রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীজীর শিক্ষা চিন্তার তুলনা 

রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীজীর শিক্ষা চিন্তার তুলনা 

ভারতের দুই মনীষী রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীজির শিক্ষা চিন্তার মধ্যে যথেষ্ট সাদৃশ্য থাকলেও বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু পার্থক্যও লক্ষ করা যায় । নীচে রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীজির শিক্ষা চিন্তার তুলনামূলক আলোচনা করা হল । 

শিক্ষাদর্শন 

রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা দর্শন প্রধানত ভাববাদ ও প্রকৃতবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয় । 

অপরদিকে ভাববাদ ও প্রয়োগবাদ গান্ধীজীর শিক্ষা দর্শনকে প্রভাবিত করে । 

শিক্ষার লক্ষ্য

রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীজী উভয়েই ব্যক্তির সম্পূর্ণ বিকাশকেই শিক্ষার লক্ষ্য বলে মনে করেন । কবিগুরুর মতে , ব্যক্তির দৈহিক , বৌদ্ধিক , নৈতিক , আধ্যাত্মিক ও সামাজিক গুণাবলির বিকাশই শিক্ষার লক্ষ্য । গান্ধীজী বলেছেন , মানুষ বা শিশুর মধ্যে যা কিছু শ্রেষ্ঠ তা আকর্ষণ করে তার পরিপূর্ণ বিকাশ — তার দেহ , মন ও আত্মার সম্পূর্ণ বিকাশ । শুধু পার্থিব সম্পদ নয় , আধ্যাত্মিক শক্তির প্রকাশই হবে শিক্ষার চরম লক্ষ্য । 

শিক্ষার লক্ষ্যের ক্ষেত্রে দুজনের মতের পার্থক্য খুবই সূক্ষ্ম । গান্ধীজীর শিক্ষার লক্ষ্য অপেক্ষাকৃত মূর্ত , সেখানে কবিগুরুর উল্লিখিত শিক্ষার লক্ষ্য কিছুটা বিমূর্ত । গান্ধীজীর শিক্ষার লক্ষ্য জাতীয় চেতনা সমৃদ্ধ , আন্তর্জাতিকতা সেখানে অনুপস্থিত । 

অন্যদিকে , রবীন্দ্রনাথের শিক্ষার লক্ষ্যের মধ্যে জাতীয় চেতনা ভীষণভাবে পরিস্ফুট হলেও আন্তর্জাতিক চেতনার মিলন ঘটেছে । রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীজী উভয়েই ব্যক্তিতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্যের মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে চেয়েছেন ; যদিও কবিগুরু ব্যক্তিতান্ত্রিকতার ওপর অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন , যেখানে গান্ধীজী বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন সমাজতান্ত্রিকতাকে । 

পাঠক্রম 

রবীন্দ্রনাথের মতে , শিশুর জীবনের সবদিককে স্পর্শ করে এমন পাঠক্রম প্রণয়ন করা উচিত । সম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য তাকে ভাষা , সাহিত্য , ইতিহাস , ভূগোল , বিজ্ঞান , অঙ্কন , শিল্পকলা , নৃত্য , সংগীত , নাটক প্রভৃতি সবকিছুরই শিক্ষা দিতে হবে । ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য পাঠক্রমে সংস্কৃত ভাষা শিক্ষা এবং মহাভারত , রামায়ণকে অন্তর্ভূক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ । এ ছাড়া তিনি পাশ্চাত্য বিজ্ঞান শিক্ষার ওপরেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন ।  

গান্ধীজীও শিশুর জীবনের সম্পূর্ণ বিকাশের জন্য পাঠক্রম রচনার কথা বলেছেন । তাঁর উল্লিখিত পাঠক্রমে জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজকে ভিত্তি করে বিভিন্ন বিষয়ে পাঠদান করার কথা বলা হয় । এই প্রয়োজনীয় বিষয় হিসেবে তিনি একটি ‘ ক্লাফ’কে বেছে নেওয়ার কথা বলেছেন । ভাষা , ইতিহাস , ভূগোল , গণিত , সাধারণ জ্ঞান , সমাজবিদ্যা , কৃষিবিদ্যা সবই গৃহীত ‘ ক্রাফট্ ’ কে কেন্দ্র করেই রচিত হবে ।  

গান্ধীজী পাঠক্রম প্রণয়নে গ্রামীণ আর্থিক বিকাশের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন । এমনভাবে পাঠক্রম রচিত হবে যাতে গ্রামের এবং বিদ্যালয়ের আর্থিক বিকাশ সম্ভব হয় । শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার মধ্য দিয়ে এমন সব জিনিস উৎপাদন করবে যা বিক্রি করে শিক্ষার্থীরা তাদের পড়ার খরচ চালাতে পারবে । রবীন্দ্রনাথ তাঁর পাঠক্রম পরিকল্পনায় এই তাৎক্ষণিক আর্থিক উপার্জনের কথা বলেননি । কৃষি ও কুটির শিল্পের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে শিক্ষার্থী অর্থ উপার্জনে সক্ষম হবে এ কথাই তিনি বলেছেন । 

