রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষা চিন্তা ও শান্তিনিকেতন ভাবনা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষা চিন্তা ও শান্তিনিকেতন ভাবনা

শিক্ষা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলতেন –‘শিক্ষা হল ব্যক্তিজীবনের পরিপূর্ণ বিকাশ সাধন , এককথায় মনুষ্যত্বের বিকাশ সাধন । ‘ তাই , শিক্ষার তাত্ত্বিক এবং ব্যাবহারিক উভয় দিক সম্পর্কেই রবীন্দ্রনাথ সমান যত্নশীল ছিলেন । শিক্ষার তত্ত্বগত দিকগুলির বাস্তব রূপায়ণের জন্য তিনি শান্তিনিকেতনের ছায়াস্নিগ্ধ পরিবেশে পল্লি  প্রকৃতির কোলে ব্রম্ভচর্যাশ্রম নামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । তিনি বুঝেছিলেন যে , ইংরেজ প্রবর্তিত শিক্ষা ব্যবস্থায় মানুষের চারিত্রিক বলিষ্ঠতা , চিত্তের প্রসারতা এবং মনের সার্বিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে । 

তাই তিনি তৎকালীন শিক্ষা ব্যবস্থার সমালোচনা করে লিখেছেন , “ এই বৃহৎ বিদ্যার কল , কেরাণীগিরির কল হইয়া উঠিতেছে । মানুষ এখানে নোটের নুড়ি কুড়াইয়া ডিগ্রীর বস্তা বোঝাই করিয়া তুলিতেছে । কিন্তু তাহা জীবনের খাদ্য নহে । তার গৌরব কেবল বোঝাইয়ের গৌরব , তাহা প্রাণের গৌরব নহে ” । রবীন্দ্রনাথ আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে জাতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন । 

রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শের মূল কথা হল মানবপ্রেম , সৌন্দর্যানুভূতি , স্বাধীনতা এবং প্রকৃতি । তাই তিনি বিদ্যালয়ের ক্ষুদ্র গণ্ডি থেকে ছেলেমেয়েদের মুক্তি দেওয়ার জন্য শান্তিনিকেতনের উন্মুক্ত প্রান্তরে পল্লি প্রকৃতির কোলে বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন । তিনি ছেলেমেয়েদের মনের সঙ্গে বিশ্বপ্রকৃতির একটা নিবিড় যোগাযোগ স্থাপন করতে চেয়েছিলেন । এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য ছিল— “ প্রকৃতির ক্লোড়ে জন্মে যদি প্রকৃতির শিক্ষা থেকে দূরে সরে থাকি , তাহলে শিক্ষা কখনও সার্থক হতে পারে না । ‘ 

তত্ত্বগত দিক থেকে রবীন্দ্রনাথ শিক্ষার বিভিন্ন দিককে কীভাবে ব্যাখ্যা করেছেন তা নীচে আলোচনা করা হল : 

শিক্ষার লক্ষ্য 

রবীন্দ্রনাথের মতে শিক্ষার লক্ষ্য হল – 

[ i ] শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্বের পরিপূর্ণ বিকাশ সাধন । 

[ ii ] প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিটি শিক্ষার্থীর সম্পর্ক স্থাপন । 

[ iii ] শিক্ষার্থীর মধ্যে সৌন্দর্যবোধের বিকাশ ঘটানো । 

[ iv ] শিক্ষার্থীকে চিরন্তন পরমসত্তার উপলব্ধিতে সহায়তা করা । 

পাঠক্রম 

রবীন্দ্রনাথের মতে , পাঠক্রম হবে সংস্কৃতির ধারক ও বাহক । তাই তিনি পাঠক্রমের মধ্যে ভাষা , সাহিত্য , দর্শন , বিজ্ঞান , শিল্পকলা , সংগীত প্রভৃতিকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেছেন । তাঁর পাঠক্রমে স্বদেশের ইতিহাস একটি বড়ো স্থান অধিকার করেছে । পাঠক্রমে শিল্পকলা , নৃত্যকলা ইত্যাদির পাশাপাশি পাশ্চাত্য বিজ্ঞান শিক্ষাকেও উপেক্ষা করা হয়নি । এককথায় প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য যা যা প্রয়োজন তার সব কিছুই পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছেন তিনি । 

