ভরের নিত্যতা বা সংরক্ষণ সূত্র

ভরের নিত্যতা বা সংরক্ষণ সূত্র

পদার্থের ভৌত বা রাসায়নিক পরিবর্তন হলে দেখা যায় যে পরিবর্তনের আগে এবং পরে পদার্থের মােট ভর এই থাকে । অর্থাৎ পদার্থের ভর অবিনাশী , একে সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না । বিজ্ঞানী ল্যাভয়সিয়ের প্রথম বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়া পরীক্ষা ও বিশ্লেষণ করে ভরের এই নিত্যতা সূত্রটি আবিষ্কার করেন । সূত্রটি হল — জড় পদার্থ অবিনশ্বর , একে সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না । বিভিন্ন ভৌত বা রাসায়নিক পরিবর্তনের আগে ও পরে পদার্থের মােট ভর অপরিবর্তিত থাকে । ধরা যাক , A ও B দুটি পদার্থের রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে দুটি নতুন পদার্থ C ও D উৎপন্ন হল । ভরের নিত্যতা সূত্রানুযায়ী , বিক্রিয়ার আগে A ও B – এর মােট ভর এবং বিক্রিয়ার পরে C ও D – এর মোট ভর সমান হবে । নীচে দৈনন্দিন জীবনের কিছু উদাহরণ উল্লেখ করা হল —

  1. একটি খালি পাত্রে জল ফোটালে জলের ভর ক্রমশ কমতে থাকে । আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় ভরের বিনাশ ঘটল । প্রকৃতপক্ষে জল বাষ্পে পরিণত হয় । এই বাষ্পের ভর বিবেচনা করলে দেখা যাবে যে জলের ভর যে পরিমাণ কমে সেই পরিমাণ বাষ্প তৈরি হয় । যদি একটি আবদ্ধ পাত্রে জল ফোটানাে হয় তাহলে দেখা যাবে যে জল বাষ্পীভূত হওয়ার আগে পাত্রের মােট ভর এবং জল বাষ্পীভূত হওয়ার পর পাত্রের মােট , ভর একই থাকে অর্থাৎ জলের বাষ্পীভবন ভরের নিত্যতা সূত্র মেনে চলে ।
  2. এক গ্লাস জলে কিছুটা চিনি দ্রবীভূত করলে দেখা যায় যে চিনি দ্রবীভূত হওয়ার আগে ও পরে গ্লাসের মােট ভর একই থাকে ।
  3. কয়লা বায়ুতে পােড়ালে অবশেষ হিসাবে সামান্য পরিমাণ ছাই পড়ে থাকে । মনে হয় যেন এক্ষেত্রে ভর কমে গেল । প্রকৃতপক্ষে কয়লার মধ্যস্থিত কার্বন বায়ুর অক্সিজেনের সাথে যুক্ত হয়ে কার্বন-ডাই-অক্সাইড গঠন করে । যদি কয়লার দহন কোন আবদ্ধ পাত্রে করা হয় তাহলে দেখা যাবে যে দহনের আগে ও পরে মোট ভর একই থাকে অর্থাৎ কয়লার দহন ভরের নিত্যতা সূত্র মেনে চলে ।

ভরের নিত্যতা সূত্রের পরীক্ষামূলক প্রমাণ

নানারকম পরীক্ষা থেকে ভরের নিত্যতা সূত্র প্রমাণ করা যায় । নীচে দুটি সহজ পরীক্ষা বর্ণনা করা হল ।

hqdefault
ম্যাগনেসিয়ামের দহন

ম্যাগনেসিয়ামের দহন :

একটি লম্বা গলা ও গােলীয় তলযুক্ত ফ্লাস্ক নেওয়া হল । ফ্লাস্কের মুখটি একটি রবারের ছিপি দিয়ে আটকে ওই ছিপির মধ্য দিয়ে দুটি তামার তার প্রবেশ করানাে হল । একটি তামার তারের শেষ প্রান্তে একটি ছােটো তামার চামচ লাগানাে থাকে । এই চামচের মধ্যে এক টুকরাে ম্যাগনেসিয়াম ফিতে রাখা হয় । চামচটির সাথে তামার অপর তারটি একটি প্লাটিনাম তার দিয়ে যুক্ত করা হয় । ম্যাগনেসিয়াম সমেত বায়ুপূর্ণ ফ্লাস্কটির ভর মাপা হয় । এবার তামার তার দুটি ব্যাটারির সাথে যুক্ত করলে তড়িৎপ্রবাহ ঘটে । ফলে প্লাটিনাম তার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং তার সংস্পর্শে এসে ম্যাগনেসিয়াম জ্বলে ওঠে । বায়ুর অক্সিজেন ও নাইট্রোজেনের সাথে বিক্রিয়া করে ম্যাগনেসিয়াম যথাক্রমে ম্যাগনেসিয়াম অক্সাইড ও ম্যাগনেসিয়াম নাইট্রাইড উৎপন্ন করে । বিক্রিয়া শেষে যন্ত্রটিকে ঠান্ডা করে ভর মাপলে দেখা যাবে যে যন্ত্রটির ভরের কোনাে পরিবর্তন হয় নি । সুতরাং পরীক্ষাটি প্রমাণ করে যে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় পদার্থের রূপান্তর ঘটলেও বিক্রিয়ার পূর্বে ও পরে পদার্থের মােট ভরের কোনাে পরিবর্তন হয় না ।

Candleburning
মােমের দহন

মােমের দহন :

একটি বড়াে বেলজারের মধ্যে একটি মোমবাতি খাড়াভাবে বসিয়ে বেলজারটির ঢাকনা সমেত ভর তুলাযন্ত্রের সাহায্যে মাপ হল । এবার ঢাকনা খুলে একটি লম্বা জ্বলন্ত কাঠির সাহায্যে মােমবাতি জ্বেলে দিয়ে খুব দ্রুত ঢাকনা বন্ধ করে দেওয়া হল । বায়ুতে মােমবাতির দহনের ফলে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও জল  উৎপন্ন হয় এবং মােমবাতি ক্ষয়ে যায় । কিন্তু ঠান্ডা করে বেলজারটির ভর মাপলে দেখা যায় যে দহনের আগের ও পরের ভর একই হয় । অর্থাৎ মােমবাতির দহন ভরের নিত্যতা সূত্র মেনে চলে । 

Leave a Comment

error: Content is protected !!