বীশচন্দ্র রায়ের ‘ ইন্ডিয়ান ওয়ার্ল্ড ’ , সতীশচন্দ্র মুখার্জীর ‘ ডন ’ প্রভৃতি পত্রিকা ব্রিটিশ বিরােধিতায় সরব হয় ।

মুসলিম সাময়িকপত্র

হােসেন মুজিবর রহমান সম্পাদিত ‘ দ্য মুসলমানস ’ , মীর মােশারফ সম্পাদিত ‘ আজিবুল নেহার ’ , মহম্মদ রেয়াজউদ্দিন সম্পাদিত ‘ ইসলাম প্রচার ’ প্রভৃতি বঙ্গভঙ্গের বিরােধিতায় হিন্দুদের সঙ্গে গলা মিলিয়েছিল ।

সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ আইন

দেশীয় ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলির টুঁটি টিপে ধরে ভারতবাসীর কণ্ঠরােধ করার জন্য লর্ড লিটন জারি করেন দেশীয় ভাষায় সংবাদপত্র আইন বা ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট ( ১৮৭৮ খ্রি. ১৪ মার্চ ) । এই আইনের বিভিন্ন ধারায় বলা হয় –

1. সংবাদপত্রের সম্পাদক ও মুদ্রাকর এমন কিছু সংবাদ ছাপবেন না যাতে পাঠক সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ করে ;
2. সংবাদপত্রে এমন কিছু ছাপা যাবে না যে সংবাদগুলি ব্রিটিশ ও ভারতবাসীর মধ্যে জাতিগত বিদ্বেষকে আরও বাড়িয়ে তুলবে ;
3. সংবাদপত্রের সম্পাদক ও মুদ্রাকরকে উপরােক্ত দুটি নিয়ম মেনে সংবাদ ছাপবেন এই লক্ষ্যে জামিন ও অঙ্গীকারপত্রে স্বাক্ষর করতে হবে ।
4. কোনাে দেশীয় সংবাদপত্র এইসব নিয়মগুলি অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট সংবাদপত্রের অর্থ এবং প্রয়ােজনে মুদ্রাযন্ত্র সরকার বাজেয়াপ্ত করতে পারবে ।

উপসংহার

ব্রিটিশের নির্লজ্জ ঔপনিবেশিক শােষণ ও শাসনে অতিষ্ঠ হয়ে দেশবাসী ব্রিটিশবিরােধী হয়ে ওঠে । দেশীয় ভাষায় প্রকাশিত সাহিত্য , সংবাদপত্রগুলি এই ব্রিটিশবিরােধী মনােভাবকে আরও তীব্র করে তােলে । তাই বড়োলাট লর্ড ডাফরিন বলেছিলেন “ ভারতীয় সংবাদপত্রগুলি পাঠ করলে মনে হয় যে ইংরেজরা যেন মানবজাতির শত্রু — বিশেষ করে ভারতীয়দের । ”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!