গান্ধীজীর বুনিয়াদি শিক্ষা

গান্ধীজীর বুনিয়াদি শিক্ষা

ভারতবর্ষের ইতিহাসে একজন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ হিসেবে মহাত্মা গান্ধী অধিক পরিচিত হলেও একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ হিসেবেও তাঁর অবদান অসামান্য । তিনি শিক্ষাক্ষেত্রে একটি গতিশীল দার্শনিক চিন্তার পথ  প্রদর্শক ছিলেন । তাঁর শিক্ষা দর্শন , শিক্ষা চিন্তা এবং শিক্ষা সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে এখানে আলোচনা করা হল : 

শিক্ষার সংজ্ঞা 

গান্ধীজি শিক্ষার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন “ By education I mean an all round drawing out of the best in child and man body , mind and spirit ” অর্থাৎ শিক্ষা বলতে আমি বুঝি শিশু ও ব্যক্তির সর্বোত্তম দিকগুলির , যথা— দেহ , মন ও আত্মার পরিপূর্ণ বিকাশ সাধন । গান্ধীজির মতে প্রকৃত শিক্ষা বলা হবে তাকেই যা শিক্ষার্থীর বৌদ্ধিক এবং দৈহিক বিকাশ ঘটায় এবং তাকে উদ্দীপিত করে ।

শিক্ষা দর্শন 

গান্ধীজি শিক্ষাকে ভবিষ্যৎ জীবনের প্রস্তুতি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন । বিশেষ করে ভারতবর্ষে যেসব মানুষ যুগ যুগ ধরে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে এসেছে , তাদের কাছে প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ পৌঁছে দেওয়া এবং শিক্ষার মাধ্যমে তাদের অধিকাংশকে জীবিকা অর্জনের উপযোগী করে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি বলেছেন ।  

গান্ধীজি ছিলেন সর্বোদয় সমাজ দর্শনে বিশ্বাসী । তিনি এমন এক সমাজের স্বপ্ন দেখতেন যেখানে কোনো বিভেদ থাকবে না । সকলেই সমানভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাবে । তাঁর শিক্ষা দর্শনের মূল কথা হল আত্মোপলব্ধি ও সত্যাচার । তাঁর শিক্ষা দর্শনে ভাববাদ , প্রকৃতিবাদ ও প্রয়োগবাদের সমন্বয় পরিলক্ষিত হয় ।

শিক্ষা চিন্তার প্রয়োগ 

গান্ধীজি তাঁর শিক্ষা পরিকল্পনা রচনা করেছিলেন তৎকালীন সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে । গান্ধীজির এই শিক্ষা পরিকল্পনা বুনিয়াদি শিক্ষা পরিকল্পনা নামে পরিচিত । অনেকে এই শিক্ষা পরিকল্পনাকে গুজরাটের ওয়ার্ধা পরিকল্পনাও বলে থাকেন । কারণ ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে ওয়ার্ধা নামক স্থানে গান্ধীজির এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করার জন্য একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় । এই শিক্ষার নাম পরবর্তীকালে ‘ নঈ তালিম ‘ রাখা হয় । গান্ধীজি প্রবর্তিত নঈ তালিম শিক্ষা পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল – 

( i ) সাত থেকে চোদ্দো বছর বয়সের ছেলে মেয়েদের জন্য এই শিক্ষাক্রম হবে অবৈতনিক এবং বাধ্যতামূলক । 

( ii ) কোনো একটি শিল্পকে কেন্দ্র করে এই শিক্ষা গড়ে উঠবে । 

( iii ) এই শিক্ষা হবে উৎপাদনমুখী । 

( iv ) এই শিক্ষাটি গ্রামীণ জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে । 

( v ) শিক্ষার্থীদের উৎপাদিত সামগ্রী বিক্রি করে শিক্ষার ব্যয় নির্বাহ হবে । অর্থাৎ এটি হবে স্বয়ংনির্ভর । 

( vi ) এই শিক্ষা ব্যবস্থাটি শিক্ষার্থীর জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত হবে । 

( vii ) মাতৃভাষার মাধ্যমে এই শিক্ষা দেওয়া হবে । 

নঈ তালিম শিক্ষার চারটি স্তর হল – 

( i ) প্রাক বুনিয়াদি — এই স্তরে ৭ বছরের থেকে কম বয়সি শিশুরা শিক্ষা লাভ করবে । 

( ii ) বুনিয়াদি — এই স্তরে ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সি ছেলেমেয়েরা শিক্ষা লাভ করবে । 

