জেলা পরিষদের গঠন ক্ষমতা ও কার্যাবলী 

জেলা পরিষদের গঠন ক্ষমতা ও কার্যাবলী 

পশ্চিমবঙ্গের জেলা পরিষদের গঠন 

পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার তৃতীয় এবং শীর্ষ স্তরে রয়েছে জেলা পরিষদ । রাজ্য সরকার প্রতিটি জেলার নাম অনুসারে একটি করে জেলা পরিষদ গঠন করে । 

জেলা পরিষদের সদস্য পদ :

যেসব সদস্য নিয়ে জেলা পরিষদ গঠিত হয় তাঁরা হলেন— 

1. পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতিবৃন্দ ( পদাধিকারবলে ) , 

2. জেলা থেকে নির্বাচিত লোকসভা এবং বিধানসভার সদস্যরা , 

3. জেলায় বসবাসকারী রাজ্যসভার সদস্যরা , 

4. প্রতিটি ব্লক থেকে সার্বিক প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচিত সদস্য । এ ছাড়া জেলাশাসক পদাধিকারবলে জেলা পরিষদের সহযোগী সদস্য হিসেবে গণ্য হন । ১৯৯২ সালের সংশোধিত পঞ্চায়েত আইন অনুযায়ী জেলা পরিষদের মোট আসনের এক-তৃতীয়াংশ মহিলাদের জন্য এবং জনসংখ্যার আনুপাতিক হারের ভিত্তিতে তপশিলি জাতি ও উপজাতিদের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন সংরক্ষিত রয়েছে । জেলা পরিষদের কার্যকালের মেয়াদ পাঁচ বছর ।

জেলা পরিষদের সভাপতি ও সহসভাপতি :

নব গঠিত জেলা পরিষদের প্রথম সভায় জেলা পরিষদের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে থেকে একজন সভাধিপতি এবং একজন সহসভাধিপতি নির্বাচন করেন । পদাধিকারবলে যাঁরা জেলা পরিষদের সদস্য , তাঁরা এ দুটি পদে নির্বাচিত হতে পারেন না । সভাধিপতি এবং সহসভাধিপতির কার্যকালের মেয়াদ পাঁচ বছর । 

সভাধিপতি হলেন জেলা পরিষদের প্রশাসনিক কর্তা । জেলা পরিষদের কার্যাবলি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য একজন কার্যনির্বাহী আধিকারিক বা জেলাশাসক রয়েছেন । তাঁকে সহায়তা করার জন্য প্রত্যেক জেলা পরিষদে একজন অতিরিক্ত কার্যনির্বাহী আধিকারিক বা অতিরিক্ত জেলাশাসক থাকেন । জেলাশাসক ও অতিরিক্ত জেলাশাসক পদমর্যাদার এই আধিকারিকরা সর্বভারতীয় প্রশাসন বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মচারী ( IAS Officer ) । এ ছাড়া রাজ্য সরকার কর্তৃক নিযুক্ত জেলা পরিষদের একজন কর্মসচিব রয়েছেন । রাজ্য সরকারের আগাম অনুমতি নিয়ে জেলা পরিষদ প্রয়োজনমতো অন্য কর্মচারীদের নিয়োগ করতে পারে । 

জেলা পরিষদের স্থায়ী সমিতি :

জেলা পরিষদের স্থায়ী সমিতির সংখ্যা 10 টি । সমিতিগুলি হল ー i. অর্থ , উন্নয়ন ও পরিকল্পনা ; ii. জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ ; iii. পূর্ত ও পরিবহণ ; iv. কৃষি , সেচ ও সমবায় ; v. শিক্ষা-সংস্কৃতি , তথ্য ও ক্রীড়া ; vi. ক্ষুদ্র শিল্প ও ত্রাণ ; vii. বন ও ভূমি সংস্কার ; viii. মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ বিকাশ ; ix. খাদ্য ও খাদ্য সরবরাহ ; x. বিদ্যুৎ ও অচিরাচরিত শক্তি । 

