মহলওয়ারি বন্দোবস্ত বলতে কী বোঝো

মহলওয়ারি বন্দোবস্ত বলতে কী বোঝো

জমিদারি বন্দোবস্তেরই এক পরিবর্তিত রূপ ছিল মহলওয়ারি বন্দোবস্ত । সরাসরি কৃষক বা জমিদার নয় , একটি গ্রাম বা মহলের সঙ্গে এই বন্দোবস্ত গড়ে ওঠে বলে এর নাম মহলওয়ারি বন্দোবস্ত । গাঙ্গেয় উপত্যকা অঞ্চল , উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ , মধ্যপ্রদেশ প্রভৃতি অঞ্চলে এই মহলওয়ারি বন্দোবস্ত চালু হয় ( ১৮২২ খ্রি . ) । ড . রমেশচন্দ্র দত্তের  মতে — এই ব্যবস্থায় ধন সঞ্চয় বা মানুষের আর্থিক উন্নয়ন সম্ভব ছিল না ।

grant of diwani rights to british 1
মহলওয়ারি বন্দোবস্ত


মহলওয়ারি বন্দোবস্ত এর পটভূমি

কোম্পানির বাের্ড অব কমিশনারের দুজন সদস্য মি. এডওয়ার্ড কোলব্রুক এবং মি. থান্ট – এর সুপারিশ মেনে বারাণসীতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করা হলেও উত্তর ভারতের অন্যান্য জায়গায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রচলন নিয়ে কোম্পানির কর্মকর্তাদের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয় । বিশেষ কমিশনার মি. এইচ. জি. টাকা , মি. আর. ডব্লিউ কক্স প্রমুখ যে সুপারিশ পেশ করেন তা মেনে ইংল্যান্ডের পরিচালক সভা ওই অঞ্চলগুলিতে চিরস্থায়ীর পরিবর্তিত ভুমিরাজস্ব প্রবর্তনের মত দেয় । অবশেষে পরিচালক সভার সম্পাদক হােন্ট ম্যাকিঞ্জি মহলভিত্তিক ভূমি বন্দোবস্তের সঙ্গে রায়তওয়ারি ব্যবস্থার বেশ কিছু নীতির সংমিশ্রণ ঘটান । এরপর কোম্পানি সপ্তম আইন জারির মাধ্যমে ( ১৮৯২ খ্রি.) এই ব্যবস্থার প্রচলন ঘটায় ।

মহলওয়ারি বন্দোবস্ত এর শর্তাবলি

মহলওয়ারি বন্দোবস্তের শর্তানুসারে 一

  • জমি জরিপ করে প্রতিটি মহল বা গ্রামের ওপর রাজস্ব নির্ধারিত হয় ।
  • গ্রামের ওপর ধার্য রাজস্ব গ্রামবাসীদের মিলিতভাবে দিতে হত ।
  • গ্রামবাসীরা তাদের নির্দিষ্ট রাজস্ব গ্রামপ্রধানের মারফত সরকারের ঘরে জমা করত ।
  • জমির উৎপাদিকা শক্তির হার অনুসারে ভূমিরাজস্বের হার নির্ধারিত হত ।
  • রায়ত ও সরকারের মধ্যে কোনাে মধ্যস্বত্বভােগীর অবস্থান ছিল না ।
  • প্রতিটি মহল বা মৌজার সঙ্গে ২০ – ৩০ বছরের জন্য ভূমি বন্দোবস্ত করা হয় ।

মহলওয়ারি বন্দোবস্ত এর উদ্দেশ্য

মহলওয়ারি ব্যবস্থার উদ্দেশ্যগুলি হল —

  • এই ব্যবস্থা প্রবর্তনের ক্ষেত্রে সরকার চেয়েছিল ভবিষ্যতে রাজস্বের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে ।
  • কোম্পানি এই ব্যবস্থার মাধ্যমে মধ্যস্বত্বভােগীদের বিলুপ্তি চেয়েছিল ।

মহলওয়ারি বন্দোবস্ত এর ত্রুটি

মহলওয়ারি ব্যবস্থায় বেশ কিছু ত্রুটি ছিল । যার অন্যতম কয়েকটি হল —

  • এই জমি বন্দোবস্তে জমির ওপর কৃষকের কোনাে মালিকানা ছিল না ।
  • অত্যধিক রাজস্বের হার দিতে গিয়ে কৃষক পরিবারগুলির স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয় ও দুঃখদুর্দশা বাড়ে ।
  • মধ্যস্বত্বভােগীর জায়গায় গ্রামপ্রধানরা স্বজনপােষণ ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছিল ।
  • গ্রাম বা মহলের যেসব কৃষক সঠিক সময়ে রাজস্ব মেটাতে ব্যর্থ হত তাদের সেই বকেয়া রাজস্ব গ্রামের অন্যান্যদের মেটাতে হত , না হলে গ্রামের জমি হাতছাড়া হয়ে যেত ।

উপসংহার

মহলওয়ারি ব্যবস্থাকে লর্ড বেন্টিঙ্কের আমলে আরও ঢেলে সাজানাে হয়েছিল । বেন্টিঙ্ক নবম রেগুলেশন জারি করে ( ১৮৩৩ খ্রি. ) এই ব্যবস্থাকে আরও সম্প্রসারিত করেন এবং নতুন গড়ে ওঠা এই ব্যবস্থা কার্যকর করার দায়িত্ব দেন রবার্ট বার্ডকে । রমেশচন্দ্র দত্তের  মতে , শেষপর্যন্ত অতিরিক্ত কঠোরতার ফলে এই ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে (‘ The system broke down ultimately by reason of its Own harshness ‘ ) ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

x
error: Content is protected !!