গ্রাম পঞ্চায়েতের গঠন ক্ষমতা ও কার্যাবলী

গ্রাম পঞ্চায়েতের গঠন ক্ষমতা ও কার্যাবলী

পশ্চিমবঙ্গের গ্রাম পঞ্চায়েতের গঠন 

পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত আইন অনুযায়ী , রাজ্যে ত্রিস্তর পঞ্চায়েত ব্যবস্থা চালু রয়েছে — জেলা পর্যায়ে জেলা পরিষদ , ব্লক স্তরে পঞ্চায়েত সমিতি এবং গ্রাম স্তরে গ্রাম পঞ্চায়েত । সাধারণত কমপক্ষে পাঁচ থেকে অনধিক তিরিশ জন সদস্য নিয়ে গ্রাম পঞ্চায়েত গঠিত হয় । সার্বিক প্রাপ্ত বয়স্কের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্যরা নির্বাচিত হন । এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট পঞ্চায়েত সমিতির সদস্যরা ( সভাপতি ও সহসভাপতি পদে ) গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্য হিসেবে গণ্য হন । 

১৯৯২ সালের পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত ( সংশোধনী ) আইন অনুসারে বর্তমানে প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েতে মোট জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে তপশিলি জাতি ও উপজাতিদের জন্য আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে । ওইসব সংরক্ষিত আসনের মধ্যে অন্তত এক- তৃতীয়াংশ তপশিলি জাতি ও উপজাতির মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকে । 

এ ছাড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের মোট আসন সংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ ( তপশিলি জাতি ও উপজাতির মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসন সহ ) সমস্ত শ্রেণির মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে । গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্যদের কার্যকালের মেয়াদ পাঁচ বছর । গ্রাম পঞ্চায়েতের সঙ্গে গ্রাম সংসদ , গ্রাম সভা ও গ্রাম উন্নয়ন কমিটি যুক্ত রয়েছে । 

প্রধান ও উপপ্রধান নির্বাচন :

নির্বাচনের পর প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রথম সভা আহ্বান করেন ব্লক উন্নয়ন আধিকারিক বা বিডিও । এই সভায় গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে থেকে একজন প্রধান এবং অন্য একজন উপপ্রধান নির্বাচন করেন । গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রশাসনিক দায়িত্ব প্রধানের ওপর ন্যস্ত । তাঁর অনুপস্থিতিতে উপপ্রধান পঞ্চায়েত প্রশাসনের কাজকর্ম পরিচালনা করেন । প্রত্যেক মাসে অন্তত একবার গ্রাম পঞ্চায়েতের সভা আহ্বান করা হয় । গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রতিটি সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান । তাঁর অনুপস্থিতিতে উপপ্রধান সভা পরিচালনা করেন ।

গ্রাম সংসদ :

১৯৯৪ সালের পঞ্চায়েত ( সংশোধনী ) আইন অনুসারে , প্রত্যেক গ্রাম পঞ্চায়েতের নির্বাচন কেন্দ্রের সব ভোটার নিয়ে একটি গ্রাম সংসদ গঠনের কথা বলা হয়েছে । গ্রাম পঞ্চায়েতের নির্বাচন স্থান , তারিখ ও সময় অনুযায়ী বছরে কমপক্ষে দুবার ( মে এবং নভেম্বর মাসে ) প্রধান বা উপপ্রধানের সভাপতিত্বে গ্রাম সংসদের সভা অনুষ্ঠিত হয় । গ্রাম সংসদের গৃহীত প্রস্তাবগুলি গ্রাম পঞ্চায়েত যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে । গ্রাম সভা প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় সব ভোটার নিয়ে গ্রাম সভা গঠিত হয় । প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসে এর বার্ষিক সভা আহ্বান করা হয় । 

প্রধান বা তার অনুপস্থিতিতে উপপ্রধান এই সভায় সভাপতিত্ব করেন । গ্রাম পঞ্চায়েতের বাজেট , বার্ষিক পরিকল্পনা , সর্বশেষ অডিট , গ্রাম পঞ্চায়েতের বিগত বছরের আয় ব্যয়ের হিসাব , কাজ কর্মের বিবরণ ইত্যাদি নিয়ে গ্রাম সভায় পর্যালোচনা করা হয় । এ ছাড়া গ্রাম সংসদের গৃহীত সিদ্ধান্তগুলি নিয়েও গ্রাম সভা বিচার বিবেচনা করে থাকে । 

গ্রাম উন্নয়ন কমিটি :

পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত আইন সংশোধনী ( ২০০৩ খ্রি. ) অনুসারে প্রতিটি গ্রাম সংসদ এলাকায় ‘ গ্রাম উন্নয়ন কমিটি ‘ নামে একটি সংস্থা গঠনের কথা বলা হয়েছে । এই কমিটির অধীনে কয়েকটি উপ কমিটি গঠন করার কথাও বলা হয়েছে । 

পশ্চিমবঙ্গের গ্রাম পঞ্চায়েতের ক্ষমতা ও কার্যাবলী 

গ্রাম পঞ্চায়েতের ক্ষমতা ও কার্যাবলী তিন ভাগে বিভক্ত – 1. বাধ্যতামূলক , 2. অর্পিত এবং 3. স্বেচ্ছামূলক কার্যাবলী । 

বাধ্যতামূলক কার্যাবলী : 

গ্রাম পঞ্চায়েতের বাধ্যতামূলক কাজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল— 

i. পানীয় জল সরবরাহ , 

ii. পথঘাট তৈরি ও সংস্কার , 

iii. মহামারি প্রতিরোধ , 

iv. জলনিকাশি ব্যবস্থা , 

v. জলপথ রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদি । 

অর্পিত কার্যাবলী : 

রাজ্য সরকারের দেওয়া দায়িত্বগুলির পালন গ্রাম পঞ্চায়েতের অর্পিত কার্যাবলীর অন্তর্গত । গ্রাম পঞ্চায়েতের অর্পিত কাজগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- 

i. সেচ , 

ii. ভূমি সংস্কার , 

iii. কুটির শিল্প  

iv. প্রাথমিক , সামাজিক , প্রযুক্তিগত , বৃত্তি মূলক , বয়স্ক এবং প্রথা বহির্ভূত শিক্ষা দান ,  

v. জমির পুনরুদ্ধার ,  

vi. মহিলা ও শিশু কল্যাণ , 

vii. দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদি । 

স্বেচ্ছাধীন কার্যাবলী : 

গ্রাম পঞ্চায়েতের স্বেচ্ছাধীন কাজগুলি হল – 

i. হাট বাজার স্থাপন , 

ii. নলকূপ খনন ও মেরামতি , 

iii. রাস্তাঘাট আলোকিতকরণ , 

iv. পাঠাগার প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি । 

অন্যান্য কাজ :

উল্লিখিত বিষয়গুলি ছাড়া গ্রাম পঞ্চায়েত কয়েকটি ক্ষেত্রে বিশেষ দায়িত্ব পালন করতে পারে । জনকল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে একাধিক গ্রাম পঞ্চায়েত যুক্ত হয়ে কমিটি গঠন করে প্রয়োজনীয় নিয়মকানুন তৈরি করতে পারে । জেলা পরিষদ কোনো কাজের দায়িত্ব দিলে গ্রাম পঞ্চায়েত তা পালন করতে পারে । রাজ্য সরকার কোনো সরকারি ভূসম্পত্তি পরিচালনার দায়িত্ব দিলে গ্রাম পঞ্চায়েত তা পালন করতে পারে ইত্যাদি ।

error: Content is protected !!