( iii ) উত্তর বুনিয়াদি — এই স্তরে ১৪ বছরের চেয়ে বেশি বয়সি ছেলেমেয়েরা শিক্ষা লাভ করবে , এবং 

( iv ) প্রাপ্ত বয়স্ক — এই স্তরে প্রাপ্ত বয়স্ক শিক্ষার্থীরা শিক্ষা লাভ করবে । 

পাঠক্রম 

বুনিয়াদি বা নঈ তালিম শিক্ষার পাঠক্রমে যেসব বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয় , সেগুলি হল – 

( i ) শিল্প শিক্ষা— সুতোকাটা ও তাঁতের কাজ , কৃষিকাজ , কাঠের কাজ , চামড়ার কাজ প্রভৃতির মধ্য থেকে একটি শিল্প বেছে নিতে হয় । 

( ii ) গণিত – দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় গণিতের জ্ঞান অর্জন করতে হবে । 

( iii ) সমাজ শিক্ষা – ইতিহাস এবং ভূগোলের পাঠ দেওয়া হয় । 

( iv ) সাধারণ বিজ্ঞান — উদ্ভিদবিদ্যা , প্রাণীবিদ্যা , শারীরবিদ্যা , প্রকৃতি পাঠ , বিজ্ঞানীদের জীবনী পাঠ প্রভৃতি বিষয়ে পঠন পাঠনের ব্যবস্থা থাকে । 

( v ) এ ছাড়া চিত্রাঙ্কন , সংগীত , ব্যায়াম এবং হিন্দি ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয় । এগুলি ছাড়াও নঈ তালিম শিক্ষার পাঠক্রমের মাধ্যমে গুরুজনকে ভক্তি করা , সত্য কথা বলা , সরল নৈতিক জীবন যাপন করা , সমবেত প্রার্থনা করা , ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং সুষ্ঠু সামাজিক জীবন যাপনের শিক্ষা দানের ব্যবস্থা করা হয় । 

শিক্ষাদান পদ্ধতি 

গান্ধীজির নঈ তালিম বা বুনিয়াদি শিক্ষা ব্যবস্থায় অনুবন্ধ নীতি অনুসরণ করে পাঠদানের ব্যবস্থা করা হয় । এই ধরনের পাঠদানের মূলকথা হল একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে অন্যান্য বিষয়ের শিক্ষা । নঈ তালিম -এ হস্তশিল্পকে কেন্দ্র করে ইতিহাস , ভূগোল , গণিত , উদ্ভিদবিদ্যা ইত্যাদি পাঠের ব্যবস্থা করা হয় । মাতৃভাষা হবে শিক্ষার মাধ্যম । 

শৃঙ্খলা 

গান্ধীজি আত্মসংযমের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন । শিশুরা নিজের ইচ্ছানুযায়ী চলবে এটা তিনি চাননি । কোন্‌টা করা উচিত , কোন্‌টা করা উচিত নয় শিক্ষক তা শিক্ষার্থীদের বোঝাবেন । শিক্ষার্থীরা তা অনুসরণ করবে । এর অর্থ এই নয় যে , শৃঙ্খলা ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হবে । গান্ধীজির মত হল , শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্ত শৃঙ্খলার পথই অনুসরণ করবে , তবে তা হবে শিক্ষকদের তদারকিতে ।

বুনিয়াদি শিক্ষা বা নঈ তালিম শিক্ষা গ্রাম অধ্যুষিত ও অর্থনৈতিক দিক থেকে দুর্বল ভারতবর্ষের পক্ষে যথার্থ ছিল । যে ব্যাবহারিক শিক্ষার অভাবে আজও আমাদের শিক্ষা পুথি সর্বস্ব , তার পরিবর্তনে বুনিয়াদি শিক্ষাই ছিল উপযুক্ত । কিন্তু সেই সময়ে শিক্ষাক্ষেত্রে যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাঁরা বুনিয়াদি শিক্ষাকে সঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারেননি । সম্ভবত নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনে যে সৃষ্টিশীলতা আনা প্রয়োজন , দৃষ্টিভঙ্গির যে পরিবর্তনের প্রয়োজন তা তাঁদের ছিল না । তাই ভারতবর্ষের পক্ষে অত্যন্ত উপযোগী ও সম্ভাবনাময় দেশীয় সংস্কৃতি থেকে জাত এই শিক্ষা ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়ে যায় ।

error: Content is protected !!