অন্ধ শিশুদের শিক্ষা পদ্ধতি

অন্ধ শিশুদের শিক্ষা পদ্ধতি

অন্ধ শিশুদের শিক্ষার ধারা প্রসঙ্গে অন্ধ শিশুদের শিক্ষার উদ্দেশ্য , তাদের পাঠক্রম এবং শিক্ষার পদ্ধতি উল্লেখ করা প্রয়োজন । নীচে এই বিষয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হল ㅡ

দৃষ্টিহীন শিশুদের শিক্ষার উদ্দেশ্য 

অন্ধ শিশুদের শিক্ষার উদ্দেশ্যগুলি হল : 

[ i ] অভিজ্ঞতা অর্জনে সহায়তা করা , 

[ ii ] আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তোলা , 

[ iii ] বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে উপযুক্ত মনোভাব গড়ে তোলা , 

[ iv ] চোখ ছাড়া অন্যান্য ইন্দ্রিয়ের ব্যবহারের দ্বারা জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ে সহায়তা করা , 

[ v ] প্রবণতা অনুযায়ী শিক্ষালাভে সহায়তা করা , 

[ vi ] সংগতি বিধানে সহায়তা করা , 

[ vi ] বৃত্তিমুখী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা , 

[ viii ] সক্রিয়তা ভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে হীনম্মন্যতাবোধ দূর করা ইত্যাদি । 

অন্ধ শিশুরা যাতে পরিবর্তনশীল জটিলতর সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে সার্থকভাবে মানিয়ে নিতে পারে , সে বিষয়ে তাদের সক্ষম করে তোলা এবং বাস্তব জীবনের উপযোগী নানা ধরনের বৃত্তি শিক্ষার মাধ্যমে । তাদের সমাজের একজন স্বনির্ভর সদস্য বা নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা এই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য । 

অন্ধ শিক্ষার্থীরা চোখে দেখতে না পেলেও তাদের বৌদ্ধিক দক্ষতা স্বাভাবিক শিশু বা শিক্ষার্থীদের থেকে কোনো অংশেই কম নয় । শ্রবণেন্দ্রিয় , স্পর্শেন্দ্রিয় , ঘ্রাণেন্দ্রিয় প্রভৃতির সাহায্যে তারা অতি সহজে বিভিন্ন ধরনের জ্ঞান অর্জন করতে পারে । তাই এইসব ইন্দ্রিয়কে আরও সক্রিয় এবং কর্মক্ষম করে তোলার শিক্ষালাভ করাও অন্ধ শিশুদের শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য । 

দৃষ্টিহীন শিশুদের শিক্ষার পাঠক্রম 

অন্ধ শিশুদের বিকাশ মূলক বৈশিষ্ট্য , বুদ্ধি , প্রবণতা অনেকটা স্বাভাবিক শিশুর মতোই হয়ে থাকে । তাই অন্ধদের জন্য পৃথক কোনো পাঠক্রমের ব্যবস্থা করা হয় না । তারা স্বাভাবিক শিশুদের মতো সাধারণধর্মী এবং বিশেষ উভয় প্রকার শিক্ষাই গ্রহণ করতে পারে । এমনকি আংশিক দৃষ্টি সম্পন্ন শিশুরা সাধারণ বিদ্যালয়ে স্বাভাবিক শিশুদের সঙ্গেই পাঠগ্রহণ করতে পারে । তাদের জন্য বড়ো হরফে ছাপা বই এবং উপযুক্ত শিক্ষা সহায়ক উপকরণের প্রয়োজন হয় । 

আর যারা পুরোপুরি দৃষ্টিহীন তাদের জন্য পৃথক বিদ্যালয়ের প্রয়োজন হয় । অন্ধ ও আংশিক অন্ধ উভয় শিক্ষার্থীদের জন্য সাধারণধর্মী পাঠক্রমে ভাষা ও সাহিত্য , গণিত , বিজ্ঞান , ইতিহাস , ভূগোল প্রভৃতি বিষয়ের পাঠের ব্যবস্থা করা হয় । 

