চুয়াড় বিদ্রোহ বলতে কি বোঝো আলোচনা কর

চুয়াড় বিদ্রোহ বলতে কি বোঝো আলোচনা কর

মেদিনীপুর জেলার ‘ জঙ্গলমহল ‘ নামে বনাঞ্চলে বসবাস করত চুয়াড় উপজাতি । এই চুয়াড়রাই ইংরেজদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সােচ্চার হয়ে বিদ্রোহ ঘােষণা করেছিল । এরা সাধারণত কৃষিকাজ , পশুপাখি শিকারের পাশাপাশি জঙ্গলমহলে উৎপাদিত বিভিন্ন জিনিস বিক্রয় করে জীবিকা চালাত । এদের মধ্যে অনেকেই মেদিনীপুরের রানি শিরােমণির অধীনে পাইক বা সৈনিকের কাজ করত । বেতনের পরিবর্তে তাদের ‘ পাইকান ’ নামে জায়গির জমি দেওয়া হত । মেদিনীপুরের প্রধান সেটলমেন্ট অফিসার জে. সি. প্রাইস  লিখেছেন — ১৭৯৮ ও ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দ মেদিনীপুরের ইতিহাসকে ভয়ংকর চুয়াড় বিদ্রোহের বছর হিসেবে চিহ্নিত করে রেখেছে ।

main qimg b16ad519cae23fbcb2a02ddc0b74ae5e
chuar rebellion

চুয়াড় বিদ্রোহের কারণ

কোম্পানির আমলে চুয়াড়দের বিদ্রোহের কারণগুলি হল —

জীবিকা সমস্যা : 

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চুয়াড়দের অধিকাংশ ভােগদখল করা জমি কেড়ে নিলে চুয়াড়দের স্বাধীন জীবিকার সমস্যা দেখা দেয় ।

খাজনার হার বৃদ্ধি : 

আবাদি জমিতে খাজনার হার বাড়িয়ে দেওয়ায় চুয়াড়রা ক্ষিপ্ত হয় । এদের সঙ্গে কৃষক , পাইক , সর্দাররাও বিক্ষুদ্ধ হয় ।

ইংরেজ কর্মচারীদের অত্যাচার :

রাজস্ব আদায়ের কাজে নিযুক্ত ইংরেজ কর্মচারীদের অত্যাচারের মাত্রা সহ্য ক্ষমতার বাইরে চলে গেলে চুয়াড়রা বাধ্য হয় বিদ্রোহের রাস্তায় যেতে ।

চুয়াড় বিদ্রোহের বিভিন্ন পর্যায়

প্রথম পর্যায়ে , ১৭৬৮ খ্রিস্টাব্দে ঘাটশিলার জমিদার তথা ধলভূমের রাজা জগন্নাথ সিংহের নেতৃত্বে চুয়াড় বিদ্রোহের সূচনা হয় । এতে যােগ দেন স্থানীয় কোয়ালপাল , ধৌলক , বরভূম প্রভৃতি মহলের জমিদার ও   প্রজারা । ক্যাপটেন মরগ্যানের নেতৃত্বে ব্রিটিশ বাহিনী এই বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে ব্যর্থ হয় । 

    
দ্বিতীয় পর্যায়ে , ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে স্থানীয় কিছু জমিদারের নেতৃত্বে প্রায় পাঁচ হাজার চুয়াড় কৃষক এই বিদ্রোহ পুনরায় শুরু করলে বিদ্রোহের তীব্রতায় ব্রিটিশ জগন্নাথ সিংহকে তাঁর জমিদারি ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয় ।


তৃতীয় পর্যায়ে , ধাদকার শ্যামগঞ্জনের নেতৃত্বে এই বিদ্রোহের সূচনা ঘটে । এই পর্যায়ে ১৭৮৩ থেকে ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কালিয়াচক অঞ্চলে এই বিদ্রোহ চরমে পৌছােয়া ।


অন্তিম পর্যায়ে , ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে এই বিদ্রোহ ব্যাপক হিংসাত্মক হয়ে ওঠে । বিদ্রোহীরা বহু এলাকায় সরকারি সম্পত্তি ও ফসল পুড়িয়ে দেয় । অচল সিংহের নেতৃত্বে ৩৮টি গ্রামের সর্দার ও পাইক সম্প্রদায় গেরিলা পদ্ধতিতে আক্রমণ চালায় । ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে মাধব সিংয়ের নেতৃত্বে এবং ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দে রাজা গঙ্গানারায়ণের নেতৃত্বে চুয়াড়রা পুনরায় বিদ্রোহ ঘােষণা করে ।

চুয়াড় বিদ্রোহ দমন

ব্রিটিশ বিদ্রোহে নেতৃত্বদানকারী জমিদারদের শায়েস্তা করার জন্য সেনাবাহিনী পাঠায় । মেদিনীপুরের সে সময়কার প্রেসিডেন্ট গ্রাহাম সাহেবের নির্দেশে লেফটেন্যান্ট ফার্গুসন সেনাবাহিনীর সাহয্যে প্রথম পর্বের চুয়াড় বিদ্রোহ দমন করেন । পরবর্তী সময়ে চুয়াড়রা পুনরায় বিদ্রোহী হয়ে উঠলেও ব্রিটিশের তীব্র দমননীতির কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় ।

চুয়াড় বিদ্রোহের গুরুত্ব

এই বিদ্রোহের চালিকাশক্তি ছিল কৃষক সম্প্রদায় , যাদের নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে এসেছিলেন জমিদারশ্রেণি । জমিদারদের সঙ্গে প্রজাদের মিলনে এই বিদ্রোহ অন্য মাত্রা পায় । আদিবাসী এলাকাগুলিতে এরপর থেকে রাজস্বব্যবস্থা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ অনেকটাই সচেন থাকে । এই বিদ্রোহ পরবর্তীকালের মহাবিদ্রোহের পথ প্রস্তুত করেছিল ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

x
error: Content is protected !!