শিক্ষণ পদ্ধতি 

রবীন্দ্রনাথ পাঠদানের ক্ষেত্রে ভ্রমণ , প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ , গল্পের ছলে পাঠদান এবং প্রত্যক্ষ কাজের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দেওয়ার কথা বলেন । 

শিক্ষক শিক্ষার্থী সম্পর্ক 

রবীন্দ্রনাথের মতে শিক্ষক হবেন একজন প্রাণবন্ত মানুষ । শিশুর মতো সারল্য নিয়ে তিনি শিক্ষার্থীদের মনোরাজ্যে বিচরণ করবেন । শিক্ষক যেমন শিক্ষার্থীকে স্নেহ করবেন এবং যত্ন সহকারে পাঠদান করবেন , শিক্ষার্থীরাও শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে । এককথায় একটি আনন্দময় পরিবেশে পারস্পরিক মত বিনিময়ের মধ্য দিয়ে শিক্ষার কাজ এগিয়ে চলবে । 

শিক্ষার মাধ্যম 

রবীন্দ্রনাথ শিক্ষায় মাতৃভাষাকে মাতৃদুগ্ধের সঙ্গে তুলনা করেছেন । তিনি শান্তিনিকেতনে শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করেন । 

শৃঙ্খলা 

রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন ‘ শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতা দিলে তারা আপনা থেকেই শৃঙ্খলিত হয়ে পড়বে । তবে এ কথাও ঠিক স্বাধীনতা কখনোই স্বেচ্ছাচারে পরিণত হবে না । 

জনশিক্ষা 

জনশিক্ষা বিকাশের জন্য রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনের কাছে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে সুরুল গ্রামে শ্রীনিকেতন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে পল্লি উন্নয়নের কাজ শুরু করেছিলেন । গ্রামোন্নয়ন বিষয়টিকে রবীন্দ্রনাথ তাঁর শিক্ষা পরিকল্পনার মধ্যে রেখেছিলেন । শান্তিনিকেতনে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষাদানের মূল উদ্দেশ্য ছিল সেই অঞ্চলের নিকটবর্তী গ্রামবাসীর কাছে শিক্ষার সুফল পৌঁছে দেওয়া । রবীন্দ্রনাথ ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে শান্তিনিকেতনের কাছে শ্রীনিকেতনে শিক্ষাসূত্র নামে একটি গ্রামীণ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন । 

ব্যাবহারিক দিক থেকে শিক্ষার উন্নয়নের জন্য কর্মমুখী শিক্ষা , গ্রামোন্নয়ন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি । তিনি গ্রামীণ বিদ্যালয়ের পাঠক্রমে কৃষি , পশুপালন , হস্তশিল্প , কুটির শিল্প , বিভিন্ন প্রকার দ্রব্য সামগ্রীর উৎপাদন প্রভৃতিকে অন্তর্ভুক্ত করেন । তিনি হাতে কলমে শিক্ষাদানের বিষয়টিকে শ্রীনিকেতনের শিক্ষায় প্রাধান্য দিয়েছিলেন । 

তিনি বুঝেছিলেন যে , অর্থনৈতিক বিকাশ না ঘটলে , শুধু বৌদ্ধিক বিকাশের দ্বারা মানুষের মঙ্গল সম্ভব নয় । তাই তিনি সংস্কৃতির চর্চার সঙ্গে শ্রীনিকেতনে কর্মকেন্দ্রিক শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন । তিনি উপলব্ধি করেছিলেন , শিক্ষার ক্ষেত্রে তত্ত্বগত এবং ব্যাবহারিক উভয় দিকের প্রয়োজন রয়েছে । 

ওপরের আলোচনা থেকে বলা যায় , কবিগুরু তাঁর শিক্ষা চিন্তা বা শিক্ষাদর্শ শুধু তাত্ত্বিক দিক থেকেই আলোচনা করেননি , তার ব্যাবহারিক রূপও আমাদের কাছে তুলে ধরেছেন । তাই রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা চিন্তা সর্বাঙ্গ সুন্দর বললে অতিশয়োক্তি হয় না ।

error: Content is protected !!