জেলা পরিষদের সভাধিপতি ও সহসভাধিপতি ( পদধিকারবলে ) , জেলা পরিষদের সদস্যদের মধ্যে থেকে নির্বাচিত অনধিক ৫ জন এবং রাজ্য সরকার কর্তৃক নিযুক্ত আধিকারিক ও বিশেষজ্ঞগণকে ( প্রয়োজন অনুসারে ) নিয়ে স্থায়ী সমিতিগুলি গঠিত হয় । জেলা পরিষদের সচিব পদাধিকারবলে প্রত্যেক স্থায়ী সমিতির সচিব । এ ছাড়া প্রতিটি স্থায়ী সমিতির সদস্যরা নিজেদের মধ্যে থেকে একজনকে ‘ কর্মাধ্যক্ষ ‘ হিসেবে নির্বাচন করেন । 

জেলা পরিষদের সমন্বয় সমিতি :

প্রতিটি জেলা পরিষদে স্থায়ী সমিতিগুলির কাজকর্মের সমন্বয় সাধনের জন্য একটি করে সমন্বয় সমিতি রয়েছে । সভাধিপতি , সহসভাধিপতি , স্থায়ী সমিতিগুলির কর্মাধ্যক্ষবৃন্দ , জেলা পরিষদের কার্যনির্বাহী আধিকারিক ও অতিরিক্ত কার্যনির্বাহী আধিকারিককে নিয়ে সমন্বয় সমিতি গঠিত হয় । 

জেলা সংসদ :

জেলার উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ , বাজেট , উন্নয়ন কর্মসূচি রূপায়ণ ইত্যাদি বিষয়ে জেলা পরিষদকে নির্দেশ ও পরামর্শ দেওয়ার জন্য প্রতিটি জেলা পরিষদে একটি করে জেলা সংসদ গঠনের কথা বলা হয়েছে । জেলার সমস্ত গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধানরা , পঞ্চায়েত সমিতিগুলির সভাপতি ও সহসভাপতি , পঞ্চায়েত সমিতিগুলির কর্মাধ্যক্ষ এবং জেলা পরিষদের সব সদস্য জেলা সংসদের সদস্য হিসেবে গণ্য হন । 

পশ্চিমবঙ্গের জেলা পরিষদের ক্ষমতা ও কার্যাবলী 

জেলা পরিষদের ক্ষমতা ও কার্যাবলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল— 

1. কৃষি ও পশুপালন , কুটির শিল্প , সমবায় আন্দোলন , গ্রামীণ ঋণ ব্যবস্থা , জল সরবরাহ , সেচ , জনস্বাস্থ্য , হাসপাতাল , যোগাযোগ ব্যবস্থা , প্রাথমিক ও বয়স্ক শিক্ষা , সামাজিক কল্যাণ ইত্যাদি বিষয়ে উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন । 

2. রাজ্য সরকার কর্তৃক ন্যস্ত যে কোনো প্রকল্প নির্বাহ বা কর্তব্য সম্পাদন অথবা যে কোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব অর্পিত হলে সেই দায়িত্ব পালন । 

3. গ্রামীণ হাট বাজার রক্ষণাবেক্ষণ , সাধারণ পাঠাগার , বিদ্যালয় ও অন্যান্য জনকল্যাণ সংস্থাকে অনুদান প্রদান , বৃত্তিমূলক শিক্ষার জন্য বৃত্তি প্রদান , গ্রাম পঞ্চায়েত ও পঞ্চায়েত সমিতিকে অনুদান প্রদান । 

4. জল সরবরাহ , মহামারি প্রতিরোধ , আর্তদের জন্য ত্রাণের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি । 

5. রাজ্য সরকারের মালিকানাধীন বা নিয়ন্ত্রণাধীন রাস্তাঘাট , খাল , সেতু , খেয়াঘাট , ঘরবাড়ি বা অন্যান্য সম্পত্তির পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ । 

6. পঞ্চায়েত সমিতির বাজেট পরীক্ষা ও অনুমোদন এবং প্রয়োজনে পার্শ্ববর্তী জেলা পরিষদের সঙ্গে যৌথভাবে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা রূপায়ণের ব্যবস্থা গ্রহণ । 

7. গ্রাম পঞ্চায়েত ও পঞ্চায়েত সমিতির কাজকর্মের তদারকি , নজরদারি ও প্রয়োজন মতো নিয়ন্ত্রণ । 

গ্রামীণ স্বায়ত্তশাসনের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানরূপে সমগ্র জেলার সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের দায়িত্ব জেলা পরিষদের । জেলার সার্বিক উন্নয়নের দায়িত্ব জেলা পরিষদের সদস্যদের হাতে অর্পিত হয়েছে ।

error: Content is protected !!