মূক ও বধির শিশু কাকে বলে

মূক ও বধির শিশু কাকে বলে

সাধারণত যেসব শিশুরা জন্মের পর থেকেই কথা বলতে পারে না এবং কানে শুনতে পায় না তাদের মূক ও বধির বলা হয় । 

শ্রবণ জনিত ত্রুটি যুক্ত শিশুদের শ্রেণীবিভাগ 

শ্রবণ জনিত ত্রুটি যুক্ত শিশুদের বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা যায় । মাত্রানুযায়ী , বয়স অনুযায়ী , ভাষাগত অভিজ্ঞতা অনুযায়ী , কর্ণের ত্রুটি অনুযায়ী এবং কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের ত্রুটি অনুযায়ী ইত্যাদি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্রেণীবিভাগ করা হয় । ভারত সরকারের জনকল্যাণ মন্ত্রকের তথ্যের ভিত্তিতে মাত্রানুযায়ী শ্রবণ জনিত ত্রুটি সম্পন্ন শিশুদের ছয়টি শ্রেণিতে ভাগ করা যায় । যেমন— 

[ 1 ] স্বল্প শ্রবণ জনিত ত্রুটি , 

[ 2 ] মৃদু শ্রবণ জনিত ত্রুটি , 

[ 3 ] মাঝারি শ্রবণ জনিত ত্রুটি , 

[ 4 ] গুরুতর শ্রবণ জনিত ত্রুটি , 

[ 5 ] সম্পূর্ণ বধিরতার কাছাকাছি , 

[ 6 ] সম্পূর্ণ বধির । 

শ্রবণ শক্তির দিক থেকে অনেকে প্রতিবন্ধী ছেলেমেয়েদের দুটি শ্রেণিতে ভাগ করেন । যেমন : 

জন্মগত বধির : জন্ম থেকেই যে সমস্ত শিশুর শ্রবণক্ষমতা নেই তাদের এই শ্রেণিতে রাখা হয় । 

আংশিক বধির : যে সমস্ত শিশুর শ্রবণ ক্ষমতা বিভিন্ন শারীরিক অসুস্থতার কারণে আংশিক ভাবে নষ্ট হয়ে গেছে তাদের এই শ্রেণিতে রাখা হয় । 

মূক ও বধির শিশুদের শিক্ষার সমস্যা

[ 1 ] মূক ও বধির শিশুদের শারীরিক গঠন এবং বৃদ্ধি স্বাভাবিক শিশুদের মতো হলেও নানা ধরনের সঞ্চালন মূলক কাজের ক্ষেত্রে তারা স্বাভাবিক শিশুদের তুলনায় অনেকখানি পিছিয়ে থাকে ।

[ 2 ] মূক ও বধির শিশুদের বৌদ্ধিক বিকাশও সাধারণ শিশুদের তুলনায় অনেক কম হয় । 

[ 3 ] মূক ও বধির শিশুরা পরিবেশের সঙ্গে ঠিক মতো মানিয়ে নিতে পারে না । ফলে সবসময়ই পিছিয়ে পড়ে এবং নিরাপত্তার অভাব বোধ করে । 

[ 4 ] মূক ও বধিররা অপরের কথা শুনতে না পাওয়ায় এবং নিজের কথা অপরকে বলতে না পারায় সবসময় হীনম্মন্যতায় ভোগে , নিজেদের গুটিয়ে রাখে । অনেক সময় বিভিন্ন ধরনের প্রাক্ষোভিক অস্বাভাবিকতা প্রদর্শন করে । মূক ও বধিরদের এই ধরনের সমস্যাগুলি অনুধাবন করে তাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করলে তারা সমাজ জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে । 

মূক ও বধির শিশুদের শিক্ষার উদ্দেশ্য  

[ 1 ] বাচনিক ক্ষমতার বিকাশে সহায়তা করা এবং কথা বলার দক্ষতা অর্জনে সাহায্য করা । 

[ 2 ] মূক ও বধিররা যাতে অপরের ভাষা বুঝতে পারে এবং নিজের ভাষা অপরকে বোঝাতে পারে তার জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা । 