এ ছাড়া তাদের দেহের যথাযথ বিকাশের জন্য স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিষয় , গান বাজনা , হাতের কাজ , শারীর শিক্ষা প্রভৃতির ব্যবস্থা করা হয় । দৃষ্টিহীন ছেলেমেয়েদের বিশেষ ক্ষমতাগুলির যথাযথ বিকাশের জন্য নানা ধরনের সহপাঠক্রমিক কাজের আয়োজন করা হয় ।

দৃষ্টিহীন শিশুদের শিক্ষা পদ্ধতি 

অন্ধ শিশুদের জন্য শিক্ষার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের শিক্ষণ কৌশল ব্যবহার করা হয় । এইসব পদ্ধতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল : 

ব্রেইল পদ্ধতি : 

বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় প্রত্যেকটি দেশে অন্ধ শিশুদের পড়নোর জন্য ব্রেইল পদ্ধতি চালু আছে । পুরু কার্ডবোর্ড বা কাগজের ওপর ‘ স্টাইলাস ’ দিয়ে বিন্দু দেওয়া হয় । উঁচু উঁচু ছয়টি বিন্দুকে বিভিন্নভাবে সাজিয়ে ব্রেইল লেখা হয় । লুইস ব্রেইল ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে এই পদ্ধতি আবিষ্কার করেন । বিভিন্ন বিষয় , যেমন — বৈজ্ঞানিক সংকেত , গণিত , সংগীতের স্বরলিপি প্রভৃতি ব্রেইলের মাধ্যমে প্রকাশ করা যায় । দৃষ্টিহীনরা হাত দিয়ে ছুঁয়ে ব্রেইলের বিন্দুগুলির বিন্যাস অনুভব করে পড়তে পারে । আবার একই ধরনের কাগজে স্টাইলাস দিয়ে ব্রেইল ব্যবস্থার মাধ্যমে লিখতে পারে । 

শব্দ নির্ভর পদ্ধতি :

বিভিন্ন প্রকার ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারের দ্বারা অথবা টকিং বুক , ফোনোগ্রাম , টেপরেকর্ডার , অডিয়ো ক্যাসেট ইত্যাদির দ্বারা অন্ধ শিশুদের শিক্ষা দেওয়া হয় । 

ব্যক্তিকেন্দ্রিক পদ্ধতি :

শিক্ষা মনস্তত্ত্ব অন্ধ শিশুদের ব্যক্তি ভিত্তিক শিক্ষাকেই সমর্থন করে । কিন্তু আর্থিক ও অন্যান্য কিছু কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দলগত শিক্ষা ব্যবহৃত হয় । 

সক্রিয়তা ভিত্তিক পদ্ধতি : 

অন্ধ শিশুদের বিশ্বজগতের বিভিন্ন উপাদান সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার জন্য সক্রিয়তা ভিত্তিক শিক্ষা পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয় । 

নির্ভুল অভিজ্ঞতা দান : 

বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে নির্ভুল জ্ঞান অর্জনের জন্য অন্ধ শিশুদের শ্রবণ ও স্পর্শ ইন্দ্রিয়ের সাহায্যের প্রয়োজন । 

অন্ধ শিশুরা আমাদেরই সমাজের একটা অংশ । তারা করুণার পাত্র নয় । তাই আন্তরিকতার সঙ্গে সচেতনভাবে তাদের শিক্ষাদান করতে হবে , যাতে তারা সমাজের স্বনির্ভর সদস্যে পরিণত হয় এবং দেশের উৎপাদনশীলতার সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতে পারে । বর্তমানে প্রতিবন্ধী হিসেবে অন্ধ শিশুদের শিক্ষাদান রাষ্ট্রীয় কর্তব্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে ।

error: Content is protected !!