রাজ্যের মুখ্য সচিবের ক্ষমতা ও কার্যাবলী

রাজ্যের মুখ্য সচিবের ক্ষমতা ও কার্যাবলী

রাজ্য সচিবালয়ের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে রাজ্যের মুখ্য সচিবের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে । রাজ্যের সচিবালয়ের তিনি প্রধান পরিচালক । রাজ্যের এরকম একজন মুখ্য সচিব রাজ্য প্রশাসনের বিভাগীয় প্রধান । রাজ্য সচিবালয়ের মুখ্য সচিবকে মনোনীত করেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী । 

অবশ্য এসম্পর্কে কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য ক্যাবিনেটের সদস্যদের সঙ্গে তিনি পরামর্শ করতে পারেন । তবে এইরূপ পরামর্শ গ্রহণে তিনি বাধ্য নন । সাধারণভাবে এ কথা বলা যায় যে , মুখ্য সচিব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত । 

প্রসঙ্গত বলা যায় , বর্তমানে সব রাজ্যে মুখ্য সচিবদের ভারতীয় জনপালন কৃত্যকের ( IAS ) সদস্যদের মধ্য থেকে নিয়োগ করা হয় । মুখ্য সচিব কেন্দ্রীয় সরকারের সচিবের সমান পদ মর্যাদা লাভ করে থাকেন ।

মুখ্যমন্ত্রীর প্রধান পরামর্শদাতা 

রাজ্য সচিবালয়ের মুখ্যসচিব রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর প্রধান পরামর্শ দাতারূপে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন । রাজ্য প্রশাসনের যে কোনো নীতি সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মুখ্যমন্ত্রী প্রথা অনুসারে মুখ্য সচিবের সঙ্গে পরামর্শ করে থাকেন । 

মন্ত্রী পরিষদের সচিব 

মুখ্য সচিব রাজ্য ক্যাবিনেটের তথা মন্ত্রীসভার সচিব হিসেবে কাজ করেন । মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ ক্রমে মন্ত্রীসভার বৈঠকের জন্য আলোচ্য বিষয় সূচি প্রস্তুত করা , সভার কার্য বিবরণী নথিভুক্ত করা , ক্যাবিনেটে সাব কমিটিগুলিকে সাহায্য করা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব মুখ্য সচিব পালন করে থাকেন । 

সচিবালয়ের সামগ্রিক তত্ত্বাবধায়ক 

রাজ্যের সমগ্র সচিবালয়ের সাধারণ তত্ত্বাবধান , নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার দায়িত্ব রাজ্যের মুখ্য সচিবের । উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মীদের বদলি ইত্যাদি বিষয়েও তাঁর কার্যকরী ভূমিকা লক্ষ করা যায় । এ ছাড়া কেন্দ্রীয় নথি সংরক্ষণ শাখার কর্মী , সচিবালয়ের গ্রন্থাগারের কর্মী , সচিবালয়ের নিরাপত্তা বিভাগের কর্মী ও অন্যসব শ্রেণির কর্মীর ওপর মুখ্য সচিবের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা রয়েছে । 

রাজ্য প্রশাসনের প্রধান সমন্বয়কারী 

রাজ্যের শাসন বিভাগীয় নীতি ও সরকারি পরিকল্পনাগুলির মধ্যে সমন্বয় সাধন করার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব মুখ্য সচিবের ওপর ন্যস্ত হয়েছে । রাজ্য সরকারের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন । সচিবালয়ের সমস্ত সচিবের প্রধান রূপে মুখ্য সচিবকে বিভাগীয় কমিটিগুলির সভায় সভাপতিত্ব করতে হয় । 

প্রশাসনিক সমন্বয়কারী রূপে মুখ্য সচিবের হাতে যেসব দায়িত্ব রয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয় , আন্তঃরাজ্য সমন্বয় , সচিবালয়ের বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বয় , রাষ্ট্রকৃত্যক আধিকারিক ও মন্ত্রীদের মধ্যে সমন্বয় ইত্যাদি । 

রাজ্য রাষ্ট্র কৃত্যকের প্রধান 

রাজ্য রাষ্ট্রকৃত্যকের প্রধান হিসেবে মুখ্য সচিবের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে । প্রশাসনিক সংস্কার মতে রাজ্যের সচিবালয়ের সচিবরা , সংশ্লিষ্ট রাজ্যের সর্বভারতীয় কৃত্যকের আধিকারিকরা ( IAS ) , রাজ্য রাষ্ট্রকৃত্যকের আধিকারিকরা ও অন্যান্য সরকারি কর্মীরা মুখ্যসচিবকে তাঁদের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে গণ্য করেন । ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন কাঠামোয় আঞ্চলিক পরিষদের সচিব হিসেবে পর্যায়ক্রমে কাজ করার দায়িত্ব মুখ্য সচিবকে দেওয়া হয়েছে ।

জরুরিকালীন অবস্থায় প্রশাসনের পরিচালক 

রাজ্যের জরুরিকালীন অবস্থায় বা ৩৫৬ ধারা অনুসারে শাসনতান্ত্রিক অচলাবস্থা জনিত পরিস্থিতিতে মুখ্য সচিবের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে । রাজ্যপাল যখন রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি রূপে রাজ্য শাসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখন রাজ্য প্রশাসনের যাবতীয় কাজকর্ম মুখ্য সচিবের নির্দেশে পরিচালিত হয় । বন্যা , খরা , দুর্ভিক্ষ বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে অথবা কোনো সংকটকালীন পরিস্থিতিতে সমগ্র রাজ্য প্রশাসনকে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করার দায়িত্ব মুখ্য সচিব পালন করেন । 

ড. এস. আর. মাহেশ্বরীর কথায় , জরুরি পরিস্থিতি বা সংকটকালীন সময়ে মুখ্য সচিব রাজ্যের স্নায়ুকেন্দ্ররূপে কাজ করেন ( ‘ In times of emergency or crisis he constitutes the nerve centre of the State . ‘ ) । 

উপসংহার 

রাজ্যের মুখ্য সচিবের ক্ষমতা ও কার্যাবলীর বিশ্লেষণ করে স্পষ্টতই বোঝা যায় যে , রাজ্য প্রশাসনে সর্বোচ্চ পদাধিকারী রূপে মুখ্য সচিবের পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । রাজ্য প্রশাসন পরিচালনায় তাঁর অপরিহার্য ভূমিকা রয়েছে । রাজ্য সরকারের সাফল্য অনেকাংশে মুখ্য সচিবের ইতিবাচক ভূমিকার ওপর নির্ভরশীল ।

error: Content is protected !!