[ 3 ] তাদের সামাজিক বিকাশে সহায়তা করা । 

[ 4 ] নানা ধরনের যান্ত্রিক কৌশল অবলম্বনের দ্বারা মূক ও বধিরদের শ্রবণ দক্ষতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা । 

[ 5 ] হীনম্মন্যতা দূর করে তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা । 

[ 6 ] তাদের বিভিন্ন কাজ চালানোর উপযোগী পঠন ক্ষমতার বিকাশে সাহায্য করা । 

[ 7 ] তাদের বৃত্তিমুখী প্রশিক্ষণ দিয়ে উৎপাদনশীল নাগরিকে পরিণত করা এবং তারা যাতে আর্থিক দিক থেকে স্বনির্ভর হতে পারে তার ব্যবস্থা করা । 

মূক ও বধির শিশুদের শিক্ষার পাঠক্রম 

মূক ও বধিরদের পাঠক্রমে যেসব বিষয় রাখা হয় সেগুলি হল : 

[ i ] বাচনিক ভঙ্গিমার অনুধাবনের জন্য ওষ্ঠ পঠন বা বাক পঠনের ব্যবস্থা , 

[ ii ] ) শ্রবণ সহায়ক যন্ত্রের যথাযথ ব্যবহার , 

[ iii ] গণিত ,  

[ iv ] সমাজ বিজ্ঞান এবং  

[ iv ] হাতের কাজ । 

এ ছাড়া পরিবেশ পরিচিতি , উদ্যান পালন প্রভৃতি বিষয়ও পাঠক্রমে রাখা হয় । 

মূক ও বধির শিশুদের শিক্ষাদান পদ্ধতি  

ওষ্ঠ পঠন :

এই পদ্ধতিতে বক্তার কথা বলার সময় তার ঠোঁট নড়াচড়া দেখে কথা বুঝতে হয় । মূক এবং বধিররা কথা বোঝার পাশাপাশি একইভাবে ঠোঁটের সঞ্চালন ঘটিয়ে নিজের ভাষা অপরকে বুঝিয়ে থাকে । 

আঙুলের দ্বারা বানান শেখানো : 

এই পদ্ধতিতে সম্পূর্ণ বধিরেরা ভাব প্রকাশের জন্য অঙ্গুলি সঞ্চালনের সাহায্য নেয় । অক্ষর , শব্দ , বাক্য এবং বানান অঙ্গুলি সঞ্চালনের মাধ্যমেই শেখে । 

কম্পন এবং স্পর্শ পদ্ধতি : 

এই পদ্ধতিতে পাঠ গ্রহণের সময় মূক ও বধিরেরা শিক্ষকের মুখে হাত বুলিয়ে গলা স্পর্শ করে শব্দ উচ্চারণ করতে শেখে । 

শ্রবণ সহায়ক পদ্ধতি : 

উচ্চশক্তি সম্পন্ন শ্রবণ সহায়ক যন্ত্রের সাহায্যে আংশিক বধিরদের শিক্ষাদান করা হয় । 

দর্শন ভিত্তিক পদ্ধতি : 

এই পদ্ধতিতে কতকগুলি প্রতীক ব্যবহারের দ্বারা মূক ও বধির ছেলেমেয়েদের শিক্ষাদান করা হয় । শিক্ষার্থীরা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শিক্ষকের মতো মুখাকৃতি করে শব্দ উচ্চারণের চেষ্টা করে । 

মূক ও বধিরদের শিক্ষাদানের কাজটি অত্যন্ত জটিল । এদের শিক্ষাদানের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ যুক্ত শিক্ষক শিক্ষিকার প্রয়োজন হয় । এই ধরনের শিশুদের শিক্ষার অগ্রগতি অত্যন্ত ধীরে হয় ।

error: Content is protected !!