শিক্ষার মাধ্যম 

উভয় শিক্ষাবিদই মাতৃভাষা শিক্ষার মাধ্যমে হওয়া উচিত বলে মত পোষণ করেন । 

শিক্ষণ পদ্ধতি 

রবীন্দ্রনাথ বিশেষ কোনো একটি শিক্ষা পদ্ধতির কথা বলেননি । তাঁর মতে শিক্ষক যদি উৎসাহী এবং গুণ সম্পন্ন হন তবে প্রয়োজন মতো তিনি নিত্য নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করে শিক্ষা দিতে পারেন । রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা পদ্ধতির মূল কথা হল , শিশুকে স্বাধীনতা দিতে হবে , তাকে সব সময় বিধি নিষেধের গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখলে চলবে না । সক্রিয়তা রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা পদ্ধতির মূল কথা । ইতিহাস , ভূগোল , বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয় সক্রিয়তার মধ্য দিয়ে সহজে শেখানো যায় । তিনি আরও বলেন যে , প্রকৃতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রেখে শিক্ষা দিলে তা বেশি কার্যকরী হয় । তাই গাছে চড়া , ফুল-ফল পাড়া , বাগান পরিচর্যা , সাঁতার কাটা প্রভৃতি দেহ মন বিকাশের পদ্ধতি ।  

গান্ধীজী প্রচলিত পুস্তক কেন্দ্রিক শিক্ষণ পদ্ধতির কঠোর সমালোচনা করেছেন । ব্যক্তির দেহ , মন ও আত্মার বিকাশের জন্য তিনি একটি হস্তশিল্প ( ক্রাফ্‌ফ্ট ) এবং ওই হস্তশিল্পকে কেন্দ্র করে অনুবন্ধ প্রণালীতে শিক্ষাদানের কথা বলেছেন । অনুবন্ধ প্রণালীর মধ্য দিয়ে যে শুধু বিভিন্ন বিষয় ভিত্তিক জ্ঞানার্জন হবে তাই নয় , শিশুর চরিত্রও গঠিত হবে । তার অবসর বিনোদনের সুযোগ থাকবে । শিল্প শিক্ষার ভিতর দিয়ে শিশুদের মধ্যে আত্মসংযম , স্বাবলম্বিতা , সহযোগিতা , দায়িত্ববোধ প্রভৃতি গুণের বিকাশ ঘটবে ।  

গান্ধীজী তাঁর বুনিয়াদি শিক্ষায় কীভাবে অনুবন্ধ পদ্ধতিকে কাজে লাগানো যায় সে সম্পর্কে বিস্তারিত ভাবে বলেছেন । অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ তাঁর শান্তিনিকেতনের শিক্ষায় কী পদ্ধতি ব্যবহৃত হবে তার চয়নে শিক্ষককে অবাধ স্বাধীনতা দিয়েছেন । 

শৃঙ্খলা 

রবীন্দ্রনাথের মতে কঠোর শাসন ও নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে শিশুকে কাজের অবাধ স্বাধীনতা দিলে শৃঙ্খলা রক্ষার কোনো সমস্যা থাকবে না । উপরন্তু তার চিন্তা ও বিচার শক্তির উন্মেষ ঘটবে । শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে তিনি প্রকৃতিবাদের সমর্থক । 

শৃঙ্খলা আনার ক্ষেত্রে গান্ধীজী আত্মসংযমের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন । অর্থাৎ এ ব্যাপারে তিনি ভাববাদীদের সঙ্গে একমত । শিশু তার নিজস্ব আবেগে চালিত হোক , তা তিনি চাননি । তাঁর মতে আবেগ , কল্পনা , ইচ্ছাকে যদি যথাযথভাবে সংযত করা না যায় , তাহলে গঠনমূলক কাজ করা সম্ভব নয় । অবশ্য শৃঙ্খলাকে ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়ার কথা তিনি বলেননি । তিনি চেয়েছেন এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে যাতে শিশু স্বতঃস্ফূর্তভাবেই আত্মসংযমে ব্রতী হয় । 

শিক্ষক শিক্ষার্থী সম্পর্ক 

রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গিতে গুরু শিষ্যের সম্পর্ক হবে মধুর । এই প্রসঙ্গে তিনি ভারতের প্রাচীন শিক্ষা ব্যবস্থা ও গুরুকুলের কথা উল্লেখ করেছেন । শিক্ষক যেমন শিক্ষার্থীকে পুত্রের ন্যায় স্নেহ করবেন , শিক্ষার্থীও তেমনি শিক্ষককে পিতার ন্যায় শ্রদ্ধা করবে । গান্ধীজীও শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে মধুর সম্পর্কের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন । তবে শিক্ষার্থীরা যাতে কঠোর পরিশ্রম করে সে ব্যাপারে শিক্ষক বিশেষ নজর দেবেন , প্রয়োজন হলে শাস্তির ব্যবস্থা করবেন ।

error: Content is protected !!