স্বামী বিবেকানন্দের অবদান আলোচনা করো

স্বামী বিবেকানন্দের অবদান আলোচনা করো

ঊনবিংশ শতাব্দীর ভারতের সমাজব্যবস্থা ছিল অন্ধবিশ্বাস ও ধর্মীয় কুসংস্কারে আচ্ছন্ন । জাতপাত , বর্ণ , ধর্মের বেড়াজালে আবদ্ধ ছিল এদেশের সমাজ । যে গুটিকয়েক সমাজ সংস্কারকের প্রচেষ্টায় ভারতীয় সমাজ ধীরে ধীরে আধুনিক হয়ে উঠেছিল তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন স্বামী বিবেকানন্দ

image 1
স্বামী বিবেকানন্দ


স্বামী বিবেকানন্দের সমাজ ভাবনা

স্বামীজি অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার ত্যাগ করে সকলকে যুক্তিবাদী হয়ে ওঠার কথা বলেন । স্বামীজির স্বপ্ন ছিল সমাজে সকলশ্রেণিই একদিন একসূত্রে আবদ্ধ হবে । সমাজের দরিদ্র , অনুন্নত বা পিছিয়ে পড়া মানুষদের সামনের সারিতে নিয়ে আসার প্রয়ােজন রয়েছে বলে তিনি মনে করতেন ।

স্বামী বিবেকানন্দের জাতিভেদ প্রথার বিরােধিতা

স্বামীজি জাতিভেদ প্রথার তীব্র নিন্দা করেন । তিনি ভারতবাসীকে জাতিভেদ প্রথা ত্যাগ করে ঐক্যবদ্ধ হয়ে উন্নতির জন্য উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেন । তিনি বলেন ভারতে ভবিষ্যতে আসবে শুদ্রের যুগ । শূদ্র – বিপ্লবের মধ্য দিয়ে এক নতুন ভারত জন্ম নেবে । স্বামীজি  বলেন “ নতুন ভারত বেরুক লাঙ্গল ধরে , চাষার কুটির ভেদ করে , জেলেমাল্লামুচি মেথরের ঝুপড়ির মধ্য হতে , বেরুক মুদির দোকান থেকে , ভুনাওয়ালার উনুনের পাশ থেকে , বেরুক কারখানা থেকে , হাট থেকে , বাজার থেকে , বেরুক ঝােপজঙ্গল , পাহাড় পর্বত থেকে ” ।

দরিদ্র ভারতবাসীর সেবা

বিবেকানন্দ বলেছেন যথার্থ দেশসেবক হতে হলে দেশবাসীকে মনেপ্রাণে , ভালােবাসতে হবে । আর এক্ষেত্রে সবার আগে দরিদ্র ভারতবাসীর সেবা করতে হবে । কারণ ধূলিধূসরিত , ক্ষুধার্ত দেশবাসীর মুক্তি ছাড়া ভারতের উন্নতির সম্ভাবনা নেই । তাই দেশবাসীর প্রতি তিনি আহ্বান জানিয়ে বলেন “ সদর্পে বলআমি ভারতবাসী , ভারতবাসী আমার ভাই , বলমূর্খ ভারতবাসী , দরিদ্র ভারতবাসী , ব্রাহ্মণ ভারতবাসী , চণ্ডাল ভারতবাসী আমার ভাই । ”

নারী মুক্তির সমর্থক

বিবেকানন্দ সমাজে নারীদের মর্যাদাবৃদ্ধির জন্য নারীমুক্তির গুরুত্ব অনুভব করেছিলেন । তিনি স্ত্রীশিক্ষার প্রসারকে সমর্থন করেন , কারণ তিনি মনে করেন মেয়েদের মধ্যে শিক্ষার আলাে ছড়িয়ে পড়লে তারা ভালােমন্দ বুঝতে শিখবে । তিনি বাল্যবিবাহেরও বিরােধী ছিলেন । তিনি কখনােই মনে করতেন না যে পাশ্চাত্য নারীরাই হল ভারতীয় নারীদের কাছে আদর্শ স্বরূপ । আমেরিকায় থাকাকালীন এক ভাষণে তিনি বলেছিলেন — “ ভারতীয় বিধবারা যথেষ্ট কর্তৃত্বশালী ও মর্যাদার অধিকারী ” ।

