ভারতে বাগিচা শিল্পের বিকাশে ইউরোপীয় উদ্যোগ

ভারতে বাগিচা শিল্পের বিকাশে ইউরোপীয় উদ্যোগ

বাগিচা শিল্পের ক্ষেত্রে ইউরােপীয় শিল্পোদ্যোগের তুলনায় দেশীয় শিল্পোদ্যোগ খুব একটা উল্লেখযোগ্য ছিল না । ভারতে আবাদ ভিত্তিক অর্থকরী বাণিজ্য পণ্যের একচেটিয়া মালিকানা ছিল ইউরােপীয়দের হাতে নীল , চা , কফি , আখ ছিল ওইসব বাগিচা শিল্পের অন্যতম ।

history of tea 1
ভারতে বাগিচা শিল্প

ভারতে বাগিচা শিল্পে ইউরােপীয় উদ্যোগ

চা :

রবার্ট ব্রুস নামক এক ইংরেজ ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে আসামের জঙ্গলে চা গাছের আবিষ্কার করেন। অ্যান্ডু চার্লটন ভারতে সর্বপ্রথম চা গাছ রােপণ করেন ( ১৮৩২ খ্রি. ) । তবে চা শিল্প বলতে যা বােঝায় তা গড়ে ওঠে বড়ােলাট লর্ড বেন্টিঙ্কের প্রচেষ্টায় । ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে কয়েকজন ইংরেজ শিল্পপতি গড়ে তােলেন আসাম টি কোম্পানি । সরকার চা বাগিচার জন্য করমুক্ত জমি ও নানা সুযােগসুবিধা দিলে আসাম ও বাংলার পার্বত্য অঞ্চল , হিমাচল প্রদেশ ও পাঞ্জাবের কাংড়া অঞ্চল , হিমালয়ের তরাই , ডুয়ার্স , দক্ষিণ ভারতের পার্বত্য অঞ্চল ও নীলগিরিতে ধীরে ধীরে চা শিল্পের বিকাশ ঘটে । ১৮৫৯ থেকে ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ২০টি চা কোম্পানি রেজিস্ট্রিভুক্ত হয় । চা শিল্পের প্রসারের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় দ্য ইন্ডিয়ান টি অ্যাসােসিয়েশন ( ১৮৮১ খ্রি. ) । ১৯০২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে প্রায় পাঁচ লক্ষ কুড়ি হাজার একর জমির ওপর গড়ে ওঠে ৩০২টি চা বাগিচা ।

নীল :

ফরাসি লুই বােনার সর্বপ্রথম হুগলির চন্দননগরে নীল গাছ রােপণ করে ( ১৭৭৭ খ্রি. ) । নীল ছিল ভারতে কোম্পানির রপ্তানি বাণিজ্যের প্রথম স্থানাধিকারী পণ্য । ভারতে উৎপন্ন নীলের মধ্যে বাংলা – বিহারের নীলই ছিল  সর্বোৎকৃষ্ট । এ সময়ে ইংল্যান্ডে বস্ত্র শিল্পের উৎপাদনে বিপ্লব ঘটলে বাংলার নীলের চাহিদা প্রচুর বেড়ে যায় । অবশেষে ১৮৫৯ – ৬০ খ্রিস্টাব্দে নীলচাষের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিদ্রোহ এবং ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ রাসায়নিক নীলের আবিষ্কারের কারণে নীলচাষ বন্ধ হয়ে যায় ।

কফি :

১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে ইউরােপীয় মালিকানায় ফোর্ট গ্লস্টার সংস্থা বাংলায় কফি চাষ শুরু করে । তবে এখানে  সুবিধাজনক না হওয়ায় , দক্ষিণ ভারতের মহীশূরে ও নীলগিরিতে কফির চাষ শুরু হয় । সেখানে কফি শিল্পটি সাফল্য লাভ করে । কফি শিল্পে ইউরােপীয় উদ্যোগীদের মধ্যে উল্লেখযােগ্য ছিল ডানকান ব্রাদারস , উইলিয়ামস ম্যাগর , অ্যান্ড্রু ইয়ুল প্রভৃতি কোম্পানি । কফি শিল্পে দেশীয় উদ্যোগ খুব একটা উল্লেখযােগ্য ছিল না । সে সময়কার উল্লেখযােগ্য দুটি দক্ষিণ ভারতের কফি চাষ কেন্দ্র ছিল কুর্গ ও ওয়েইনাদ ।

ইক্ষু :

আখ বা চিনি শিল্পেও ইউরােপীয়রা মূলধন বিনিয়ােগ করেছিল । এদেশে প্রথম চিনিকলটি স্থাপিত হয় ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে । আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালের মধ্যে ভারতে চিনিকল গড়ে উঠেছিল ১৬১টি । তবে এর সবগুলিই ছিল ইউরােপীয় মালিকানাধীন । ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ প্রায় ৩০টি চিনি কলে প্রায় ১ লক্ষ ৫৮ হাজার টন চিনি উৎপাদিত হয় । এর পরের বছর থেকে চিনি শিল্পে সংরক্ষণ প্রথা চালু হলে এই শিল্পের আরও উন্নতি ঘটতে শুরু করে ।

উপসংহার

ভারতে বিদেশি শিল্পোদ্যোগের প্রথম পর্ব থেকেই ইউরােপীয়রা বাগিচা শিল্পের প্রতি বিশেষ আগ্রহশীল ছিল । ১৮১৩ – র সনদ আইনে ভারতের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যিক অধিকারের অবসান ঘটলে ইউরােপীয় শিল্পপতিরা তাদের মূলধনকে বাগিচা শিল্পে বিনিয়ােগ করে মুনাফা অর্জনের সুযােগ পায় । ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!