নবভারত গঠনে স্বামী বিবেকানন্দের অবদান

নবভারত গঠনে স্বামী বিবেকানন্দের অবদান

পরাধীন ভারতবর্ষে স্বদেশবাসীকে সর্বপ্রথম আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তােলার কাজে সফল হয়েছিলেন যিনি , মৃতপ্রায় একটি জাতির দেহে প্রাণ সঞ্চার করেছিলেন যিনি , তিনি হলেন শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণদেবের প্রিয়তম শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ । স্বামীজির জাতীয়তাবাদী আদর্শ , স্বদেশচেতনা ও দেশপ্রেমে উদবুদ্ধ হয়েছিল পরবর্তী প্রজন্ম । এই কর্মযােগী বীরের উদাত্ত আহ্বানে কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত আপামর ভারতবাসী তাদের হারিয়ে যাওয়া চেতনা ফিরে পেয়েছিল । অরবিন্দের  মতে — বিবেকানন্দই আমাদের জাতীয় জীবনের গঠন কর্তা ও প্রধান নেতা । নবভারতের অন্যতম রূপকার স্বামীজির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ  বলেছেন — ভারতবর্ষকে জানতে হলে বিবেকানন্দকে পড়তে ও জানতে হবে ( ‘ If you want to know India read Vivekananda ‘ ) ।

vivekananda web 1
স্বামীজি

স্বামীজির স্বপ্নের ভারত

স্বামীজি এমন এক ভারতের স্বপ্ন দেখতেন যেখানে থাকবে না ক্ষুধার জন্য আর্তনাদ , স্বার্থের জন্য শােষণ , লোভের জন্য নিপীড়ন , গরিমার জন্য অবহেলা । নবভারতের রূপকার স্বামীজি চেয়েছিলেন নতুন ভারত গড়ে উঠবে প্রকৃত মানুষদের নিয়ে । তিনি বলেন — “ নতুন ভারত বেরুক , বেরুক লাঙল ধরে , চাষার কুটির ভেদ করে , জেলে মাল্লা মুচি মেথরের ঝুপড়ির মধ্য হতে , বেরুক মুদির দোকান থেকে , ভুনাওয়ালার উনুনের পাশ থেকে , বেরুক কারখানা থেকে , হাট থেকে , বাজার থেকে , বেরুক জঙ্গল পাহাড় পর্বত থেকে । ” সতীশচন্দ্র বসুর  মতে — স্বামীজির স্বপ্ন ছিল জাগ্রত ভারত , সমুন্নত ভারত , একযােগে স্বাধীন ভারত ।

স্বদেশ ও দেশবাসীর মুক্তির সাধনা

স্বামীজির ভারত সাধনায় ছিল স্বদেশ ও স্বদেশবাসীর মুক্তি । ভারতবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে স্বামীজি বলেন , “ সদর্পে বল আমি ভারতবাসী , ভারতবাসী আমার ভাই । তিনি বলতেন — “ ভারতবাসী আমার ভাই , ভারতবাসী আমার প্রাণ , ভারতের দেবদেবী আমার ঈশ্বর , ভারতের সমাজ আমার শিশুশয্যা , আমার যৌবনের উপবন , আমার বার্ধক্যের বারাণসী । বলাে ভাই ভারতের মৃত্তিকা আমার স্বর্গ , ভারতের কল্যাণ আমার কল্যাণ । ”

আদর্শ যুবসমাজ গঠনে অনুপ্রেরণা

স্বামীজি ছিলেন যুবসমাজের আদর্শ । তিনি ভারতের স্বাধীনতা এবং নতুন ভারত গঠনের ক্ষেত্রে যুবশক্তির ওপরই ভরসা করতেন । তিনি যুবসমাজকে লৌহ কঠিন পেশি , ইস্পাত কঠিন চরিত্র ও বজ্রদীপ্ত মনের অধিকারী হওয়ার আহ্বান জানান , তাঁর বিশ্বাস ছিল একশত খাঁটি আদর্শবাদী যুবক মিলিত হলে ভারতের স্বাধীনতা অবশ্যম্ভাবী । তিনি চেয়েছিলেন , যুবসমাজ আগুন ছড়িয়ে দেবে হিমালয় থেকে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত । উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত ।

রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা 

স্বামী বিবেকানন্দ সমাজে প্রকৃত মানুষ তৈরির লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেন রামকৃষ্ণ মিশন ( ১৮৯৭ খ্রি. ৫ মে ) । এই মিশনের উদ্দেশ্য ধর্মীয় ঐক্য ও বৈদান্তিক আদর্শের বিশ্বব্যাপী প্রচার হলেও রামকৃষ্ণ মিশনের আসল লক্ষ্য হল মানবরূপী দেবতাদের সেবা করা । অর্থাৎ এই বিশ্বব্যাপী অবহেলিত , শােষিত , বঞ্চিত , নিপীড়িত , অত্যাচারিত , অসহায় ও নিঃস্ব মানুষগুলির পাশে দাঁড়ানাে এবং তাদেরকে দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্ত করা । রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠার দ্বারা স্বামীজি জীব সেবাকেই জীবনের পরম ব্রতরূপে গ্রহণ করেছিলেন । জীবে প্রেম করে যেই জন , সেই জন সেবিছে ঈশ্বর — এই ছিল তাঁর মন্ত্র ।

মূল্যায়ন

স্বামীজি দেবাত্মার মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন মানবাত্মাকে । তাই তাঁর আদর্শ ও যাবতীয় ধ্যানধারণা ঘিরে ছিল স্বদেশ ও স্বদেশবাসীর মুক্তি আর তার সঙ্গে বিশ্ব মানবাত্মার মােক্ষলাভ । আর. জি. প্রধানের  মতে — স্বামী বিবেকানন্দকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের জনক বলা যেতে পারে ( ‘ Swami Vivekananda might well be called the father of Indian nationalism ‘ ) । স্বামীজিকে স্মরণ করে আজও প্রতি বছর ১২ জানুয়ারি স্বামীজির জন্মদিনটি যুব দিবস রূপে পালিত হয় । বিবেকানন্দ নতুন ভারত গঠনের যে স্বপ্ন দেখিয়ে গেছেন তাকে অনুসরণ করে পরবর্তীকালে ভারতের কর্ণধাররা নতুন ভারত গঠনে প্রয়াসী হয়েছেন । তাই ফরাসি পণ্ডিত রােমা রােল‍্যাঁ  বলেছেন — স্বামীজির সর্বজনীন আত্মা মানবাত্মায় পর্যবসিত হয়েছিল ( ‘ His universal soul was roted in its human soul ‘ ) ।

2 thoughts on “নবভারত গঠনে স্বামী বিবেকানন্দের অবদান”

Leave a Comment

error: Content is protected !!