সামাজিক সাম্যের প্রচারক

স্বামীজি বলেন একচেটিয়া অধিকারের দিন শেষ হয়েছে । সকলের জন্য সমান ভােগ ও সমান অধিকারের ব্যবস্থা করতে হবে । অনুন্নতদের উন্নত করে সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে । তিনি আরও বলেন শিক্ষিত ব্যক্তিরা শিক্ষা দিয়ে ও ধনী ব্যক্তিরা ধন দিয়ে সেবা করলে সমাজের মঙ্গল হবে । স্বামীজি অনুন্নত শ্রেণির প্রতি বলেন কেবল উচ্চ শ্রেণির লােকেদের দোষ দিলে চলবে না । উন্নতির জন্য নিজেদেরও চেষ্টা করে যেতে হবে ।

সাধারণের সুখ – দুঃখের শরিক

স্বামীজি আসমুদ্র হিমালয় পরিভ্রমণ করে সাধারণ ভারতবাসীর সুখ দুঃখের শরিক হয়েছিলেন । ভারত পরিভ্রমণকালে তিনি ভারতীয় সমাজের দোষ , ত্রুটি , অন্যায় , অবিচারগুলি প্রত্যক্ষ করেন । পরিভ্রমণকালে ভারতীয় সমাজে রক্ষণশীলতা , জাতিভেদের সংকীর্ণতা , দারিদ্র্য , শােষণ সবকিছুই তার চোখে পড়ে । সাধারণ দরিদ্র ভারতবাসীর দুঃখমােচনের জন্য তিনি স্বাবলম্বী হওয়ার কথা বলেন ।

যুব সমাজের অনুপ্রেরণা

স্বামীজি ছিলেন যুবসমাজের কাছে আদর্শ । তিনি যুবকদের লৌহকঠিন পেশি , ইস্পাতকঠিন চরিত্র ও বজ্ৰদীপ্ত মনের অধিকারী হয়ে ওঠার কথা বলেন । সকল সামাজিক সংকীর্ণতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার আহ্বান জানান যুবসমাজের প্রতি । তিনি যুবসমাজের উদ্দেশ্যে বলেন “ গীতা পাঠ অপেক্ষা ফুটবল খেলা ভালাে । ” যুবকদের উদ্দেশ্যে স্বামীজি আরও বলেন “ ওঠো , জাগাে , নিজের প্রাপ্য বুঝে নাও । ”

রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজসেবা

সমাজ কল্যাণের আদর্শকে বাস্তব রূপ দেওয়ার জন্য স্বামীজি প্রতিষ্ঠা করেন রামকৃষ্ণ মিশন ( ১৮৯৭ খ্রি. ১ মে ) । এই মিশনের বহু উদ্দেশ্যের মধ্যে অন্যতম হল জাতি , ধর্ম , বর্ণ , নির্বিশেষে দুঃস্থ মানুষদের সেবা করা । আজও নির্যাতিত , অবহেলিত , শােষিত মানুষের পাশে দাঁড়ানাে ও তাদের দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করার ব্রত পালন করে চলেছে রামকৃষ্ণ মিশন ।

মূল্যায়ন

স্বামীজি মনেপ্রাণে চেয়েছিলেন এক গোঁড়ামিমুক্ত , কুসংস্কারমুক্ত ও জাতপাতহীন সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠুক । এই সমাজের পরিচালিকা শক্তি হোক শূদ্র বা আধুনিক পরিভাষায় প্রলেতারিয়েতগণ । সমাজ সংস্কারকদের প্রতি তাঁর সাবধান বাণী ছিল “ সামাজিক ব্যাধির প্রতিকার বাহিরের চেষ্টা দ্বারা হইবে না , মনের উপর কার্য করিবার চেষ্টা করিতে হইবে । ”

1 thought on “স্বামী বিবেকানন্দের অবদান আলোচনা করো”

Leave a Comment

error: Content is protected !!