বাংলায় মাৎস্যন্যায় বলতে কী বােঝ

বাংলায় মাৎস্যন্যায় বলতে কী বােঝ

big fish eat little fish vector 21095560
মাৎস্যন্যায়

শশাঙ্কের মৃত্যুর পর প্রায় ১১৩ বছর বাংলা দেশে ঘাের অরাজকতা , অনৈক্য , আত্মকলহ ও বহিঃশত্রুর ক্রমাগত আক্রমণ চলতে থাকে । সেই সময় বাংলার রাজতন্ত্র প্রায় ধ্বংস হয়ে যায় । শশাঙ্ক উত্তর ও পশ্চিম বাংলায় এক সার্বভৌম রাজশক্তি স্থাপন করেন । কিন্তু তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে বাংলার দুই অঞ্চল পুনরায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে । ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে হিউয়েন সাঙ বাংলা পরিভ্রমণকালে চারটি স্বাধীন রাজ্যের উল্লেখ করেছেন , যথা — পুণ্ড্রবর্ধন ( উত্তরবঙ্গ ) , কর্ণসুবর্ণ ( পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চল ) , সমতট ( দক্ষিণ – পূর্ববঙ্গ ) ও তাম্রলিপ্ত ( তমলুক ) । কোনাে সার্বভৌম রাজশক্তি না থাকায় এই সমস্ত রাজ্যের মধ্যে প্রায়ই সংঘাত ও সংঘর্ষ বাধত । বৌদ্ধগ্রন্থ ‘ আর্যমঞ্জুশ্রী মূলকল্প ’ থেকে বাংলার রাজাদের দুর্দশার কথা জানা যায় । শক্তিশালী রাজতন্ত্রের পতনের পর গৃহবিবাদ , রাজবংশের দ্রুত পরিবর্তন ও ছােটো ছােটো প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি ছিল বাংলার সমকালীন অবস্থা । বাংলার শাসনব্যবস্থা অকেজো হওয়ায় চারদিকে নৈরাজ্য ও অরাজকতা ব্যাপক আকার ধারণ করে । রাজনৈতিক অনৈক্য ও বিশৃঙ্খলার সুযােগ নিয়ে বৈদেশিক রাজন্যবর্গ বারবার বাংলা দেশ আক্রমণ করতে থাকেন । শশাঙ্কের মৃত্যুর পর কামরূপরাজ ভাস্করবর্মন কর্ণসুবর্ণ দখল করে নেন । কনৌজের রাজা বর্তমান বাংলাদেশের প্রায় অধিকাংশ অঞ্চল দখল করে নেন । কাশ্মীররাজ ললিতাদিত্যও বাংলা দেশে নিজ আধিপত্য স্থাপন করেছিলেন ।

সবলেরা দুর্বলের ওপর নির্বিচার জুলুম চালাতে থাকে । বৌদ্ধ পণ্ডিত লামা তারানাথ  বাংলার অবস্থা বর্ণনা করে লিখেছেন — তখন বাংলায় কোনাে রাজা ছিল না ; প্রত্যেক ক্ষত্রিয় , ব্রাহ্মণ , সামন্ত ও বণিক নিজ নিজ এলাকায় স্বাধীনভাবে রাজত্ব করতেন ; ফলে জনগণের দুঃখকষ্টের সীমা ছিল না । পুকুরের বড়াে মাছ যেমন ছােটো মাছকে নির্বিচারে গিলে ফেলে , তেমনি অরাজকতার সুযােগে বাংলা দেশে সবলেরা দুর্বলের ওপর যথেচ্ছ শােষণ চালাত । তাই সমকালীন পুথিতে ওই সময়কে ‘ মাৎস্যন্যায় ’ বলা হয়েছে । বৌদ্ধগ্রন্থ ‘ আর্যমঞ্জুশ্রী মূলকল্প’তে বাংলার এই অরাজক অবস্থাকে ‘ গৌড়তন্ত্র ’ বলে পরিহাস করা হয়েছে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!